সাতসকালে মোহাম্মদপুর থানার ওসি তদন্ত গণেশগোপাল পাইন ফোন করে বললেন, দয়া করে একটু আসবেন মিস্টার ডিটেকটিভ! জটিল কেসে ফেঁসে গেছি। তারপর একটা অ্যাড্রেস টেক্সট করলেন তিনি।
ডিটেকটিভ অলোকেশ মাত্র মর্নিংওয়াক শেষ করে শাওয়ার নিয়েছেন। এখন তার নাশতাসহযোগে জমিয়ে এক মগ ধূমায়িত কফিপানের কথা। অথচ জটিল কেসের কথা বলে ভদ্রলোক এক্ষুনি তাকে রাস্তায় নামাতে চাইছেন!
ইনফ্যাক্ট, ইন্সপেক্টর গণেশগোপাল পাইন তার অচেনা কেউ নন, বরং বিশেষ পরিচিত। কিন্তু জটিল কেস বলতে তিনি ঠিক কী বুঝিয়েছেন তা পরিষ্কার নয়! খুনটুন নয় তো!
মিছে সময় নষ্ট না করে রেডি হয়ে নিচে নামলেন অলোকেশ। ইকবাল রোড থেকে মোহাম্মদপুর থানা খুব দীর্ঘ পথ নয়, বরং বলা যায় পাথর-ছোড়া দূরত্ব। বেশ আমুদে ও মিশুকে লোক গণেশগোপাল পাইন। তার সঙ্গে আলাপচারিতা কার্তিক মাসের তেলতেলে কই মাছের মতোই উপাদেয়। মোহাম্মদপুর থানার উদ্দেশে যাত্রা করে সহসাই তার ভুল ভাঙল। অকুস্থল মানে ঘটনার স্পট তো মোহাম্মদপুর থানা নয়, তার গন্তব্য গণেশগোপাল টেক্সট করে পাঠিয়েছেন। সাত-এর এ, ধানমন্ডি। বাড়ি নম্বর একশ কুড়ি। ফ্ল্যাট ডি/ফাইভ।
অলোক স্পটে গিয়ে দেখেন মেলা মানুষের ভিড়। শুনতে পেলেন কেউ একজন খুন হয়েছেন। তিনি বয়স্ক লোক। মাত্র রিটায়ার করেছেন। খুনের কথা শুনে কাঁঠালমাছির মতো আশপাশের পাবলিক সব জমায়েত হয়েছে। হুজুগে বাঙালি!
ভিড় ঠেলে ভেতরে যান ডিটেকটিভ অলোকেশ। গিয়ে দেখেন ইন্সপেক্টর গণেশগোপাল ও তার টিম লাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন। ‘আসুন, আসুন ডিটেকটিভ। আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। এটা একটা জলজ্যান্ত খুন, বুঝলেন! খুনের ব্যাপারে আদতে কোনো সন্দেহ নেই অলোকেশ।’ হাত বাড়িয়ে অলোকের সঙ্গে করকম্পন করতে করতে বললেন গণেশগোপাল পাইন।
জলজ্যান্ত খুন! খুন কী করে ‘মরা-জ্যান্ত’ হয়, ভেবে পান না তিনি। ভদ্রলোকের অযাচিত শব্দ প্রয়োগের বাতিক রয়েছে দেখছি।
চারখানা ঘর নিয়ে বিশাল ফ্ল্যাট। তার একটাতে থাকতেন সদ্য খুন হওয়া রিটায়ার্ড ব্যাংক কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম। লাশের ধড় পড়ে আছে বিছানায়, আর নিচের দিকটা মেঝেতে। খুন যে, তাতে কোনো সন্দেহই নেই, কারণ তখনো বডিতে ছুরি বসানো ছিল। খুনি ছুরিখানা তুলে নেবার অবকাশ পায়নি, বা তার কোনো চেষ্টাও করেনি। হাতিয়ার নিয়ে গেলে ওটা আবার লুকোতে হয়!
