সাগরমেলা

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২০, ০০:২৭

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কপালকুণ্ডলা গ্রন্থে লেখা আছে—সব তীর্থ বারবার, সাগরতীর্থ একবার। প্রায় ২০০ বছর আগে সাগরে কপিলমুনির আশ্রমে পুজো দেওয়াটা ছিল পুণ্যের কাজ। আর সাগরতীর্থে কপিলমুনির আশ্রমে পৌঁছাতে কলকাতা থেকে রওনা দিয়ে প্রায় সাত দিন সময় লাগত। কারণ পথ-ঘাট ছিল অতিশয় দুর্গম, তাই যেতে হতো নৌকায়। আগে সারাদেশের ৩-৪ লাখ সাধু-সন্ন্যাসী ও পুণ্যার্থী সাগরে স্থান করে কপিলমনির আশ্রমে গিয়ে পুজো দিতেন। কলকাতা থেকে ১৩০ মাইলেরও পথ নয়। এই পথ অতিক্রম করতে গিয়ে অনেককেই বাঘ, কুমির ও দুর্যোগপূর্ণ জলবায়ুর কবলে পড়ে প্রাণ দিতে হতো। শেষ পর্যন্ত তাদের আর পুণ্য অর্জন করা হতো না।

আমার মনে আছে, ৪০-৪৫ বছর আগে আমি যখন জুনিয়র রিপোর্টার ছিলাম, তখন দু-তিন জন রিপোর্টারকে সাগরে পাঠানো হতো সংবাদ সংগ্রহের জন্য আর অফিসে দু-তিন জনকে Stand by রাখা হতো, যদি কোনো দুর্ঘটনা বা বাঘ, কুমির ইত্যাদির আক্রমণের শিকার হয়, তবে Stand by রাখা দু-তিন জন রিপোর্টার সেখানে যাবেন, অর্থাত্ পরিস্থিতি তখন এমনই ভয়াবহ ছিল।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর গঙ্গা আর বঙ্গোপসাগরের সংযোগস্থলে কপিলমুনির আশ্রমে পুণ্যার্থীদের যাওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধানচন্দ্র রায়, প্রফুল্লসেন, জ্যোতিবসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য—এরা নানা উদ্যোগ নেন এই পথ সুগম করার জন্য। মূলত পৌষ মাসের সংক্রান্তির দিন কপিলমুনির আশ্রমে মূল পুজোটা হয়। সেদিনই বাঙালিরা ঘরে পৌষ পার্বণ পালন করে। পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলা ভাগ হওয়ার পরেও পূর্ব বাংলা থেকে হাজার হাজার পুণ্যার্থী এসে কপিলমুনির আশ্রমে পুজো দিতেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাধু-সন্ন্যাসীরা পৌষসংক্রান্তির সাত-আট দিন আগে থাকতেই কলকাতায় ভিড় জমাতে শুরু করেন, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

সাগরমেলায় এবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পৌষসংক্রান্তির আগেই গিয়ে পুজো দিয়ে এসেছেন। শুধু তাই নয়, একটি সভা করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুণ্যার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে কেন্দ্রীয় সরকার কুম্ভমেলায় দরাজ হাতে টাকা খরচ করেন, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গাসাগরের এই পুণ্য মেলাটির জন্য তিনি কোনো অনুদান পাঠান না। এটাও কেন্দ্রের একটা দ্বিচারিতা। বস্তুত গঙ্গাসাগরই একমাত্র তীর্থক্ষেত্র, যেখানে লাখ লাখ মানুষকে জলপথে মূল ভূখণ্ড থেকে নিয়ে যেতে হয় এই দ্বীপে। মূলত এই মেলা শুরু হয়ে গেছে ১০ জানুয়ারি থেকে, চলবে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত।

গঙ্গাসাগরে যাওয়ার জন্য এখন আর সেই দুর্গমতা নেই। কলকাতা থেকে কাকদ্বীপে বাসে বা ট্রেনে গিয়ে স্টিমার বা লঞ্চে কচুবেড়িয়ায় গিয়ে সেখান থেকে বাস বা অটো কারে কপিলমুনির আশ্রমে পৌঁছানো যায়। একজন সরকারি মুখপাত্র জানান, এপারে ৮-১০ লাখ পুণ্যার্থী সানারদ্বীপে পৌঁছে গিয়েছেন, তাদের হিসাব ১৭ জানুয়ারির মধ্যে কম করে ২৫ লাখ পুণ্যার্থীর সেখানে সমাগম হবেই। পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্রসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, মেলা প্রাঙ্গণে যাতে কোনো রকম সন্ত্রাসবাদী হামলা না হয়, সে জন্য কয়েক লাখ নিরাপত্তারক্ষী পাঠানো হয়েছে, বসানো হয়েছে কয়েক লাখ সিসিটিভি ক্যামেরা। সমাজবিরোধী বা দুষ্কৃতকারীরা যাতে কোনো রকম সন্ত্রাসমূলক কাজ-কর্ম করতে না পারে, সে জন্যই আগাম নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত লক্ষ রাখছি, এই বক্তব্য আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

গঙ্গাসাগর থেকে ফেরার একটা ঝামেলা রয়ে গেছে। এই ২৫-৩০ লাখ পুণ্যার্থী কীভাবে ফিরবেন, তার কোনো নীল নকশা এখনো সরকার তৈরি করতে পারেনি।

এখন প্রশ্ন—কে এই কপিলমুনি? আজ থেকে ৫০০ বছর আগে এই দেবতার মূর্তি সেখানে বসানো হয়েছিল। কে এই মূর্তি বসিয়েছিল, তার কোনো হদিস কোনো বইতে পাওয়া যায়নি। সাধু-সন্ন্যাসীরা মনে করেন তিনি আসল দেবতা। কারণ তিনি গঙ্গা আর সমুদ্রের মোহনা থেকে উঠে এসেছেন, যদিও এরও কোনো প্রমাণ কোথাও নেই। তবে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর কপালকুণ্ডলা বইয়ে লিখেছেন—এই স্থান ছিল দস্যুদের আশ্রয়স্থল। এর দুর্গমতার জন্যই এটি দস্যুদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এই দস্যুদের কোনো চিহ্ন আছে কি না, তা দেখার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। শুধু সাধু-সন্ন্যাসীরাই নয়, এবার দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিজেপির বাঘা বাঘা নেতারা পুণ্যস্থানে আসতে শুরু করেছেন। ভিআইপি পুণ্যার্থীদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারি সূত্রে বলা হয় যে এবারও মমতার মন্ত্রিসভার এক ডজন ব্রাহ্মণ মন্ত্রী পুণ্য সঞ্চয়ের জন্য কপিলমুনির আশ্রম দর্শনে যাবেন। কারণ আগামী বছরই তাদের নির্বাচন।

যেকোনো মেলাকেই রবীন্দ্রনাথের ভাষায় মহামানবের মিলনতীর্থ বলা যায়, কিন্তু সেই মিলনতীর্থ বর্তমানে মহামানবের কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। বর্তমানে চলছে পুণ্য নিয়েও দড়ি টানাটানি। দিদি-মোদি কখন যে কোনদিকে দড়ি ধরে টান দেবেন, সেটা বুঝতেই দেশবাসী উদ্গ্রীব হয়ে আছে। দেশের বিভিন্ন সমস্যায় ভুক্তভোগী জনসাধারণ এবার হয়তো একদিন সমস্বরে বলে উঠবে, ‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে, খান খান’। আর সেদিন ‘আমরা সবাই রাজা’র দেশ হয়ে উঠবে এই ভারতবর্ষ।

n লেখক : পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ সাংবাদিক