দেলেয়ার হোসেন টিটু
Free Market Economy-তে বাজারমূল্য নির্ধারিত হয় অবশ্যই মার্কেট থিওরি অনুযায়ী‚ Demand এবং Supply. নিত্য ভোগ্যপণ্যের চাহিদার সঙ্গে পুঁজিবাজারে শেয়ারের চাহিদা-পার্থক্য হলো, নিত্য ভোগ্যপণ্য ভোক্তাকে যে কোনো মূল্যে কম-বেশি (ক্রয়-ক্ষমতা অনুযায়ী) ক্রয় করতেই হয়। কিন্তু কোনো কোম্পানির শেয়ারের চাহিদা নির্ভর করে বিনিয়োগকারী কর্তৃক বিবেচিত উক্ত শেয়ারের উপযুক্ত বাজারমূল্যের ওপর। বিনিয়োগকারী যদি কোনো নির্দিষ্ট শেয়ার উপযুক্ত দামে ক্রয় করিতে না পারেন, তিনি অবশ্যই অন্য কোনো ভালো শেয়ার অথবা ভিন্ন Asset Class বিনিয়োগ বিবেচনায় আনবেন।
একটি দেশের Economy Activity-এর ছয়টি মূল Indicates-এর পঞ্চম স্থানে অবস্থান করে সেই দেশের পুঁজিবাজার। আর এই পুঁজিবাজারে ভালো-মন্দ নির্ভর করে নানাবিধ অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ের ওপর। মূল্য সূচকের সহনীয় ওঠানামা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হলেও মার্কেট ক্রাশের মতো দুর্ঘটনা অনেক সময় ঘটে যায়। যা আমরা আগে দেখেছি, আমাদের পুঁজিবাজারে ১৯৯৬ সালে এবং আমেরিকার পুঁজিবাজারে ২০০৮ সালে। আমেরিকান সরকার পুঁজিবাজার ভালো করার জন্য Term Securities Lending Facility-র আওতায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ঋণ দিয়েছিল Non-deposit Bank-গুলোকে। এই ধরনের সরকারি কার্যক্রম এর আগে আমরা দেখেছি আমাদের পুঁজিবাজারেও। সরকার ‘ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী রি-ফাইন্যান্স স্কিম’-এর আওতায় আইসিবির মাধ্যমে স্বল্প সুদে ঋণ দিয়েছিল ব্রোকারেজ হাউজ এবং মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোকে।
স্টক এক্সচেঞ্জ, বিএসইসি এবং সরকারের যৌথ প্রচেষ্টায় পুঁজিবাজার অবশ্যই বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠবে। তবে Sustainability-ই হবে বড়ো চ্যালেঞ্জ। যার জন্য পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সব রকম সমস্যা চিহ্নিত করে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া অতি জরুরি।
আমার পুঁজিবাজারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে সম্পৃক্ততা এবং বিদেশে আর্থিক খাতে কোম্পানিতে সামান্য কাজের অভিজ্ঞতা থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো ক্ষুদ্র মনে হলেও বাজার Sustainability-র জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।
১. ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি বহন করার ক্ষমতা যথাযথভাবে যাছাই করা : ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাই বাজারের প্রাণ। তাদের বিনিয়োগ-শিক্ষা প্রদানের জন্য বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ এবং ব্রোকার হাউজগুলো শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে যথাযথ অবদান রাখছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অধিকাংশ বিনিয়োগকারী সম্পূর্ণ সঞ্চিত অর্থ শেয়ারবাজারের বিনিয়োগ করেন, যার কারণে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘ নিঃশ্বাস ‘সর্বস্ব হারিয়েছি’—এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বাস্তব অর্থে পুঁজিবাজারে অনেক লোকসান হতে পারে, সর্বস্ব হারানোর কোনো কারণ নেই, যদি বিনিয়োগকারী তার ঝুঁকি বহন করার ক্ষমতা অনুযায়ী বিনিয়োগের অর্থ বিভিন্ন Asset Class-এ (Term Deposit, Bond, Managed Funds and Share) বণ্টন করেন এবং মার্জিন লোন উপযুক্ত সময়ে ব্যবহার করেন (না করা ভালো)।