নুরুল ইসলামের বয়স আনুমানিক সিক্সটি। আগেই বলেছি, তিনি সদ্য চাকরি থেকে অবসরে গেছেন। তার উজ্জ্বল গাত্রবর্ণ, মাথায় চুল তত ঘন নয়, যাকে বলে রিসিডিং হেয়ার, গাঁয়ের উঠোনের মতো মিহি নিকোনো গোঁফ, ঘোলাটে চোখের মণি—মারা গেলে যেমন হয় আর কি! নুরুল সাহেবকে দেখে সম্ভ্রান্ত বলেই মনে হয়। বড়ো চাকরি করলেই যে সবার চেহারায় বনেদিআনার ছাপ থাকে, তা তো নয়। এখন অনেক ছিঁচকেটাইপ লোকও মামা-চাচা বা টাকার জোরে বড়োসড় পদ ও পদবি বগলদাবা করে বসে থাকেন।
খুনটা কে করল, বুঝছেন কিছু? প্রশ্ন করলেন অলোকেশ। তিনি লাশ দেখায় ব্যস্ত। অলোক জানেন, স্রেফ চেয়ে থাকার নাম দেখা নয়। মন ও মগজ দুটোই একসাথে করে দেখতে হয়।
উত্তরে ইন্সপেক্টর গণেশগোপাল চোকচোক করে হাসলেন। এটা তার পেটেন্ট করা হাসি, অলোক জানেন। ‘খুনি বাইরের কেউ নয়, বুঝলেন। ঘরের লোকে কাজটা করেছে।’
রিয়েলি! তা কী করে নিশ্চিত হলেন, শুনি!
ফ্ল্যাটের মূল দরজা ভেতর থেকে আটকানো ছিল। তাছাড়া দারোয়ান কাল রাত বারোটা থেকে সকালঅব্দি কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেখেনি। বললেন গণেশগোপাল।
তা-ই বুঝি! কেস তো তাহলে আশি ভাগ সলভ করেই ফেলেছেন ইন্সপেক্টর। মিছে আমাকে ডাকলেন কেন! অনুযোগের সুরে বললেন ডিটেকটিভ অলোকেশ।
গণেশগোপাল কাষ্ঠ হাসি দেন। কিছুটা অপ্রতিভ হাসি, অর্থাত্ নিজের মান ও অলোকের মনরক্ষার চেষ্টা। বললেন, না ভাই, কেসটা তত সোজা নয়। এই বাসার মোট বাসিন্দা আট জন। তাদের যে কেউ একাজ করতে পারে। বলতে পারেন খুনির অভয়ারণ্য।
অভয়ারণ্য! একজন রিটায়ার্ড মানুষ—তিনি কারো বাবা, দাদু, ভাই, মনিব নয়তো স্বামী। আর তাকেই কিনা খুন করে ফেলল তার স্বজনেরা। কেন ভাই, কাজ থেকে অবসর নিলেই কি তিনি বেঁচে থাকার অযোগ্য বা বাতিল হয়ে যান! নাকি দুধ নেই তাই গাভি বিদায়!
তদন্তে মন দেন ডিটেকটিভ অলোকেশ রয়। খোঁজখবর করে তিনি নিশ্চিত হন যে এটা ঘরোয়া ব্যাপার। আততায়ী বাইরের কেউ নয়।
লাশের গায়ে ছোপ ছোপ রক্ত, অথচ বডি এখনো বলতে গেলে গরম। ‘রিগ্যার মরটিস’ বা মৃত্যুপরবর্তী লক্ষণ এখনো দেখা যায়নি। হাত-পায়ের গিঁট নরম। অর্থাত্ খুনটা খুব বেশি আগে সংঘটিত হয়নি। হতে পারে, আধঘণ্টা আগে নুরুল সাহেব খুন হয়েছেন।
আচ্ছা ইন্সপেক্টর, নুরুল সাহেবের খুনের ব্যাপারটা সবার আগে কে আবিষ্কার করে, বলতে পারবেন?
