পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারে
এম এ আলআমিন
ইউক্রেনের একটি যাত্রীবাহী বোয়িং মিসাইল ছুড়ে ভূপাতিত করার পর ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনৈতিক যোগাযোগ তৈরির পটভূমি তৈরি করেছিল। ইউক্রেনিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট ৭৫২ ইরান ৮ জানুয়ারি মিসাইল ছুড়ে বিধ্বস্ত করে। এতে ইরান ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের মোট ১৭৬ আরোহী নিহত হন। মানবিক দৃষ্টিকোণে এটি এক বিশাল ক্ষতি।
মার্কিন বোয়িং কোম্পানির নির্মিত বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ড্রিমলাইনারটি তেহরান থেকে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। এর আরোহীদের অধিকাংশই ছিল ইরান এবং ইরান-কানাডার দ্বৈত নাগরিক। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো প্লেন ক্রাশের ঘটনার পূর্ণ তদন্তের জন্য চাপ দিয়ে এসেছেন। শুক্রবার তিনি বলেন ইরানের উচিত ব্ল্যাকবক্স ফ্রান্সে পাঠানো। কানাডার প্রস্তাবে তেহরান শেষ পর্যন্ত রাজি হয়। শনিবার ইরানের তাসনিম বার্তা সংস্থা বিধ্বস্ত প্লেনটির ব্ল্যাকবক্স ও ভয়েস রেকর্ডারের তথ্য পরীক্ষার জন্য ফ্রান্স, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিশেষজ্ঞদের আসার বিষয়ে প্রস্তুত আছে তেহরান। ৩ জানুয়ারি বাগদাদে ইরানের কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলায়মানিকে যুক্তরাস্ট্রের ড্রোন ছুড়ে হত্যার পালটা ব্যবস্থা হিসেবে ৮ জানুয়ারি ভোরে ইরান ইরাকে দুটি মার্কিন ঘাঁটি উদ্দেশ্য করে কতগুলো মিসাইল ছোড়ে। এর মধ্য থেকে একটি বা দুটির আঘাতে এই মানবিক বিপর্যয়টি ঘটে যায়।
প্লেন ক্রাশের পর তেহরান এক অবাঞ্ছিত জটিলতার মুখে পড়েছে। তেহরান যদিও বলছে অনিচ্ছাকৃত কারণে ভুলটি হয়েছে কিন্তু সামগ্রিকভাবে এটি দেশটির এ ধরনের পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে সামাল দেওয়ার সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। প্লেনযাত্রীদের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে তেহরান শহর থেকে শুরু করে ইস্পাহানের মতো কয়েকটি শহরে রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করে সাধারণ মানুষ। প্রতিবাদকারীদের বেশির ভাগই ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। প্রথমেই প্রকৃত ঘটনার বিষয়ে সত্য না বলার জন্য তারা কর্তৃপক্ষের নিন্দা করে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো আন্দোলনকারীরা দেশটির শীর্ষ নেতা আলী খামেনি এবং ইসলামী শাসনের বিরুদ্ধেও স্লোগান দেয়। তেহরান এ ধরনের বিক্ষোভের জন্য ওয়াশিংটনের পরোক্ষ প্ররোচনাকে দায়ী করে। তবে পরিস্থিতি কেন হঠাত্ উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে তার সঠিক কোনো ব্যাখ্যা অবশ্য পাওয়া যায়নি। ঐ প্লেনের যাত্রীদের বেশির ভাগ ইরানি বা ইরানি বংশোদ্ভূত ছিলেন যারা বিদেশে মূলত ইরানের প্রতিনিধিত্ব করতেন। ছুটি কাটাতে ইরানে গিয়েছিলেন, পরে আবার ইউক্রেনে ফিরে যাচ্ছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্য বাণিজ্য ও যাত্রী পরিবহন উভয়দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ রুট। এ অঞ্চলের যাত্রীবাহী প্লেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইরাক-ইরান যুদ্ধ এবং এরপরে ইরাক-মার্কিন যুদ্ধের সময়ও কোনো যাত্রীবাহী প্লেন এভাবে ভূপাতিত হয়নি। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে ইউক্রেনের আকাশে একটি মালয়েশিয়ান যাত্রীবাহী বোয়িংকেও মিসাইল মেরে ধ্বংস করা হয়েছিল। ইরান অবশ্য কয়েকদিন বিলম্ব হলেও ভুল স্বীকার করেছে। তবে অনেকে বলছেন, তাত্ক্ষণিক অস্বীকার না করে তদন্তের কথা বলে সময় নিয়ে এটি করা যেত। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের চলমান উত্তেজনা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা সম্ভব বলে মত দিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। বৃহস্পতিবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। হাসান রুহানি বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা কঠিন হলেও তা সম্ভব। ‘যুদ্ধ কিংবা সামরিক সংঘাত প্রতিরোধে’ তেহরান সবসময় কাজ করছে বলেও তিনি জানান। তেহরানে ইউক্রেনের প্লেন বিধ্বস্তের ঘটনায় ইরানের কাছ থেকে ‘পূর্ণ সহযোগিতা’ পাওয়ার জন্য দেশটির ওপর চাপ প্রয়োগে কানাডা, ইউক্রেন, সুইডেন, আফগানিস্তান ও যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৃহস্পতিবার বৈঠক করেছেন। জানা গেছে, এই পাঁচটি দেশ আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার কথা ভাবছে।
