তখন একাত্তর

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:৫৮

এক.

টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে মধ্যরাত থেকে। অবিরাম একই ধারায় ঝরছে বৃষ্টি। তবে বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়ো হাওয়া নেই। কেমন গুমোট একটা ভাব ছড়িয়ে আছে চারদিকে। ভ্যাপসা গরম লাগছে। নিম্নচাপ হয়েছে। আবহাওয়া অফিস তিন নম্বর সতর্ক সংকেত ঘোষণা করেছে।

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেই খুলনা থেকে একটা লঞ্চ এসে ভিড়েছে মাত্র পাইকগাছা নদীর ঘাটে। লঞ্চটা নিয়মিত রুটে চলাচল করলেও এখন সাধারণ যাত্রী নিয়ে আসেনি। লাইনের লঞ্চ হলেও পাইকগাছায় এসেছে অসময়ে। দুপুরের ঠিক পরপরই। লঞ্চ থেকে নামছে একদল রাজাকার। তাদের গায়ে খাকি পোশাক। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের মতো না হলেও দোসর রাজাকার বাহিনীর জন্য খাকি পোশাকটা দিয়েছে। যাতে মানুষ তাদের খাকি পোশাক দেখে ভয় পায়। রাজাকারগুলোর গায়ে খাকি সার্ট হলেও অধিকাংশের পরনে লুঙ্গি। তাদের পিঠে রাইফেল ঝুলছে। ওটা চালাতে পারুক আর না-ই পারুক, প্রত্যেককে একটা করে অস্ত্র দিয়েছে পাকিস্তানিরা।

একজন একজন করে প্রায় ষাট জনের রাজাকার দলটা লঞ্চ থেকে নামতেই ঘাটে একধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। রাজাকারের দল কোন মতলবে পাইকগাছা এসেছে—তা নিয়ে কানাঘুষা চলছে। তবে তা আড়ালে। প্রকাশ্যে রাজাকারদের নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা করে বিপদে পড়তে চাইছে না। তেমন দুঃসাহস আছে কয়জনের?

২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পাইকগাছায় পাকিস্তানি ঝাণ্ডা মানে পতাকা উড়তে দেওয়া হয়নি। স্থানীয় ছাত্রনেতাদের ঐক্যবদ্ধ চেষ্টা এবং উদ্যোগে সেদিন এখানে স্বাধীন বাংলার লালসবুজের মাঝে মানচিত্র আঁকা পতাকা ওড়ানো হয়েছে। এখানকার থানা পরিষদের সরকারি কর্মকর্তারও যোগ দিয়েছেন ছাত্রদের আন্দোলনে। তখন থেকেই গোটা এলাকা জুড়েই একটা স্বাধীন স্বাধীন ভাব বজায় ছিল। পাকিস্তানি বাহিনীর আধিপত্যভাবটা এখানে এখনো দেখা যায়নি তেমনভাবে।

পাইকগাছায় মুক্ত অঞ্চলের খবর কিছুটা দেরিতে হলেও খুলনায় পাকিস্তানি সৈন্য এবং প্রশাসনের কানে গিয়ে পৌঁছেছে। এলাকার কিছু বেকার যুবক, অভাবী কৃষক আর ভবঘুরে লোকেরা নাম লিখিয়েছে রাজাকার বাহিনীতে। রাজাকার হিসেবে নাম লেখালেই প্রতিমাসে ভালো টাকা বেতন পাওয়া যায়। একটা নতুন রাইফেল দেওয়া হয়। এই অস্ত্র হাতে পেয়ে রাজাকারদের মাথায় রক্ত চড়ে গেছে। তারা যা খুশি তা-ই করছে। সঙ্গে থাকা অস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে মেরে ফেলা, বিভিন্ন জনের কাছ থেকে টাকাপয়সা আদায়, স্বর্ণালংকার লুটপাট করার অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করছে রাজাকারদের সবাই। তারা যদি পাখি মারার মতো করে গুলি করে মানুষ মারে তাতে কিছুই হচ্ছে না।

