ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘনের ঘটনা দেখছেন না নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, নির্বাচনী পরিবেশ এখন পর্যন্ত সুষ্ঠু আছে। উত্সবমুখর পরিবেশে নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। ঢাকা উত্তর সিটির পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পর্কে এমনই মতামত দেন তারা। যদিও ভিন্ন মত দিয়েছেন কয়েক জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা। তারা বলেছেন, আচরণবিধি লঙ্ঘন করে প্রচার চলছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও ব্যবহার করছেন প্রার্থীরা। গতকাল রবিবার নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ঢাকা উত্তর সিটির আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক মতবিনিময় সভায় এসব আলোচনা উঠে আসে। ঐ সভায় নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম ম্যাজিস্ট্রেট ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দৃশ্যমান ভূমিকা রাখার নির্দেশ দেন।
ঢাকা উত্তর সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ভোটের দায়িত্ব পালনে আনসার ৫ হাজার শটগান প্রস্তুত রাখছে। ঐ সভায় কয়েকজন ম্যাজিস্ট্রেট পোস্টারের আকার, বাসাবাড়িতে ক্যাম্প স্থাপন করলে করণীয় বিষয়ে নির্দেশনা চান। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এসব তথ্য জানিয়েছে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে আনসারের ঢাকা জেলা কমান্ড্যান্ট আফজাল হোসেন বলেন, দুই সিটির প্রায় আড়াই হাজার ভোটকেন্দ্রে আনসার ও ভিডিপি নির্বাচনি দায়িত্বে থাকবে। এজন্য ৫ হাজার শটগান প্রস্তুত করা হচ্ছে। র্যাব-১-এর প্রতিনিধি নজরুল ইসলাম বলেন, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে র্যাব। এখন পর্যন্ত বড়ো কোনো ঘটনা ঘটেনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। ডিএমপির ডিসি অপারেশনস প্রবীর কুমার রায় বলেন, উত্সবমুখর পরিবেশে নির্বাচনি প্রচারণা চলছে। পুলিশকে যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, তা তারা যথাযথভাবে পালন করবেন। বিজিবির মেজর করিম বলেন, মানসিকভাবে বিজিবি প্রস্তুত রয়েছে। নির্দেশনা পেলেই ভোটের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত থাকবেন।
আরো জানা গেছে, সভায় ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তারা প্রায় একই ধরনের বক্তব্য রাখেন। ৬, ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শরিফুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব ভালো। আশা করি ভোটের দিন পর্যন্ত ভালো থাকবে। আচরণবিধি লঙ্ঘন করায় একজনকে জরিমানা করা হয়েছে। আরেক ম্যাজিস্ট্রেট জাবেদ সরকার বলেন, কিছু পোস্টারের আকার বড়ো। সেগুলো ব্যানার নাকি পোস্টার, তা বোঝা যাচ্ছে না। কিছু এলাকায় ছোটো ছোটো ঘরকে নির্বাচনি ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি তারা ব্যবহার করতে পারেন কি না, এ বিষয়েও জানতে চান তিনি। মিরপুর মডেল থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদপ্রার্থীরা অবাধে প্রচার চালাচ্ছেন। তবে ভিন্ন কথা বলেন ঢাকা জেলা সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা ফয়সাল কাদির। তিনি বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘন করে একেকটা এলাকায় একাধিক নির্বাচনি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। কাউন্সিলর পদপ্রার্থীরা দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে ভোট চাইছেন। ভোর থেকেই মাইকিং শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত নির্বাচনি প্রচার চলছে। এমনকি মসজিদেও ভোট চাওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্বাহী মেজিস্ট্রেট ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেন তিনি। ঢাকা উত্তর সিটির সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. তারিফুজ্জামান বলেন, মাইক ব্যবহারে প্রার্থীরা আচরণবিধি মানছেন না। আচরণবিধি প্রতিপালন হচ্ছে না। আমাদের কাছে অনেক অভিযোগ আসছে। এসব বিষয় দেখভাল করার দাবি জানান তিনি। সভায় নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক নুরুজ্জামান তালুকদার বলেন, নির্বাচনি বিধিবিধানের মধ্যে প্রার্থীদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। কেউ আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সরাসরি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে জানাবেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আবুল কাসেম বলেন, ‘আমরা যদি নির্বাচনি আচরণবিধি মানাতে পারি, তাহলে সুষ্ঠু ভোট উপহার দিতে পারব। সবাই বলছেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচনি পরিবেশ ভালো আছে। এটা আমাদের জন্য একটি ভালো দিক। আর বাকি যে কয়টা দিন আছে, সেই দিনগুলো আচরণবিধি প্রতিপালিত হলে নির্বাচন ৯৯ ভাগ সুষ্ঠু হবে।’
আর নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের ব্যর্থতা সম্পূর্ণভাবে আমাদের ওপর দিয়ে যায়। কমিশনকেই অভিযুক্ত করা হয়। আপনাদের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া আইনানুগ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব না।’ তিনি বলেন, ‘আচরণ বিধিমালা প্রয়োগ করার জন্য শাস্তি, জরিমানা করার চাইতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিন। অর্থাত্ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তা যদি একটু একসঙ্গে ‘মুভ’ করেন, তাহলেই আচরণবিধি ভঙ্গের পরিমাণ অনেকখানি কমে যাবে। শুধু চাই তাদের আন্তরিকতা, দৃশ্যমান ভূমিকা।’
