আবু আফজাল মোহা. সালেহ
আলোদূষণ নিয়ে আলোচনা একেবারেই কম। কিন্তু এ দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঘাতক। উন্নয়নের গতির সঙ্গে সঙ্গে এ দূষণ বাড়ছে। মানুষ্যসৃষ্ট কারণেই ফলাফল ভয়াবহতার দিকে যাচ্ছে। অধিক ভোগ বিলাসিতার জন্য আলোদূষণের মাত্রা বেড়েই চলেছে। শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে শব্দদূষণের মাত্রা ঊর্ধ্বমুখী।
কৃত্রিম আলোতে বিশ্ব ভরে গেছে। বাংলাদেশও ভরে যাচ্ছে। শহরে রাত আর দিনের পার্থক্য করা মুশকিল হয়ে পড়ে অনেক সময়। বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলো এমনকি জেলা বা মফঃস্বল অনেক শহরে বিপণিকেন্দ্রগুলোতে রাতেই উপচেপড়া ভিড় হয়। কসমেটিক বা বিপণিকেন্দ্রগুলোর কৃত্রিম আলো ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে।
রাতের বেলা আকাশ বা গ্রহ-তারা কৃত্রিম আলোর ছটায় পরিষ্কার দেখা যায় না। লোকালয়ের অনেক দূরে দেখতে যেতে হয়। অর্থাত্ আলোকদূষণ চরম মাত্রায়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বের ৮৩ শতাংশ শহর আলোদূষণের শিকার। আমেরিকার আর ইউরোপের প্রায় শতভাগ (৯৯ শতাংশ) শহর আলোদূষণের দোষে দুষ্ট। আর দক্ষিণ আফ্রিকার সাদসহ দরিদ্রপীড়িত দেশ কম আলোদূষণের শিকার। দেখা যাচ্ছে, উন্নয়নের গতিধারায় আলোদূষণের হার বেড়েই যাচ্ছে।
যেসব প্রাণী অন্ধকারে চলাচল করে তাদের জন্য কৃত্রিম আলো ক্ষতিকর। বাদুড়, লক্ষী পেঁচা, হুতুম পেঁচা, শিয়াল, বনবিড়াল প্রভৃতি প্রাণীর চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। বংশবিস্তার কমে যায়। সোডিয়াম আলোর কারণে অনেক প্রাণী বাসস্থানের পরিবেশ নষ্ট হয়। অন্ধকারে চলা বা নিশাচর প্রাণীরা খাদ্যসংকটে পড়ে। পোকামাকড়, কীটপতঙ্গের জীবনযাত্রা দিন-রাতের নিয়তির উপর নির্ভরশীল। ফলে জৈববৈচিত্র্য বিপন্ন হয়। এতে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে থাকে।
এলইডি প্রযুক্তি আসার পর আলোর ব্যবহার অনেক বেড়ে গেছে। ভিজিবল ইনফ্লায়েড ইমেজিং রেডিও (ভিআইআইএস)-র মাধ্যমে দেখা যায়, বাংলাদেশে ২০১২ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে কৃত্রিম আলোর তীব্রতা বেড়েছে দুই দশমিক দুই শতাংশ। এতে ঘুম কেড়ে নিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাস্তুতন্ত্রে পরিবেশ ও প্রতিবেশ ঠিক রাখার জন্য অন্ধকার খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক কীটপতঙ্গের খাবারের যোগান উদ্ভিদ থেকেই হয়ে থাকে। অনেক উদ্ভিদের ফুল ফোটে অন্ধকারে। উদ্ভিদ থেকে বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হয়। পরাগায়ণ হয় রাতের বেলায়। নিশাচর কীটপতঙ্গের মাধ্যমে অনেক উদ্ভিদের পরাগায়ণ হয়ে থাকে। যা রাতের বেলায় হয়। বা অন্ধকারে হয়। আলোর প্রভাবে প্রকৃতির এই চেইনও বিঘ্ন হচ্ছে।
বিশ্বে উত্পাদিত বিদ্যুতের এক চতুর্থাংশ কৃত্রিম আলো তৈরিতে ব্যবহূত হয় বলে বিজ্ঞানীরা বলছেন। অতিরিক্ত আলোর এলাকায় বিলবোর্ডের আলোর ঝলকানিতে গাড়ির চালক নিশানা ভুল করতে পারেন। আলোক সংকেত নাও দেখতে পারেন। আমাদের রাজধানীর বা বড় শহরের রাস্তার দুধারে অনেক আলোক বিলবোর্ড আছে। কৃত্রিম আলোর জন্য যে শক্তি ব্যবহার করা হয় তার ৩০-৬০ ভাগ পর্যন্ত অপচয় হয় বলে জানা যায়। সড়কবাতি, বিলবোর্ড ইত্যাদি ব্যবহারের প্রয়োজনে আলো যাতে কম ছড়ায় তা খেয়াল রাখতে হবে। অনেক দেশেই আবিষ্কৃত (যেমন জার্মানি) হয়েছে লক্ষ্যবস্তুতে আলোকিত করার বাল্ব। এতে চারিদিকে আলো ছড়িয়ে যাবে না। কিন্তু আমাদের অনেক অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য থাকে লোকদেখানো বা জাঁকজমক করা। এতে আলোর অপচয় হবে। আলো দূষিত হবে।
সচেতনতাই কেবল পারে আমাদের দেশে আলোকদূষণ কমাতে। ব্যর্থ হলে আমাদের ভবিষ্যতের জন্যই খারাপ হবে।
লালমনিরহাট
০