লঞ্চঘাটে নেমে রাজাকাররা দলবেঁধে বাজারের মধ্যে চক্কর দিল কয়েকবার। নিজেদের ক্ষমতা জাহির করতে অযথা রাইফেলের বাট দিয়ে বাজারে বিভিন্ন দোকানের চালে, দরজায় গুঁতো দিতে থাকল। হাটে কেনাবেচা করতে আসা লোকজনদের ঔদ্ধত্যাপূর্ণ ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, ‘অ্যাই ব্যাটারা, কও তো, এইখানে মুক্তিবাহিনীর কেউ আছে নাকি? সত্য কইরা কইবা, মিথ্যা কইলে এক্কেবারে খবর কইরা দিমু, কইলাম।’ বলতে বলতে ত্রাস সৃষ্টির জন্য কয়েকজনকে অহেতুক চড়-থাপ্পড় মারে তারা। কয়েকজন তরুণ অবস্থা বেগতিক দেখে ভয়ে বাজার ছেড়ে পালাতে শুরু করে। রাজাকারদের সামনে পড়ে গেলে আর রক্ষা নেই। পাইকগাছা নদীর ঘাটে বিশাল রাজাকার বাহিনীর আগমন সংবাদে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এর মধ্যেই। কখন কী ঘটে যায়। কাকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলে—তেমন একটা ভয় সবাইকে তাড়িয়ে ফিরছে। আশপাশের গ্রামগুলোতে এতদিন ধরে যে একধরনের ‘স্বাধীন স্বাধীন’ ভাব বিরাজ করছিল তা নিমিষেই উবে গেছে। তার বদলে একধরনের অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কভাব ছড়িয়ে পড়েছে।

 

দুই.

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, তারপর রাত নেমেছে পাইকগাছায়। এলাকা জুড়ে সুনসান নিস্তব্ধ পরিবেশ। সন্ধে থেকে বৃষ্টি থেমে গেছে। তবে গুমোট আবহাওয়াটা এখনো কাটেনি। ভ্যাপসা গরমে অসহ্য লাগলেও গ্রামের মানুষগুলোর কিছুই করার নেই। রাতের প্রথম প্রহরে একটু স্বস্তির জন্য বাড়ির আঙিনায়, উঠোনে হাঁটাহাঁটি কিংবা বসে গল্পগুজব করতে করতে হাতের পাখা কিংবা গামছার বাতাসে প্রশান্তি খোঁজার চেষ্টা করছিলেন কেউ কেউ। কিন্তু এলাকায় আসা রাজাকারদের ভয়ে একসময় ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছে বেশিরভাগ মানুষ।

 

পাইকগাছায় লঞ্চে করে রাজাকারের দল এসে নেমেছে দুপুরে। এ খবর পেয়েছেন মনি চেয়ারম্যান বিকেলেই। সেই থেকে একধরনের অস্থিরতা তাকে তাড়া করে ফিরছে। এলাকার মানুষগুলো এতদিন যে শান্তিতে ছিল সেটা আজ থেকে হারিয়ে গেল, এবার এখানে কী ঘটবে কে জানে—ভাবছেন তিনি। বিছানায় শুয়ে শুয়ে অনেক বিষয়ে ভাবছেন, ঘুম আসছে না দু চোখে। গরমের কারণে জানালাটা খোলা রেখেছেন, যদি কিছুটা বাতাস পাওয়া যায়, এ আশায়।

রাতের গভীরতা বাড়ছে ক্রমশ। হঠাত্ বাড়ির দরজায় ধাক্কাধাক্কির শব্দ শোনা যায়। সেই শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। এত রাতে বাড়িতে কারা এল, দ্রুত চিন্তা করতে থাকেন মনি চেয়ারম্যান। দরজা খুলে কারা এসেছে দেখা দরকার, ভাবছেন তিনি। তখনই খোলা জানালা দিয়ে বাইরে থেকে কারো ঢোকানো রাইফেলের ব্যারেল দেখতে পান। ব্যাপারটা কী, কৌতূহলি হয়ে জানালার কাছে যেতেই বাইরে দাঁড়ানো কিছু অচেনা মানুষের আনাগোনা এবং কণ্ঠস্বর শুনতে পান তিনি।

মনি চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ করে রাজাকারের দল অশ্লীল ভাষায় অকথ্যভাবে গালিগালাজ করছে। তারা তাকে দরজা খুলতে বলছে।

‘অ্যাই শালার ব্যাটা চেয়ারম্যান, তুই আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছিস না, আমরা যে বাড়ির দরজা এই ভাবে ধাক্কাচ্ছি, তোদের কি কানে যাচ্ছে কোনো শব্দ?’ একজন রাজাকার উচ্চ স্বরে বলে ওঠে, ‘শালা বাঞ্চোত, স্বাধীন বাংলার নেতা।’