আমাদের পুঁজিবাজারে Bull মার্কেটে মার্জিন লোনের সর্বোচ্চ ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় এবং Bear মার্কেটে মার্জিন লোন দেওয়া বা নেওয়ার প্রবণতা নেই বললেই চলে। বিনিয়োগ কৌশল অনুযায়ী হওয়ার কথা উল্টো। Bull মার্কেটের সর্বোচ্চ ঋণ প্রদান শুধু বিনিয়োগকারীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, পুরো বাজারকে ঝুঁকিপূর্ণ করে। কারণ টানা কিছুদিন দরপতনে মার্জিন লোনে বিনিয়োগকারী একসঙ্গে বিক্রয়কারীর কাতারে দাঁড়াতে বাধ্য হন, যা মূল্য সূচকের দ্রুত পতন ঘটায়। ব্রোকার হাউজ এই প্রেক্ষিতে নিম্নোক্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে:
ক. নতুন বিনিয়োগকারীর Risk Profile যথাযথভাবে যাছাই করা এবং Account Opening From-এ উল্লেখ করা যেতে পারে, ‘পুঁজিবাজার ঝুঁকিপূর্ণ, আপনার সম্পূর্ণ সঞ্চয় পুঁজিবাজারের জন্য নয়।’
খ. মার্জিন লোন কেবল ভাবল বেনিফিট সম্ভাবনাময় (Income with Considerable dividend yield and growth) শেয়ারে বণ্টন। উল্লেখ্য, Australia-তে ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানকে বিনিয়োগবিষয়ক পারমর্শ দেওয়ার জন্য Australian Securities and Investments Commission-এর লাইসেন্স প্রাপ্ত Financial Adviser/Planner রয়েছে। যারা 6-step process পর্যালোচনা/সম্পাদনের মাধ্যমে বিনিয়োগ পরামর্শ দেন।
২. স্টক মার্কেট ডাটা বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা : বর্তমান বিনিয়োগকারীরা স্বল্প পরিসরে Stock Market data ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইট থেকে পান, যা গবেষণার জন্য যথাযথ নয়। ডিএসই-এর ওয়েব সাইটে ডাটা সার্ভিসকে পণ্য হিসেবে রাখা হয়েছে। যা অর্থের বিনিময়ে বিনিময় যোগ্য। সাধারণ বিনিয়োগকারী ডাটা ক্রয়ে কতটুকু সক্ষম তা বিবেচনা করা দরকার।
৩. দীর্ঘ সময় ধরে Non-performing তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে Observer/Administrator বসানো: স্টক এক্সচেঞ্জের Product তালিকায় Equity, Debt এবং Future থাকলেও এখনো Equity-কে একমাত্র Product হিসেবে ধরা যায়। এই Product-কে বিভিন Category-করণের মাধ্যমে (A, B, G, N and Z) সবল ও দুর্বল কোম্পানি বোঝা গেলেও এমন কিছু দুর্বল কোম্পানি আছে, যেগুলো ৩০-৪০ বছর আগে তালিকাভুক্ত, বছরের পর বছর কোনো লভ্যাংশের ঘোষণা নেই। এই সমস্ত Non-performing কোম্পানি চিহ্নিত করে সরকারের পক্ষ থেকে Observer/Administrator বসানো হলে শেয়ার হোল্ডাদের স্বার্থ রক্ষা পাবে।
৪. বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ: আমাদের পুঁজিবাজার এখনো পুরোপুরি অভ্যন্তরীণ পুঁজিনির্ভর বলা যায়। কারণ, বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগ নামমাত্র। বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্র পরিসর করার লক্ষ্যে ‘Open-end Mutual Fund-এ বিদেশি বিনিয়োগকারীকে Sponsor/Unit Holders হওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয় বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
৫. IPO-তে Public Subscription-এর জন্য ইস্যুয়ার কোম্পানির মোট শেয়ারের ন্যূনতম ২০ শতাংশ নির্ধারণ: বর্তমানে IPO-তে Sponsor’s শেয়ার হোল্ডিংয়ের ন্যূনতম স্তর নির্ধারিত। তবে পাবলিক শেয়ার হোল্ডারদের জন্য ন্যূনতম সীমা নির্ধারিত না থাকায় ইস্যুয়ার কোম্পানির নামমাত্র (সামান্য) শেয়ার বাজারে ছেড়ে তালিকাভুক্তির সুযোগ রয়েছে। এই ক্ষেত্রে পাবলিক শেয়ার অত্যন্ত কম থাকার কারণে বাজারমূল্য অনেক বেড়ে যায়। এই প্রক্রিয়া কোম্পানির Tax Benefit নিশ্চিত করে, Sponsor-এর সম্পদ-মূল্য (শেয়ারের অতি মাত্রায় দামের কারণে) বৃদ্ধি করে। তবে পাবলিক উপক্তত হয় না।
বাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে ইস্যুয়ার কোম্পানির মোট শেয়ারের ন্যূনতম ২০ শতাংশ Public Subscription-এর জন্য নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
n লেখক :ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বেল্ট অ্যান্ড রোড এসেট ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড
