‘খুলে যাও সিম সিম’

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৫৫

আরব্য রজনীর একটি ধুন্ধুমার গল্প ‘আলিবাবা চল্লিশ চোর’। শৈশবে যে কটি গল্পসমগ্র পড়ে বড়ো হয়েছি, তার মধ্যে আরব্য রজনী একটি। তখন যেহেতু স্মার্ট ফোন বা টিভি ছিল না, আমাদের শৈশব কেটেছে গল্পের বই পড়ে আর মাঠে খেলাধুলা করে। শৈশব যে কত আনন্দের হতে পারে, তা বর্তমান প্রজন্মের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হবে। বাগদাদের চল্লিশ চোর সাধারণ মানুষের ধনসম্পদ লুণ্ঠন করে পাহাড়ের একটি গুহায় জমা করত। গুহার দরজা খোলার পাসওয়ার্ড জানা ছিল একমাত্র ডাকাত সর্দারের। সেই পাসওয়ার্ড ছিল ‘খুলে যাও সিম সিম’। এটি বললে ডাকাতি করে আনা মণিরত্ন রাখার গুহার দরজা খুলে যেত। এরপর সর্দার তার চল্লিশ ডাকাতকে নিয়ে গুহায় প্রবেশ করে ডাকাতির সোনাদানা সেখানে জমা রেখে চলে যেত। জঙ্গলে কাঠ কাটতে যাওয়া এক গরিব কাঠুরে আলিবাবা ডাকাতদের এসব কর্মকাণ্ড গোপনে দেখে ফেলে। পাসওয়ার্ডটা শুনে মুখস্তও করে নেয়। তারপর আলিবাবা নিজেই গোপনে গুহায় ঢুকে ডাকাতদের রেখে যাওয়া মণিরত্ন চুরি করতে থাকে। চোরের ওপর বাটপারি আরকি। সে অন্য প্রসঙ্গ।

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে টাকা পাচার হচ্ছে তা এখন নতুন কোনো খবর নয়। কত টাকা পাচার হচ্ছে, তা নিয়ে অনেক সংস্থা হিসাব করছে প্রতিদিন। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন আন্কটাড (UNCTAD) হিসাব করে দেখিয়েছে, সেই বছর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে আহরিত আয়ের ৩৬ ভাগের সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। সেই হিসাবে সেই পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ৫০ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। তবে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য সংখ্যাটি সম্ভবত প্রকাশ করেছিল একই বছর নিউ ইয়র্কভিত্তিক গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি সংস্থা সংক্ষেপে জিএফআই (Global Financial Integrity, GFI)। তাদের মতে, বাস্তবে এই সংখ্যা ৭৫ হাজার কোটি টাকা। এটা এক বছরে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ। এই পাচার হওয়া অর্থ পুরোটাই এ দেশের জনগণের। এই টাকা দেশের সাধারণ মানুষ পাচার করে না। যারা করে তারা শিক্ষিত মানুষ, যাদের মধ্যে আছেন পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, শিল্পের মালিক, শেয়ারবাজারের ডাকাতেরা, ব্যাংকের ঋণখেলাপি, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, মিডিয়ার মালিক, চোরাকারবারি, ব্যাংকের মালিক, কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক, সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালক, কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সামরিক-বেসামরিক আমলা প্রমুখ।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার প্রায় সব বক্তৃতায় বলতেন, ‘আমার দেশের ৫ ভাগ মানুষ, যাদের আমরা শিক্ষিত বলি, তারাই হচ্ছে এ দেশের চরম দুর্নীতিবাজ আর চোর। আমার দেশের খেটে খাওয়া কৃষক-শ্রমিক দুর্নীতি করে না, করে এই শিক্ষিতজনেরা।’ তার সেই কথা তখনো যেমন সত্য ছিল, বর্তমানে একইভাবে সত্য। তখন যারা দুর্নীতি করতেন, বর্তমানের তুলনায় তারা ছিলেন ছিঁচকে চোর। তাদের তুলনায় বর্তমানে যারা দুর্নীতি করেন, দেশের টাকা বাইরে পাচার করেন, তারা সবাই ডাকাত। আগের চোরেরা একটু লুকিয়ে-চাপিয়ে চুরি করতেন, বর্তমানে যারা ডাকাতি করেন, তারা মাইকে ঘোষণা দিয়ে করেন। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড সদস্যদের জন্য আটটি গাড়ি কেনা হলো, প্রতিটি ৩ কোটি টাকা দামে। এটি সংবাদ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হলে তারা সাফাই গেয়ে বললেন, এই গাড়িতে বিদেশি মেহমানরা চড়বেন। তাদের ভাষায় যারা বিদেশি মেহমান, তারা নিজ দেশে এত দামি গাড়ি কেনার স্বপ্নও দেখেন না। বাস্তবে ব্যবহার করেন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকেরাই (কিছু বোর্ড সদস্য)। সপরিবারে বিদেশ সফর করেন শিক্ষা সফর বা বোর্ড সভার নামে  বিমানের প্রথম বা বিজনেস ক্লাসে। থাকেন পাঁচতারকা হোটেলে। বিল আসে কয়েক হাজার ডলার। কার টাকায় এই বিলাসিতা? এতে ক্ষতিগ্রস্ত বেসরকারি পর্যায়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি সম্ভাবনাময় খাতের সুনাম। এদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন তদন্ত করে, সরকারকে রিপোর্ট দেয়, কাজের কাজ কিছুই হয় না।

