ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে দিনে-রাতে চলাচলকারী অধিকাংশ মাইক্রোবাস, লেগুনা, মেক্সির রুটপারমিট ও ফিটনেস নেই। লক্কড়-ঝক্কড় এসব বাহন বেপরোয়া গতিতে চলাচল করছে। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে মহাসড়কে দাবড়ে বেড়ানো এসব অবৈধ মাইক্রোবাস ও ছোটোখাটো বাহনের দরজা সবসময় খোলা থাকে। ফলে ব্যস্ততম এ মহাসড়কে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আতঙ্কে যাতায়াত করতে হয়। যত্রতত্র যাত্রী উঠা-নামা করানোসহ অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। যাত্রী ও পথচারীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের জেলার দাউদকান্দি থেকে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত প্রায় ১০৪ কিলোমিটার এলাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছে রুটপারমিট ও ফিটনেসবিহীন অন্তত তিন শতাধিক মাইক্রোবাস। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে এসব মাইক্রোবাস বিভিন্ন সেক্টরে চাঁদা দিয়ে ম্যানেজ করে মহাসড়কে দাবড়ে চলছে। এছাড়াও মহাসড়কে লেগুনা, মেক্সি ও লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহন দেদারসে চলাচল করছে। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মহাসড়কে বড়ো বড়ো যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কার আগে কে যাবে এমন অসম প্রতিযোগিতা করে চলছে এসব মাইক্রোবাস, লেগুনা ও মেক্সি। এসব বাহনের বেপরোয়া চলাচলের কারণে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। জানা যায়, মহাসড়কের জেলার দাউদকান্দি, গৌরীপুর, ইলিয়টগঞ্জ, কুটুম্বপুর, মাধাইয়া, চান্দিনা, নিমসার, কাবিলা, নাজিরা বাজার, ক্যান্টনমেন্ট, আমতলী, আলেখারচর, ঝাগুরজুলি, নন্দনপুর, পদুয়ারবাজার, সোয়াগাজী, মিয়ারবাজার, চৌদ্দগ্রাম বাজার, জগন্নাথদীঘি, নানকরা, মোহাম্মদ আলী এলাকা পর্যন্ত ফিটনেসবিহীন দরজাখোলা মাইক্রোবাসের অন্তত ২১টি অবৈধ স্ট্যান্ড রয়েছে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মহাসড়কের এসব স্ট্যান্ডে মাইক্রোবাসগুলোতে যাত্রী উঠা-নামা করে।
কলেজ শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান, ফরিদা ইয়াসমিন, ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিনসহ বেশ কয়েক জন যাত্রী জানান, এ ধরনের মাইক্রোবাসের বেশির ভাগই সড়কে চলাচলের অনুপযোগী। এগুলোর নেই ফিটনেস, ইন্স্যুরেন্স কিংবা রুট পারমিট। কোনোটির দরজা নেই, কোনোটির ভাঙা কিংবা সবসময় খোলা থাকে। জরাজীর্ণ তিন জনের সিটে ঠাসাঠাসি করে পাঁচ জন বসানো হয়। কম দূরত্বে ভাড়াও গুনতে হয় বেশি। নারীদের বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকার লোকজন জানায়, এসব স্ট্যান্ডে চাঁদা উঠানোর জন্য রয়েছে ‘লাইনম্যান’ নামের অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। তারা সিন্ডিকেট করে এসব স্ট্যান্ড পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েক জন চালক জানান, ‘এ ধরনের বাহন চলাচলে যাতে আইনি কোনো সমস্যায় পড়তে না হয় এজন্য সমিতিও গড়ে তোলা হয়েছে। সবকিছু ম্যানেজ করার জন্য সমিতির মাধ্যমে বিভিন্ন সেক্টরে চাঁদাও দেওয়া হয়।’ মাইক্রোবাসের কয়েক জন মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘মহাসড়ক থেকে সিএনজি অটোরিকশা তুলে দেওয়ার পর অনেকেই পুরাতন মাইক্রোবাস যাত্রী বহনের জন্য মহাসড়কে নামিয়েছেন। মহাসড়কে কোনো ঝামেলা হলে সমিতির নেতারা বিষয়টি দেখভাল করেন।’
হাইওয়ে কুমিল্লা অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রহমত উল্লাহ জানান, ‘মহাসড়কে সবধরনের অবৈধ যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এরপরও পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবৈধ যানবাহন চলাচল করছে। বিশেষ করে বেশকিছু মাইক্রোবাস দরজা খোলা অবস্থায় যাত্রী নিয়ে মহাসড়কে চলাচল করে থাকে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব বাহনে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশি থাকে। অবৈধ, নিষিদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
বিআরটিএ-কুমিল্লা সার্কেলের সহকারী পরিচালক এম এ আশরাফ সিদ্দিকী জানান, ‘দরজা খোলা রাখা মাইক্রোবাসগুলোর বেশিরভাগই মহাসড়কে চলাচলের অনুপযোগী। এগুলোর ফিটনেস, রুটপারমিট নেই। প্রতি মাসেই অভিযান পরিচালনা করে এ ধরনের অবৈধ বাহন আটক করে ডাম্পিংয়ে পাঠিয়ে থাকি, কোনোটিকে জরিমানা করা হয়। এছাড়া জেলার ৭২টি পেট্রোল পাম্পে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী নোটিশ টানিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তারা যেন রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস ও রুটপারমিটবিহীন কোনো বাহনকে জ্বালানি সরবরাহ না করেন এমন নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।’
