সুদীপ চক্রবর্তী বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের একজন পরিচিত মুখ। ইতিমধ্যেই তিনি নির্দেশক হিসেবে বেশ খ্যাতিমান হয়েছেন। নাট্য নির্মাণে নিজের শিল্পবোধ ছড়িয়ে দিয়ে মুগ্ধ করতে পেরেছেন দর্শককে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রামা অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তী তার কীর্তির জন্য সম্মানিত হয়েছেন মঞ্চের নানা পুরস্কার ও সম্মাননায়। বর্তমানে নাটকের উচ্চতর শিক্ষা নিচ্ছেন ইংল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। মঞ্চে তার নন্দিত নির্মাণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাটক হলো ‘মহাজনের নাও’, ‘চাকা’, ‘দখিনা সুন্দরী’, ‘লাল জমিন’সহ আরো অনেক। নন্দিত এই গুণী নাট্য নির্দেশকের সঙ্গে কথা বলেছেন মাহবুব আলম
বাংলা নাটকের বৈশ্বিক রূপ কেমন?
এটা দুই ভাবে হতে পারে, একটা হলো নাটকের বিষয়বস্তুর দিক থেকে, আরেকটা বলা যেতে পারে নাটকের উপস্থাপনার দিকে থেকে। সেদিক থেকে বলতে পারি, আমাদের এখানে বহুত্ববাদী নাটক রচিত হচ্ছে, যেটা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সারা বিশ্বকে স্পর্শ করে। কিন্তু উপস্থাপনার দিক থেকে আমাদের যে নাগরিক নাট্যচর্চা, সেটা বৈশ্বিক দিক থেকে বিবেচনা করলে বলতে হয়, আসলে আমাদের নানা দিকে দুর্বলতা আছে। সেটা আমাদের অভিনয়, প্রয়োগ শৈলী, নাট্য মঞ্চায়ন ইত্যাদি। এই জায়গাগুলোয় আরো গভীরভাবে কাজ করলে আমরা এদিক থেকেও বেশ ভালো করব।
দর্শক-উপস্থিতির ঘাটতি কমানোর ক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন?
দর্শক-উপস্থিতির ঘাটতি কমাতে হলে আমাদের প্রথমেই যে দিকে খেয়াল রাখতে হবে, সেটা হলো যে ভালো নাটক মঞ্চায়ন হচ্ছে কি না, সেটা নিশ্চিত করা। তারপর আমাদের নাটক নিয়ে একটা জায়গায় না থেকে দর্শকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন। সেটা শুধু ঢাকার ক্ষেত্রে নয়, সব শহরে নগরে যেতে হবে। ছোট-বড়ো বিভিন্ন মিলনায়তন ব্যবহার করা প্রয়োজন। আরেকটা বিষয় হলো, মানুষ তার সমকালীন বিষয়বস্তু নাটকের মধ্যে দেখতে চায়, অর্থাত্ জীবনঘনিষ্ঠ বিষয় নাটকে না থাকলে অনেক দর্শক মঞ্চে আসতে চায় না। আমাদের অনেক কাজ হয় যেখানে জীবনঘনিষ্ঠ কোনো বিষয় থাকে না বা সমকালীন কোনো বিষয় থাকে। তাতে করে খুব স্বভাবতই দর্শক একটা সময় নাটকের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
মৌলিক নাটকের সংকট—কথাটির সঙ্গে আপনি একমত পোষণ করেন কি না?
না। এই কথাটির সঙ্গে আমি একেবারেই একমত পোষণ করি না। অনেক মৌলিক নাটক রচিত হচ্ছে, কিন্তু সব পাঠক বা নাটকের মানুষের কাছে এই লেখাগুলো পৌঁছাচ্ছে না। বাংলাদেশে মৌলিক নাটক নয় পাঠকের অভাব। আমরা যারা মৌলিক নাটকের অভাব বলছি, তারা আসলে খোঁজই রাখছি না কারা নাটক লিখছে। আমাদের জানা দরকার, আসলে কারা মৌলিক নাটক লিখছে। আবার যারা নাটক লিখছেন তাদেরও উচিত আসলে জানান দেওয়া। তবে আমি মনে করি, পাঠক হিসেবে, নাট্য দর্শক হিসেবে, নাট্যকর্মী হিসেবে দায়িত্ব যে কারা নাটক লিখছে, সেগুলো খুঁজে বের করা। আবার ধরুন, আমাদের শিল্পকলা একাডেমি, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, পথ নাটক পরিষদ, গ্রাম থিয়েটার বা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট—এদের কেউ বা সমন্বিতভাবে নাটক পাঠের আয়োজন করে তাহলেও এই সংকটের ভাবনাটা কেটে যাবে। এতে করে তরুণ নাট্যকার উত্সাহিত হবে।
বাংলা নাটকের প্রায়োগিক উত্কর্ষ সাধনে কি ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার?
আগেও এর খানিকটা বলেছি। প্রায়োগিক উত্কর্ষ সাধনে আমাদের নানা রকমের সীমাবদ্ধতা আছে। প্রয়োগে আমরা যারা কলাকার—তাদের যারা কুশিলব—তাদের আরো প্রশিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। সেই সঙ্গে তাদের দেখার চোখ আরো বড়ো হওয়া দরকার। এখন তো ইউটিউবে অনেক কাজ দেখা যায়। আমাদের একে অপরের কাজ দেখা দরকার। এটা আরো ভালো হবে যদি শিল্পী তার দেখার চোখ আরো ছড়িয়ে দেয়। শুধু নাটকের মধ্যে সীমবদ্ধ না থেকে শিল্পের সব মাধ্যম যদি সে অনুধাবনের চেষ্টা করে, তবে বেশ ভালো হবে।
ভালো নাট্য নির্মাণে নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা—এই তিনের সমন্বয় কীভাবে হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন?
আমি যে কাজটি করি, সেটা হলো—ধরুন, আমার যদি একটি নাটক পাঠ করে ভালো লাগে, সেই নাটকটি করার সময়ে অথবা আমি যখন কোনো নাটকের দলে কাজ করতে যাই, তখন আমি কর্মশালার মাধ্যমে বুঝে নিতে চাই যে এই দলের নাট্যকর্মীরা কোন ধরনের নাটক করার জন্য তৈরি। তাদের মন, শরীর, সামর্থ্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কোন ধরনের পাণ্ডুলিপি মঞ্চে আনা যায়। আমার ভাবনাটা এ রকম। আবার অন্য কোনো ডিরেক্টর নিশ্চয়ই অন্য কোনো ভাবে ভাবেন। তবে আমি কর্মশালার পরে দলের কাছে প্রস্তাব রাখি যে আপনারা এই ধরনের নাটক করতে পারেন। আবার নাটক নির্বাচনের পরে নাট্যকারের সঙ্গে একাধিকবার বসতে হয়। তবে এই তিনের মধ্যে যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে দ্বিমত এবং সহমত পোষণ করা জরুরি।
