বেড়ে চলেছে ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণ ও গণধর্ষণ শেষে হত্যার শিকারও হচ্ছেন কোনো কোনো নারী ও শিশু। কোনো কোনো ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কোনো কোনো ঘটনা থাকছে তদন্তের বাইরে। আবার যেসব ঘটনায় বিচার হচ্ছে, সেখানেও অভিযুক্তের সাজার হার খুবই নগণ্য। বেসরকারি সংস্থা নারীপক্ষ এক গবেষণায় বলেছে, দেশের ছয়টি জেলায় ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৭২টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ২৮৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে; যাতে সাজা হয়েছে মাত্র পাঁচ জনের! সাজার নগণ্য হারের ক্ষেত্রে ধর্ষকের সামাজিক অবস্থান, ধর্ষণের শিকার নারীর দুর্বল বায়োলজিক্যাল অ্যাভিডেন্স, সাক্ষীর অভাব, আইনি দুর্বলতাসহ বিলম্বিত বিচারকেই দায়ী করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। এসব সমস্যার সমাধান করে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে সাজা দেওয়া গেলেই ধর্ষণের ঘটনা অনেকাংশেই কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন বিচারক, ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা।
এ প্রসঙ্গে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ইত্তেফাককে বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। তবে ধর্ষণের অভিযোগে যেসব মামলা হয় এবং অভিযুক্তের যদি দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে হয়তো এটা নিরোধক হিসেবে কাজে দিতে পারে। কারণ অভিযুক্তকে যে শাস্তিই দেওয়া হোক না কেন, সেটা যেন তাড়াতাড়ি দেওয়া হয়। দ্রুত শাস্তি হলে এর প্রভাব সমাজে পড়তে বাধ্য। শুধু দ্রুত বিচারই নয়, পাশাপাশি মানুষকে বিপদ্গামী করে এমন সব বিষয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।' তিনি বলেন, তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনে প্রচুর দুর্বলতা রয়েছে। তাই সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে কোনো মামলায় আসামি খালাস পেয়ে গেলেই দোষটা পড়ে বিচারকদের ওপর। সেক্ষেত্রে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনকে যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এছাড়া ওয়ান স্টপ সার্ভিস এমন হতে হবে, যাতে ভিকটিমকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে নেওয়া যায়।
চলতি মাসে ঢাকার কুর্মিটোলায় সড়কের পাশে ধর্ষণের শিকার হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী। বিষয়টি প্রকাশ পেলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা নেমে আসেন রাজপথে। ধর্ষকের বিচারের দাবিতে ঢাবির শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা নানা কর্মসূচি পালন করেন। দ্রুত গ্রেপ্তার হন ধর্ষক মজনু।
এ ঘটনার আগে ২০১৭ সালে দুটি ধর্ষণের ঘটনা সারাদেশে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এর মধ্যে একটি ছিল বনানীর রেইনট্রি হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীর ধর্ষণের ঘটনা। আরেকটি আলোচিত ঘটনা ছিল বগুড়ার শ্রমিক লীগের নেতা তুফান সরকার কর্তৃক এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ শেষে ঐ শিক্ষার্থী ও তার মাকে মাথা ন্যাড়া করে আটকে রাখার ঘটনা। দুটি ঘটনার পরই দেশব্যাপী ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি দ্রুত বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয় মানুষ। সরব হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারে সোপর্দ করা হয় আসামিদের। কিন্তু আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো দুটি মামলার একটিরও নিষ্পত্তি হয়নি।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে হয়তো একসময় সাক্ষীই খুঁজে পাওয়া যাবে না। তখন হয়তো সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে অভিযুক্ত খালাস পেয়ে যাবে। এদিকে ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিতে সম্প্রতি সাত দফা নির্দেশনাও দিয়েছে হাইকোর্ট। এসব নির্দেশনা যদি বিচারক, পিপি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মেনে চলেন, তাহলে ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।
বেসরকারি সংস্থা ‘নারী পক্ষ’ গবেষণার অংশ হিসেবে ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ছয়টি জেলায় ৪ হাজার ৩৭২টি ধর্ষণের মামলা পর্যবেক্ষণ করেছে। এর মধ্যে ঢাকায় ১ হাজার ৮২০টি, জামালপুরে ৮৭২টি, সিরাজগঞ্জে ৯২৫টি, নোয়াখালীতে ৩৭৮টি, ঝিনাইদহে ২৪০টি ও জয়পুরহাটে ১৩৭টি ধর্ষণের মামলা হয়। প্রায় সাড়ে চার হাজার মামলার মধ্যে ৯৮৯ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। খালাস পেয়েছে ২৮৯ জন। আর শাস্তি দেওয়া হয়েছে মাত্র পাঁচ জনকে! বিচারাধীন রয়েছে ৩ হাজার ৮৯টি ধর্ষণের মামলা।
নারীপক্ষের অন্যতম সদস্য আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামরুন নাহার বলেন, ধর্ষণের মামলাগুলো আইন, তথ্য-উপাত্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে প্রমাণ করতে হয়। এগুলোর একটির সঙ্গে আরেকটির যোগসূত্র রয়েছে। এই যোগসূত্রের কাজটি খুবই জটিল। যেখানে একজন ভিকটিম ব্যর্থ হচ্ছে, তার মানে এই নয় যে নির্যাতনের ঘটনাগুলো মিথ্যা। তিনি বলেন, ধর্ষণের ঘটনাটিকে প্রমাণ করার জন্য যে প্রক্রিয়া নারীর জন্য রাখা হয়েছে, সেটা তার অনুকূলে নয়। নারীকেই প্রমাণ করতে হয় যে কী করে তার ওপর ঘটনাটি ঘটেছে। সেখানে অন্যান্য সংস্থা সমন্বয়কের ভূমিকা রাখছে না। সে কারণে আমরা মনে করি বিচার প্রক্রিয়া নারীর অনুকূলে আসছে না। যেমন ধর্ষণের শিকার নারীর ডাক্তারি পরীক্ষা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ডাক্তারি পরীক্ষায় দুর্বলতার কারণে প্রমাণ হারিয়ে যায়।
ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বাধা আইন
ধর্ষণের শিকার কোনো নারী আদালতে বিচারের সময় অভিযুক্তের কৌঁসুলি দ্বারা তার চরিত্র নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হন। ভিকটিমকে মানসিকভাবে হেনস্তা করতেই এমন কৌশল নেন আসামির আইনজীবীরা। সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ (৪) ধারা সেই সুযোগ করে দিয়েছে। এই ধারা বাতিল করতে সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে আইন কমিশন। ঐ সুপারিশ আজও বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৫ সালে এক সেমিনারে ঐ ধারা বাতিলের আহ্বান জানিয়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছিলেন, প্রকাশ্য আদালতে যৌন হয়রানির শিকার কোনো নারীর চরিত্র নিয়ে জেরা করা ঠিক নয়। কিন্তু ধর্ষণের শিকার নারীকে সাক্ষ্য আইনের ১৫৫(৪) ধারা বলে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করেন আসামিপক্ষের কৌঁসুলিরা। এই জেরার উদ্দেশ্য ভিকটিমকে দুশ্চরিত্রা প্রমাণ করা। ঐ বিধানটি কালো, ঔপনিবেশিক ধ্যান-ধারণার। এছাড়া দণ্ডবিধিতে ধর্ষণের সংজ্ঞা নিয়েও আপত্তি রয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর।
