সার্বিক ফলাফলে অনুষদের মধ্যে প্রথম হয়েছেন। কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের দরুন এরই মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আট শিক্ষার্থী মনোনীত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদকের জন্য। তাদের এ সফলতার পেছনে কারো ছিলেন বাবা-মা, পরিবার আবার কারো ভাই বা বোন, শিক্ষক। সবকিছু ছাপিয়ে কারো ছিলেন স্বামীও। কার উত্সাহে এতদূর আসা? আর পেছনের গল্পটাই বা কেমন ছিল? পাঠকদের জন্য স্বর্ণপদকজয়ী শিক্ষার্থীদের সফলতার গল্প লিখেছেন— মুজাহিদ হোসেন
মিতু পারভীন
অর্থনীতি বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ: ২০১৩-১৪
আমার বাসা সিরাজগঞ্জ। এসএসসি পরীক্ষার পর আমার বিয়ে হয়। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর আমার সন্তান জন্ম নেয়। নানা প্রতিকূলতা পার হয়ে আমার স্বামীর সহায়তায় আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হই। কিন্তু ভর্তির পর প্রথম তিন মাস আমি আমার সন্তান নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ি। আল্লাহর রহমতে দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার ক্লাসে মনোযোগ দিই। পড়ার সময় কম থাকায় খুব চিন্তিত ছিলাম পরীক্ষা নিয়ে, তারপরও আমি প্রথম বর্ষে পরীক্ষায় ৩.৮১ পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করি। মনে মনে অনেক সাধনা করতাম যেন আমি আমার স্থান এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক অর্জন করতে পারি। আমার স্বামী সবসময় আমাকে সাপোর্ট দিয়েছে। আমার নোট কপি, বই কেনা, কলম কেনা, ভর্তি, বিভাগের একাডেমিক কাজ অর্থাত্ সব বিষয়ে সে দেখভাল করত।
অরিন্দম বিশ্বাস
আইন বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ: ২০১৩-১৪
স্বর্ণপদক প্রাপ্তির যাত্রাটা শুরু হয়েছিল যখন বিভাগে প্রথম বর্ষের ফলাফলে প্রথম হই। অনেক চড়াই উত্রাই পেরিয়ে, চার বছর শেষে সিজিপিএ ৩.৫৫ পেয়ে অনার্সে আমি প্রথম হই। আমি এটা বলব না যে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক আমার একার অর্জন, এটা আমার বিভাগেরও অর্জন বটে। কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য পুরস্কার বা স্বীকৃতি যেকোনো ছাত্রছাত্রীর জন্য অনেক বড়ো একটা পাওয়া। আর সেই পুরস্কার যদি হয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে তাহলে তা যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্য হবে স্মরণীয় ঘটনা। আমি মনে করি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ শুধু একটা বিভাগ না, এটা একটা পরিবার যেখানে শিক্ষকরা শুধু শিক্ষাদান ও ভালো ফলাফল অর্জনে উত্সাহিত করেননি, সেই সঙ্গে আমাকে সার্বিকভাবে সাহায্যও করেছেন।
সাম্মে আমিনা তাসমিয়া
পরিসংখ্যান বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ: ২০১৩-১৪
পিতা-মাতার ন্যায় ও সত্যের শাসন একমাত্র জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার নিয়মানুবর্তিতা ও মমত্ববোধ আমাকে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে এতদূর উঠতে শিখিয়েছে। দেখিয়েছে অসীমকে জয় করার পথ। আমার বিভাগের শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। আমার পরিসংখ্যান বিভাগ আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। এই বিভাগে অধ্যয়ন করতে পেরে আমি সত্যিই গর্বিত। অনেকদিনের অপেক্ষার পর আজ আমার জীবনে এ দিনটা এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন আমার নামটি তালিকাভুক্ত করেছে জেনে আমার ভীষণ ভালো লেগেছে এবং এটা ভেবে আরো ভালো লাগছে যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেওয়া পদকটি আমার গলায় শোভা পাবে। আমি যেন আরো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে পারি এজন্য সকলের কাছে দোয়া কামনা করছি।
মো. সোহেল রানা
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি, শিক্ষাবর্ষ :২০১৩-১৪
প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক পাওয়া সবার জন্য আনন্দের আমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। অনেক ভালো লাগছে। আসলে এই ভালো লাগার অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি এটা অর্জন করেছি, তার জন্য প্রথমেই আমি মহান আল্লাহ পাকের কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। তিনি চেয়েছেন বলেই আমি এটা অর্জন করতে পেরেছি। তারপর সব থেকে যাদের অবদান বেশি, তারা হলেন আমার বাবা-মা। তারা অনেক কষ্ট করেছেন আমার জন্য। তাদের এই কষ্ট আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। আসলে অর্জনটা তাদের জন্যই সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি আমি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের প্রতি অনেক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আসলে অর্জনটা সম্ভব হয়েছে শুধু পরিশ্রমের কারণে। মেধা সবারই আছে, কিন্তু পরিশ্রম সবাই করতে চাই না। আমি মনে করি, পরিশ্রম করলে যে কেউ এটা অর্জন করতে পারবে।
