সিনেটই ট্রাম্পের ভরসা
তালেব রানা
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে বলা আছে, বেশ কিছু অপরাধের জন্য প্রেসিডেন্টকেও পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া অর্থাত্ তাকে ইমপিচ করা যেতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রেসিডেন্টকে ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসনের ঘটনা বিরল। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগে মাত্র দুই জন প্রেসিডেন্ট অভিশংসিত হয়েছিলেন। ১৯৬৮ সালে অ্যান্ড্রু জনসন এবং ১৯৯৮ সালে বিল ক্লিনটন। তবে তাদের পদ ছাড়তে হয়নি। সিনেটের বিচার প্রক্রিয়ায় দুই জনই খালাস পান। আর প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কারণে ইমপিচ হবার আগেই পদত্যাগ করেছিলেন।
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিতর্ক তাড়া করছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অভিশংসিত হয়েছেন তিনি। গত জুলাইয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের এক ফোনালাপ থেকে এ বিতর্কের শুরু। যেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে চাপ দিয়েছিলেন আগামী নির্বাচনে তার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তার ছেলের বিরুদ্ধে তথাকথিত দুর্নীতির তদন্ত করতে। এ কারণে তিনি ইউক্রেনকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তাকে ঘুষ হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেন। গত বছরের মাঝামাঝি থেকে কয়েক মাসের তদন্তের পর ট্রাম্পকে অভিশংসন করতে দুইটি অভিযোগ (আর্টিকেলস অব ইমপিচমেন্ট) প্রস্তুত করে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের জুডিশিয়ারি ও ইন্টেলিজেন্স কমিটি। তার প্রথমটিতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের এবং দ্বিতীয়টিতে তার বিরুদ্ধে সংসদের কাজে বাধাদানের অভিযোগ আনা হয়। গত ১৮ ডিসেম্বর মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের ভোটে তৃতীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিশংসিত হন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হলেই পদ হারান না। বিল ক্লিনটন ও অ্যান্ড্রু জনসনও পদ হারাননি। এর কারণ কোনো প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরাতে হলে তাকে সিনেটে দোষী সাব্যস্ত করতে হয়। আর এক্ষেত্রে দুই-তৃতীয়াংশ সিনেটরের ভোট জরুরি। যারা জুরি হিসেবে সিনেটে প্রেসিডেন্টের বিচার করেন।
কয়েক সপ্তাহের অচলাবস্থার পর গত বুধবার সিনেটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিশংসনের বিচার শুরুর জন্য আর্টিকেলস অব ইমপিচমেন্ট পাঠায় প্রতিনিধি পরিষদ। সিনেটে অভিশংসনের পক্ষে যারা মামলা পরিচালনা করবেন সেই ‘ইমপিচমেন্ট ম্যানেজাররা’ আর্টিকেলস অব ইমপিচমেন্ট সিনেটের কাছে হস্তান্তর করেন। সিনেট আনুষ্ঠানিক এটি গ্রহণ করেছে।
পরদিন বৃহস্পতিবার সিনেটে আনুষ্ঠানিক শুরু হয়েছে ট্রাম্পের অভিশংসন বিচার প্রক্রিয়া। প্রতিনিধি পরিষদের তদন্ত কমিটির প্রধান অ্যাডাম শিফ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো উচ্চস্বরে পড়ে শুনিয়ে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এই বিচারে লড়াই করা অ্যাডাম শিফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো প্রেসিডেন্টই অভিশংসন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে নির্দেশ দেননি কিংবা তা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেননি। কিন্তু এখনো প্রেসিডেন্ট নিজের দোষ ঢাকতে ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। ঐ দিনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস নিজে শপথ নেন এবং সিনেটরদের শপথবাক্য পাঠ করান। ১০০ সিনেটর জুরি হিসেবে কাজ করবেন এবং প্রধান বিচারপতি এ বিচার প্রক্রিয়ায় সভাপতিত্ব করবেন।
আগামীকাল মঙ্গলবার সিনেটে বিচারের যুক্তিতর্ক শুরু হবে। এরই মধ্যে সিনেটে মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। তাদের মধ্যে ১৯৯৮ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের অভিশংসনের তদন্তকারী কেন স্টার ও দেশটির প্রখ্যাত আইনজীবী অ্যালান ডারসোউইজ রয়েছেন। হোয়াইট হাউজের পরামর্শক প্যাট সিপোলোন ও ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবী জে সেকুলোর নেতৃত্বে এই আইনজীবীরা সিনেটে লড়বেন। যদিও তথ্য-প্রমাণ পেশ ও সাক্ষীদের সিনেটে আনা নিয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। আগামীকালই এ বিষয়টির সুরাহা করতে সিনেটে একটি ভোটাভুটি হতে পারে।
ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হলে সিনেটে তাকে দোষী সাব্যস্ত করতে হবে। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় এ সম্ভাবনা কম। কারণ ১০০ সদস্যের সিনেটে এখন রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। ৫৩ রিপাবলিকান সিনেটরের কেউই এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যাওয়ার কথা জানাননি। এ অবস্থায় ট্রাম্পকে সরাতে হলে ৪৫ ডেমোক্র্যাট ও দুই স্বতন্ত্র সিনেটরের পাশাপাশি অন্তত ২০ রিপাবলিকান সিনেটরের সমর্থন লাগবে। কিন্তু সে সম্ভাবনা কম। কারণ প্রতিনিধি পরিষদের ভোটে ট্রাম্পের অভিশংসনের পক্ষে কোনো রিপাবলিকান সদস্য ভোট দেননি। তাই সিনেটের রায় ট্রাম্পের পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বরাবরই অনৈতিক কিছু করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সিনেটে বিচার শুরুর পর তিনি বলেছেন, দ্রুত বিচার সম্পন্ন করা হোক। তিনি অনেকটাই নিশ্চিত যে সিনেটে তিনি অব্যাহতি পাবেন। এর কারণ এই অভিশংসনের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত রিপাবলিকান নেতারা তার পাশে থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সম্প্রতি ট্রাম্প জানিয়েছেন, সিনেটে বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যেই আগামী সপ্তাহে তিনি দাভোসে যেতে চান বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকে অংশ নিতে। সিনেটের বিচার কতদিন চলবে তার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। সিনেটে বিল ক্লিনটনের অভিশংসনের বিচার শুরু হয়েছিল ১৯৯৯ সালের ৭ জানুয়ারি। আর তিনি অব্যাহতি পেয়েছিলেন প্রায় ৫ সপ্তাহ পর ১২ ফেব্রুয়ারি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই দলই এ বিচার প্রক্রিয়া শেষ করতে চায়। তাই বলা চলে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জানা যাবে ট্রাম্পের ভাগ্যে কী ঘটবে।
