প্রতিদিন অনিন্দ্যকে বাগানবিলাস ঝোপটার পাশ থেকে কে যেন ডাকে। সে সাড়া দেয় না। মা বলেছে, কোনো দিকে তাকাবে না। কোনো কথায় কান দেবে না। ঘাড়গুঁজে পড়বে। পরীক্ষায় ভালো করতে হবে। অনিন্দ্য তাই করে। অনিন্দ্যর কচি কাঁধ ঝুঁকে গেছে। পিঠে বইয়ের বোচকা। পায়ে বড়ো ব্যস্ততা।
—এত ব্যস্ত কেন তুমি?
—আমার যে পরীক্ষা।
—কোথায় পরীক্ষা দিতে যাও?
—তা তো জানি না।
সে কোথাও দাঁড়ায় না। দিনটা বড়ো খরখরে। কোথাও একটু জিরোতে ইচ্ছে করে। পারে না। পরীক্ষা যে, পৌঁছতে দেরি হবে।
ফুটফুটে অনিন্দ্য। বন্ধুত্ব করতে ইচ্ছে করে ওর সঙ্গে। কিন্তু কথা বলার কোনো সুযোগই পায় না। তবু এই সকালে ধরে বসে তাকে।
—এত ঝুঁকে ঝুঁকে কোথায় যাও তুমি?
—পরীক্ষা দিতে।
কী বিষয়ের পরীক্ষা তা জানার আগেই ফুস করে রাস্তা পেরিয়ে যায় সে। কোচিংয়ের মাস্টার বড়ো একরোখা। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। বড়ো মন মরা লাগে তাকে দেখে। সে ভাবে আজ তাকে আকাশে সোনার থালার মতো চাঁদটাকে দেখাবে। তাহলে ঠিক মন ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু কখন যে ঘরে ঢুকে গেছে সে টেরই পায়নি। তার ঘরে চাঁদের আলো ঢোকে না। সে সূর্য ওঠা দেখে না। বৃষ্টির দিনে ছাতা মাথায় পরীক্ষা দিতে যায়।
একদিন সে জানতে চাইল—আচ্ছা তোমার খিদে পায় না?
—সে আমি কী করে জানব?
—তুমি এত মোটা ফ্রেমের চশমা পরো কেন?
—জানিনে।
—আজো পরীক্ষা?
—হ্যাঁ তো।
—কী পরীক্ষা?
—সে আমি বলতে পারব না।
—তবে পরীক্ষা দিতে যাও কেন?
—মা জানে।
—ভারি অবাক কাণ্ড তো! তোমার পরীক্ষা, তুমি জানবে না?
—আমায় এত প্রশ্ন কোরো না তো, ভালো লাগে না।
—তবে পরীক্ষা দিতে যেও না।
—পরীক্ষা তো দিতেই হবে।
—কত পাও পরীক্ষায়?
—মা জানে।
—তুমি জানো না? তাহলে কী জানো?
—আমি শুধু জানি পরীক্ষা দিতে হবে। পরীক্ষা খারাপ হলে গলা টিপে ধরবে মা। বাবা বাড়ি থেকে বের করে দেবে।
—ভালোই হবে। আমরা ঘুরতে বেরুব।
—না, আমার ভয় করে।
—আচ্ছা, রোজ কারা নেয় এত পরীক্ষা?
—সে আমি কী করে জানব! তাদেরকে তো আমি চিনি না। শুধু জানি তারা পরীক্ষা নেয়। তাদের চোখে কালো চশমা।
২
বাগানবিলাস ঝোপটার পাশে সে খুব মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকে আজ। অনিন্দ্যকে এখনো দেখা যাচ্ছে না।
—এই যে, এখানে একলা দাঁড়িয়ে কেন?
—অনিন্দ্যকে দেখার জন্য।
—তাকে আর দেখা যাবে না।
—কেন?
—আজ তার রেজাল্ট বেরিয়েছে।
—নিশ্চয়ই ভালো করেছে!
—না, তার রেজাল্ট তো গোল্ডেন হয়নি!