মোছা. সাবিনা ইয়াসমিন
ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ :২০১১-১২
ছোটোবেলা থেকেই যখন কোনো পরীক্ষা বা প্রতিযোগিতায় প্রথম দিকে নিজের নাম দেখতাম, তখন মনের মধ্যে ভীষণ ভালো লাগা কাজ করত। সেই রেশ ধরেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার প্রথম দিক থেকেই নিজেকে শত ভিড়ের মধ্যে টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে এই স্রোতে আমার সফলতা আমাকে আজকের এই সম্মান এনে দিয়েছে, যার জন্য আমি আমার বিভাগের সব শিক্ষকের কাছে কৃতজ্ঞ। আমি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি আমার বাবা-মাসহ পরিবারের সব সদস্যের প্রতি। আমি বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে, যাদের এই উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক আমাদের নতুন নতুন স্বপ্ন দেখতে উত্সাহিত করবে।
মাহফুজুর রহমান
ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইসিই), শিক্ষাবর্ষ :২০১৩-১৪
আমি বিগত চার বছরের প্রতিটি দিন চেষ্টা করেছি প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিন শেষ করার জন্য। আর সেই কাজটি করতে গিয়ে আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। আল্লাহ আমার পরিশ্রমের উত্তম প্রতিদান দিয়েছেন, এজন্য আমি অত্যন্ত আনন্দিত। প্রতিটি অর্জনই ভালো লাগার কাজ করে থাকে। ঠিক তেমনি স্বর্ণপদক পাওয়াও খুব বড়ো একটা অর্জন। এজন্য প্রথমেই আমি আল্লাহ তায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমার এই স্বর্ণপদক পাওয়ার পেছনে অনেক মানুষেরও অবদান রয়েছে, তার মধ্যে আমার আম্মু ও আব্বু উল্লেখযোগ্য। তারা সব সময়ই আমার পাশে ছিলেন, আমি আমার শিক্ষকদের কাছেও কৃতজ্ঞ, তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা এবং পরামর্শ দিয়ে সব সময় আমার পাশে থাকার জন্য।
মো. আবু বক্কর সিদ্দিক
আরবি বিভাগ, শিক্ষাবর্ষ : ২০১৩-১৪
আমার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল কওমি মাদ্রাসায় কোরআন হিফজ করার মাধ্যমে। সেখান থেকে বাংলাদেশের মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পেছনে অনেক প্রতিবন্ধকতা ও সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। তবে অনেকের উত্সাহ আমাকে সাহস জুগিয়েছে। আমার এই সাফল্যের পেছনে আমার শিক্ষানুরাগী মা-বাবার অবদান সবচেয়ে বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জরি কমিশন কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক ২০১৮ সালের জন্য চূড়ান্তভাবে মনোনীত হয়েছি জেনে অত্যন্ত আনন্দ বোধ করছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরে বিভাগের শিক্ষকদের যোগ্যতা, দক্ষতা, আন্তরিকতা দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। বিভাগে প্রথম হওয়া এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রায় সব শিক্ষক পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে উদ্বুদ্ধ করেছেন। নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হয়ে স্যারদের লেকচার শুনতাম এবং প্রচলিত শিট বা নোট ইত্যাদির ওপর নির্ভর না করে লাইব্রেরি থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নোট তৈরি করতাম। আমার অর্জিত জ্ঞান যেন দেশ ও জাতির কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে পারি, সবার কাছে এই দোয়াপ্রার্থী।
ইশরাত জাহান
ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, শিক্ষাবর্ষ :২০১২-১৩
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকি ভালো রেজাল্ট করার জন্য। রেজাল্ট ভালো হওয়ার কারণে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক পেতে যাচ্ছি— এটির অনুভূতি মুখে বলে প্রকাশ করা যাবে না। এই অর্জনের জন্য প্রত্যাশায় ছিলাম দীর্ঘদিন। এখন দেখছি প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নিল। আমার এই অর্জন পুরোটাই আমার মা-বাবাকে উত্সর্গ করতে চাই। কারণ আমি গ্রাম থেকে আসা সাধারণ একটা মেয়ে। আমার বাসা পিরোজপুরে। আর ওখান থেকে এত দূরে পড়তে আসার জন্য মা-বাবা আমাকে যদি সাহস ও সাপোর্ট না দিতেন তাহলে এটা কখনো সম্ভব হতো না। এই অর্জনের পেছনে যারা সব সময় আমার পাশে থেকেছেন, সহযোগিতা করেছেন, সবার প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।