ততক্ষণে মনি চেয়ারম্যান বুঝে নিয়েছেন গোটা পরিস্থিতি। পাইকগাছায় পা রাখা রাজাকারের দল খবর নিয়ে ঠিকই এসে গেছে তার বাড়িতে। তারা জেনে গেছে চেয়ারম্যান তার বাড়িতেই আছেন। এসেই দরজা খোলার জন্য ধাক্কাধাক্কি শুরু করেছে, গালিগালাজ করছে অকথ্য ভাষায়।

মনি চেয়ারম্যান বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ডাকে যে অসহযোগ আন্দোলন চলছিল তাতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। থানা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এলাকার যুবকদের সংগঠিত করে তাদের অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন ।

এই মুহূর্তে হঠাত্ রাজাকার দলের আক্রমণে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন মনি চেয়ারম্যান। এখন তিনি উপলব্ধি করছেন ভয়াবহ এক বিপদের মধ্যে পড়ে গেছেন। পাইকগাছায় রাজাকারদের আগমনের খবর পেয়ে বিকেল থেকে উত্কণ্ঠায় আছেন। স্থানীয় সংগ্রাম পরিষদের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বসে শলাপরামর্শ করেছেন। পরবর্তী কর্মকৌশল ও পরিকল্পনা ঠিক করেছেন। সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে রাতে যার যার নিজ বাড়িতে না থাকতে বলেও দিয়েছেন। কিন্তু সবাইকে নিজ বাড়িতে না থাকার পরামর্শ দিয়ে মনি চেয়ারম্যান ঠিকই নিজের বাড়িতে রয়ে গেছেন। ভেবেছিলেন, কোনোভাবে রাতটা পার করতে পারলে সকালে উঠেই চলে যাবেন নিরাপদ কোনো জায়গায়। তাছাড়া স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে পরিবারের সবার কাছাকাছি থাকারও একটা তাড়না ছিল। তাদের সবাইকে বাড়িতে রেখে নিজের নিরাপদ আশ্রয়ে যাবার ব্যাপারটা মন থেকে মেনে নিতে পারছিলেন না যেন। নিজে বাড়ি ছেড়ে যাবার আগে পরিবারের সবাইকে নিরাপদ কোথাও পাঠাতে হবে। সবাইকে বাড়িতে বিপদের মধ্যে রেখে একা কোথায় যাবেন?

রাজাকারের দল হঠাত্ গভীর রাতে বাড়িতে আক্রমণ করে বসবে—এটা ভাবেননি মনি চেয়ারম্যান। আলমারিতে তার লাইসেন্স করা বন্দুক রয়েছে। ওটা বের করে এনে রাজাকারদের মোকাবেলা করার চিন্তা মাথায় জাগালেও তা করার আর সুযোগ পেলেন না তিনি।

রাজাকারের কমান্ডার আলেক মণ্ডল তার সঙ্গীদের নির্দেশ দিতেই ঘরে ঢুকে মনি চেয়ারম্যানকে গামছা দিয়ে পিছমোড়া করে দুই হাত বেঁধে ফেলল। তারপর তারা বাড়িতে ইচ্ছেমতো লুটপাট চালাল। বাড়ির মেয়েরা কান্নাকাটি শুরু করেছে ভয়ে আতঙ্কে। চেয়ারম্যানকে ছেড়ে দিতে রাজাকারদের কাছে অনুনয়-বিনয় করতে লাগল তার স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েরা। কিন্তু কারো কথা শুনতে রাজি নয় হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের দোসর রাজাকারের দল।

একসময় মনি চেয়ারম্যানকে বন্দি করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল তারা। তারপর রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করল। রাইফেলের বাঁট দিয়ে গুঁতো মারতে মারতে চেয়ারম্যানের মতো একজন সম্মানিত মানুষকে সামনের দিকে হাঁটতে বাধ্য করল তারা।

 

তিন.