কানাডার টরন্টো শহরের বেগমপাড়ার কথা কম-বেশি সবাই জানেন। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে দেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার ও বেগমপাড়া নিয়ে তিন কিস্তিতে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকাটি তা করে একটি জাতীয় দায়িত্ব পালন করেছে। এই বেগমপাড়ার আদি বাসিন্দারা এই দেশের একশ্রেণির  ব্যবসায়ীদের পরিবারবর্গ। তৈরি পোশাকশিল্প এ দেশের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রাখছে, তা কেউ অস্বীকার করবেন না। এটি হলো মুদ্রার এক পিঠ। অন্য পিঠ হচ্ছে এই শিল্পের ও অন্যান্য খাতের শিল্পের মালিকদের একটি বড়ো অংশের পরিবার দেশে থাকেন না। সবাই মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, লন্ডন, দুবাই, যুক্তরাষ্ট্র আর টরন্টোর বেগমপাড়ায় থাকেন। কেউ যদি প্রশ্ন করেন স্থায়ীভাবে পরিবারকে তারা কেন বিদেশে রাখেন, তখন তাদের একটাই উত্তর, ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা আর নিরাপত্তা। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাংলাদেশ থেকে কীভাবে ভালো তা এখনো আমার কাছে বোধগম্য নয়। একবার এক বড়ো মাপের  ব্যবসায়ী আমাকে তার ভিজিটিং কার্ড দিলে দেখি সেই কার্ডে লেখা, তাকে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ঢাকার একটি পাঁচতারকা হোটেলের লবিতে পাওয়া যাবে। এমন ভিজিটিং কার্ড আমার বাপের জন্মে দেখিনি। জানতে চাইলে বলেন, পরিবারের সবাই বিদেশে থাকেন তো, তাই তিনি বিকালটা এই তারকাখচিত হোটেলেই কাটান। এখানকার সুরিখানাটাও ভালো। এমন ব্যবসায়ীর সংখ্যা কম নয়। বেগমপাড়ায় বেড়ে ওঠা কারো ছেলেমেয়ে যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পণ্ডিত অথবা গবেষক বা সফল পেশাজীবী হয়েছেন তা তো মনে হয় না। বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়ী কিছুদিন পরপরই জিগির তোলেন তাদের ব্যবসার অবস্থা এখন মুমূর্ষু। সরকারি প্রণোদনা না দিলে মৃত্যু অনিবার্য। সরকারও অনেক সময় এসব ব্যবসায়ীর কথায় বিশ্বাস করে তাদের চাহিদামতো প্রণোদনা দিয়ে থাকেন। শেষ অবধি এই প্রণোদনার অপব্যবহার করে আরো নতুন উদ্যমে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হয়। ঋণখেলাপি সংস্কৃতি বন্ধ করার জন্য সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় কত রকমের চেষ্টা করেছে, কাজ হয়নি কিছুই। বরং ফল হয়েছে উলটো। খেলাপি ঋণ জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। মালয়েশিয়ায় কমপক্ষে ৩০ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। কিছু ব্যতিক্রমের কথা বাদ দিলে তারা প্রায় সবাই দেশ থেকে অবৈধ উপায়ে অর্থ বিদেশে নিয়ে আসে। তাদের অভিভাবকদের মধ্যে আছেন ঐ সব কালো টাকার মালিক।

একজন প্রশান্ত কুমার হালদারের খবর ইতোমধ্যে সবাই জেনেছেন। দেশের জনগণের ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নিয়ে দেশ ছেড়েছেন। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, হালদারের এই কীর্তি নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখের সামনে ঘটেছে, অনেক ক্ষেত্রে তাদের সমর্থনও হালদার পেয়েছেন। এক-এগারোর পর দুবাইভিত্তিক একটি আবাসন কোম্পানি ঢাকায় এসে একটি তারকাখচিত হোটেলে দোকান খুলে বলেছিল, তারা দুবাইতে অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি করতে এসেছে। হোটেলে এসে তাদের সঙ্গে দেখা করে সামর্থ্যবানেরা তাদের নাম তালিকাভুক্ত করতে পারেন। কাঁচা টাকার মালিক আর ঋণখেলাপিদের লাইন পড়ে গেল হোটেলে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড হানা দিলে তারা সেখান থেকে দ্রুত সটকে পড়ে। বাংলাদেশের দুর্নীতি-সংস্কৃতির ইতিহাস অনেক পুরোনো। বঙ্গবন্ধুর আমলের কথা বলছিলাম, তখন দুর্নীতির ধরনটা ছিল স্থূল। কম্বল বা রিলিফ চুরি থেকে লাইসেন্স পারমিট বিক্রি করা আর চোরাকারবারি করা, মজুতদারি  এসবের মধ্যেই এই দুর্নীতি সীমাবদ্ধ ছিল। বেগম জিয়ার আমলে তার ছেলে তারেক রহমানের হাতে পরে দুর্নীতি সূক্ষ্ম শিল্পে পরিণত হয়েছে। বতর্মানে সেই ধারাবাহিকতা আরো জোরদার হয়েছে মাত্র। সোজা হিসাবে বাংলাদেশের দুর্নীতি আর লাগামহীন অর্থ পাচার যদি না হতো, দেশের প্রবৃদ্ধি কমপক্ষে ২ শতাংশ বাড়তে পারত। দেশে আরো একাধিক পদ্মা সেতু অথবা কয়েক শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হতে পারত। দেশে একটি শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছিল, কিন্তু সেই শুদ্ধি অভিযান বর্তমানে ঢিলে হয়ে গেছে বলে সাধারণ মানুষ মনে করে। অনেকে সবকিছুর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে তাকিয়ে থাকেন। তাই যদি হয়, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা এনবিআর কী কারণে এত ঠাটবাট নিয়ে থাকে? শুরু করেছিলাম চল্লিশ চোরের গল্প দিয়ে। ব্যবস্থা না নিলে চল্লিশ চোর চল্লিশ হাজার চোরে উপনীত হতে বেশি সময় লাগবে না।

n লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক