রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এইডস রোগী বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২০, ২২:৩১

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এইডস রোগীর সংখ্যা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। এইডস রোগ ছড়িয়ে পড়ছে স্থানীয়দের মাঝেও। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের মধ্যে এই সংখ্যা ছিল ৮৫ জন। ২০১৯ সালের মার্চে এইডস রোগীর সংখ্যা ৩১৯ জনে দাঁড়ায়। এছাড়া অপরিচ্ছন্নতা, অজ্ঞতা ও অশিক্ষার কারণে রোহিঙ্গারা আক্রান্ত হচ্ছে বিভিন্ন সংক্রামক রোগে। ডায়রিয়া, চর্ম ও যৌন রোগসহ নানা রোগে জর্জরিত এখানকার বাসিন্দারা।

উখিয়ার স্বাস্থ্য কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, গত তিন দিনে ৩৫ হাজার কলেরা টিকা খাওয়ানো হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসের ৯ তারিখ পর্যন্ত এ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গারা আসার মাসখানেক পরে শারীরিক পরীক্ষায় দেখা যায় ৮৫ জনের শরীরে রয়েছে এইচআইভি ভাইরাস। পরের বছর আগস্টে সেটি গিয়ে দাঁড়ায় ২৭৩ জনে। আর ২০১৯ সালের ৮ মার্চে তা বেড়ে গিয়ে ৩১৯ জনে উন্নীত হয়। এর মধ্যে চিকিত্সা নিচ্ছেন ২৭৭ জন। আর এই এইডসে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যানুসারে গত দুই মাসে কলেরার জীবাণু পাওয়া গেছে ৩৫০ রোহিঙ্গার শরীরে। স্থানীয় শতাধিক বাসিন্দার শরীরেও মিলেছে এই রোগের জীবাণু। নানা ধরনের যৌন ও চর্ম রোগ তাদের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে ।

কুতুপালং এলাকার হোপ ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে এইচআইভি ভাইরাস শরীরে নিয়ে এসেছেন এক নারী। তিনি মিয়ানমারে ভান্তেদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তিনি এই রোগের কথা আগে থেকে জানতেন না। নানা শারীরিক সমস্যা নিয়ে বারবার হাসপাতালে আসতে শুরু করেন। পরে জানতে পারেন, তিনি এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

এক নারী এনজিও কর্মীর সহযোগিতায় তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই রোগের কারণে রীতিমতো একঘরে হয়ে পড়েছেন তিনি। কেউ তার সঙ্গে থাকতে চায় না। একসঙ্গে খেতে চায় না। তার পরিবারের লোকজন পর্যন্ত কথা বলেন না ঠিকমতো। এইচআইভি আক্রান্ত আরেক জন পুরুষ জানান, তিনি মালয়েশিয়াতে ছিলেন। সেখান থেকে নিয়ে এসেছেন এই রোগ। এইডসে আক্রান্ত হবার কারণেই তাকে মালয়েশিয়া থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। তিনি ধারণা করেন, মালয়েশিয়াতে অবৈধ মেলামেশার কারণেই এই রোগ হয়ে থাকতে পারে।

হোপ হাসপাতালের চিকিত্সক রেবেকা জাহান বলেন, এইচআইভি আক্রান্ত রোগীরা যে কোনো রোগকেই সাধারণ রোগ ভেবে থাকেন। অনেকেই চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে আসেন না। আর আসলেও চলেন না পরামর্শ মতো। এছাড়াও ক্যাম্পে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ যৌন জীবনে কোনো ধরনের নিয়ম মেনে না চলা। তিনি বলেন, তাদের কবিরাজি ওষুধ ও ঝাড় ফুঁকের ওপর প্রবল বিশ্বাস। অধিকাংশ রোগীই হাসপাতালে আসেন রোগ জটিল আকার ধারণ করার পর। তিনি বলেন, ক্যাম্প এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে কলেরা রোগীর সংখ্যা। এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার প্রধান কারণ অসচেতনতা। বিভিন্ন দাতা সংস্থার মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে পানির ট্যাংক। তবে সুপেয় পানি পানে অনীহা রয়েছে তাদের। আর বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় টয়লেট ব্যবহারের জন্যও।

ক্যাম্পের চিকিত্সক ড. ইব্রাহীম ইসলামও বলেন অসচেতনতার কথা। তিনি বলেন, একসঙ্গে গাদাগাদি করে থাকার কারণেও নানাবিধ রোগের বিস্তার হচ্ছে। ক্যাম্পে ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন ধরনের যৌন রোগ। জানা যায়, ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই। এই রোগটি মূলত অপরিচ্ছন্নতার কারণে হয়ে থাকে। অধিকাংশ সময়ই এসব রোগ নিয়ে আসতে চান না তারা। উখিয়া উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রঞ্জন কুমার দে সাংবাদিকদের জানান, রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়রাও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারে। যেমন :বর্তমানে স্থানীয়দের কলেরার টিকা খাওয়ানো হচ্ছে। তিনি বলেন, যে কোনো রোগে আক্রান্ত হলে সরাসরি হাসপাতালে এসে চিকিত্সকদের পরামর্শ মতো চিকিত্সা নেওয়া প্রয়োজন। এইডস একটি মারাত্মক ব্যাধি, রোগটি রোহিঙ্গাদের থেকে ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়দের মাঝেও।