অন্ধকার রাত। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট কর্দমাক্ত এবং পিচ্ছিল হয়ে আছে। রাজাকারের দল এদেশেরই মানুষ। অথচ তাদের অসভ্যতা এবং বর্বরতা দেখে মনে হয় ভিনদেশ থেকে এসেছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রশ্রয় এবং নানা ধরনের টোপ গিলে তারা স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের নিধনে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে, পা পিছলে পড়ে যাচ্ছেন বারবার, তবুও সামনের দিকে হাঁটছেন মনি চেয়ারম্যান। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছেন রাজাকারের দল তাকে পিছমোড়া করে বেঁধে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?’ তাদের গন্তব্য কোথায় জানেন না তিনি। একবার ভাবলেন, এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করবেন কি না। পরে সেই চিন্তাভাবনা বাদ দিলেন। চুপচাপ হাঁটছেন তিনি রাজাকার দল পরিবেষ্টিত হয়ে। তাদের একজনের হাতে তিন ব্যাটারির একটা টর্চ রয়েছে। বোতাম টিপে মাঝে মাঝে টর্চের আলো ফেলছে সে রাস্তা দেখার জন্য।

দূরে একদল কুকুর আর্তনাদ করে কাঁদছে। দেশে দুঃসময় এলে কুকুরগুলো রাতে এভাবে কাঁদে দলবেঁধে। এখন সারাদেশে ভয়ংকর দুঃসময় চলছে।

মনি চেয়ারম্যানের সঙ্গে মিজানুরকেও ধরে নিয়ে তারা কপিলমুনির দিকে রওনা দেয়। সেখানে বিনোদ বিহারী সাধুর বাড়ি দখল করে রাজাকারদের জন্য বড়ো একটা ক্যাম্প বানানো হয়েছে।

গদাইপুরে বোয়ালিয়া মোড়ে রাজাকারের দলটি যখন এসে পৌঁছাল মসজিদে মসজিদে তখন ফজরের আজান হচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানকে ইসলামবিরোধী ইন্ডিয়ার অ্যাজেন্টদের কবল থেকে মুক্ত করে সাচ্চা ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে রাজাকাররা রাইফেল নিয়ে মাঠে নেমেছে পাকিস্তানিদের দোসর হিসেবে। অথচ তারা নিজেরা কতটা মুসলমান, ইসলাম ধর্মের আদর্শ এবং অনুশাসনে কতটা বিশ্বাসী? ফজর নামাজের আজান শুনেও তাদের মধ্যে নামাজ পড়ার কোনো লক্ষণ নেই। মনি চেয়ারম্যান নিজে ধার্মিক মানুষ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। এখন ফজরের ওয়াক্ত হয়েছে। নামাজ আদায় করার তাগিদ অনুভব করছেন। অথচ তা কীভাবে আদায় করবেন। তার দু হাত পিছমোড়া করে বাঁধা, এ অবস্থায় হাতের বাঁধন খুলে দিতে বললেও রাজাকারের দল তা মোটেও শোনবে না, বরং এটাকে পালিয়ে যাওয়ার কৌশল হিসেবে আখ্যা দিয়ে আরো হেস্তনেস্ত করবে। গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করবে না।

চার.

রাস্তার পাশ দিয়ে কপোতাক্ষ নদী বয়ে যাচ্ছে। রাজাকার কমান্ডার আলেক মণ্ডল তার দলবল নিয়ে অনেকটা পথ এসে এখন বেশ ক্লান্ত। ইন্ডিয়ার দালাল স্বাধীন বাংলার পক্ষের লোকগুলোকে সারারাত ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধরতে অনেক পেরেশান হতে হয়েছে। এখন আবার তাদের ধরে বেঁধে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতেও বেশ কষ্ট হচ্ছে। এদের কপিলমুনি ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে তো মেরেই ফেলতে হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করে আর কী ফায়দা। এখনই গুলি করে নদীতে ফেলে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। পাকিস্তানের দুশমনদের বাঁচিয়ে রেখে তো কোনো লাভ নেই। কপিলমুনি ক্যাম্প পর্যন্ত যেতে পথে আবার নতুন কোনো হাঙ্গামার মধ্যে পড়ে যেতে না হয়—দ্রুত ভাবতে থাকে আলেক মণ্ডল।

একসময় সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলে ধূর্ত নিষ্ঠুর স্বভাবের মানুষটা। তার হূদয়ে মায়াদয়া নেই বলে জানে সবাই। একসময় ডাকাত হিসেবে কুখ্যাতি ছিল। অনেকগুলো খুনের অভিযোগ রয়েছে ওর বিরুদ্ধে। কেউ কেউ ‘একালের সীমার’ বলে ডাকে তাকে। মানুষ মারতে তার বুক কাঁপে না একটুও।

বন্দি পাঁচ জনকে কমান্ডারের নির্দেশে সিলেমানপুর গ্রামে কপোতাক্ষ নদীর পাড়ে দাঁড় করালো রাজাকাররা। তাদের মধ্যে একদল বন্দিদের দিকে রাইফেল তাক করেছে। তারা গুলি করার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। এখন শুধু আলেক কমান্ডারের নির্দেশ পেলেই ট্রিগার টিপবে। এখন মানুষ মারতে তাদের হাত একদম কাঁপে না। পাকিস্তানের দুশমন কাউকে পেলেই ছাড়াছাড়ি নেই। এ পর্যন্ত কতজনকে যে গুলি করে মেরেছে তারা—এর কোনো হিসাব নেই। পাখির মতো মানুষ মারছে রাজাকাররা। এখানে তো মাত্র পাঁচ জন মানুষ। তারা প্রত্যেকেই স্বাধীন বাংলার পক্ষের নেতা-কর্মী। তাদেরকে মেরে ফেলতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

গতরাতে ঘুম থেকে তুলে বেঁধে নিয়ে আসার পর থেকে কেমন হতবিহবল পড়ে পড়েছেন মনি চেয়ারম্যান। তাকে ধরে নিয়ে আসার পর বাড়িতে স্ত্রী ছেলেমেয়েরা কী অবস্থায় রয়েছে, এখন তারা কী করছে? ভাবছেন তিনি। নদীর পাড়ে গুলি করে মারার জন্য আরো কয়েকজনের সঙ্গে লাইন করে দাঁড় করানো হয়েছে, এটা কী জানে বাড়ির সবাই? এখন কী ঘটতে পারে, ভেবে ভেবে ঘামছেন শুধু।

রাজাকাররা কী এখনই তাদের মেরে ফেলবে?

কপোতাক্ষ নদীর দিকে তাকিয়ে মনি চেয়ারম্যান ভাবছেন অন্য অনেককিছু। অলৌকিক কিছু একটা যদি ঘটে যেত এই মুহূর্তে। ভয়ংকর স্বভাবের রাজাকারদের দল তাদের হত্যা করতে নদীর কিনারে দাঁড় করিয়েছে। হয়তো এক্ষুনি রাইফেল দিয়ে গুলি করবে। মহান সৃষ্টিকর্তা কি ওদের হাত থেকে অলৌকিক কোনো ঘটনার মাধ্যমে বাঁচিয়ে দিতে পারেন না। সৃষ্টিকর্তা চাইলে সবকিছু করতে পারেন, সে বিশ্বাস তার আছে এখনো।

একদল অশিক্ষিত, বর্বর, পিশাচ, অমানুষ রাইফেল তুলে গুলি করল কপোতাক্ষের পাড়ে দাঁড় করানো পাঁচ জন নিরপরাধ স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর। অনেক দূর পর্যন্ত গুলির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল। আশপাশে গ্রামগুলোতে সেই গুলির শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।

বয়ে চলা কপোতাক্ষ নদীর স্বচ্ছ পানিতে পাঁচ জন নিরপরাধ স্বাধীনতাকামী মানুষের রক্ত মিশে লাল বর্ণ ধারণ করল। পাইকগাছার সর্বজনশ্রদ্ধেয় মানুষ মনি চেয়ারম্যানকে রাজাকারের দল নির্মমভাবে হত্যা করল। তার মাথা বরাবর গুলি করল তারা। গুলি বাম চোখের নিচে ভেদ করে চেয়ালের অনেকটা অংশ ভেঙে বেরিয়ে গেল। মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলেন মনি চেয়ারম্যান। রাজাকারদের বুক একটু কাঁপল না তেমন একজন মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করতে।

পাকিস্তানের পাঁচ দুশমনকে হত্যা করতে পেরে কিছুক্ষণ আনন্দ-উল্লাস করল রাজাকারের দল। তারপর তারা ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে দিতে হাতের রাইফেল উঁচিয়ে কপিলমুনির দিকে এগোতে লাগল। আর একটু পথ হাঁটলেই তাদের শক্ত ঘাঁটি। সেই ঘাঁটির উদ্দেশে তারা পথ চলতে লাগল।