কে আবার, ভিকটিমের বাসার কাজের ছেলে রবিউল। সে নাকি নিত্যদিনের মতোন চা দিতে এসে দেখে যে সাহেবের বুকে ছুরি মেরেছে কেউ। তার বুক থেকে রক্ত চোয়াচ্ছে। তিনি মরে পড়ে আছেন। শরীরের অর্ধেকটা বিছানায়, আর বাকিটা মেঝেতে।
সাংঘাতিক কাণ্ড! অমানবিক ব্যাপার। বললেন অলোকেশ। সঙ্গে রিপোর্টার শুভজিত রয়েছে। কিছুক্ষণ আগে এসে সে তদন্তে যোগ দিয়েছে।
মোট চারবার তাকে স্ট্যাব করা হয়েছে। একেবারে মোক্ষম জায়গায়—বুকের ঠিক বাঁ দিকে। অর্থাত্ খুনি খুব ভালো করেই জানত, কোথায় ছুরি মারলে বুড়ো মানুষটা টুঁ শব্দটিও করতে পারবে না।
উঁহু, শুধু ছুরি তো মারেনি, খুনি তার আগে ভদ্রলোকের নাকেমুখে বালিশ চাপা দিয়েছিল। আর সেই কারণেই হয়তো বাসার অন্য কেউ খুনের সময় চিত্কার-চেঁচামেচির শব্দ শুনতে পায়নি। অলোকেশ বললেন।
কী করে বুঝলেন, ডিটেকটিভ? মাথা চুলকান ইন্সপেক্টর পাইন।
এই দেখুন, নুরুল সাহেবের জিভটা বাঁ দিকে কেমন বেঁকে বেরিয়ে আছে। কারো শ্বাসরোধ করা হলে সচরাচর এমনটা হয়।
পাইন সাহেব কিছু বললেন না, তিনি ভিকটিমের বডির দিকে নজর দেন। ইস, কত সহজে একজন মানুষ স্রেফ ‘বডি’ হয়ে যায়। তার নাম-পরিচয় কিছুই আর বেঁচে থাকে না।
আরো মিনিট দশেক কাটল। উত্সুক জনতার ভিড় ক্রমশ ফিকে হতে শুরু করে। এবার জেরার পালা। তারপর লাশ মর্গে পাঠানো হবে। পোস্টমর্টেমের জন্য।
এই বাসার বাসিন্দা একুনে আট জন। এখন অবশ্য একজন মাইনাস হয়েছে। নুরুল সাহেব। তিনি যেহেতু বেঁচে নেই, তাকে আর মানুষ বলে গণ্য করা যায় না। তিনি এখন জাস্ট একটা লাশ।
শুরুতেই বড়ো ছেলে। মিস্টার মফিজ। কাজটা কে করেছে বলে আপনার মনে হয়? চোখা দৃষ্টিতে তাকে দেখছেন ডিটেকটিভ অলোকেশ রয়। যেন তার চাহনিতে আনুবীক্ষণিক ক্ষমতা লুকিয়ে রয়েছে। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ও তাতে অনায়াসে ধরা পড়ে।
না, না স্যার? আমি কেন বাবাকে খুন করবো! মফিজ উদ্দিন ঝড়ের বেগে মাথা নাড়লেন। তিনি একটা কফিশপ চালান। কিন্তু ইদানীং তার ব্যবসায় ভাটির টান। তাই টাকার জন্যে হলেও মফিজ তাকে খুন করতেই পারে। বস্তুত, অর্থই যত অনর্থের মূল। এও শোনা যায়, নুরুল সাহেব নাকি টাকা খরচের ব্যাপারে বেশ মিতব্যয়ী ছিলেন। ছেলেদের ডেকে তিনি সাফ বলে দিয়েছেন, আমি তোমাদের সাধ্যমতো মানুষ করেছি। পেনশনের টাকার দিকে তোমরা নজর দিও না। আই হ্যাভ মাই ওন লাইফ, নয় কি!
অলোক খরচোখে মফিজকে দেখলেন। দেখে মনে হলো না সে মানুষ দূরে থাক, কীটপতঙ্গও মারতে পারে। ভোলাভালা অপুষ্ট দেহ তার। এর পক্ষে বাপের বুকে ছোরা মারা আদৌ সম্ভব কি!
ছোটো ছেলে মুশফিক এল। তার দু চোখে স্পষ্ট বিভ্রান্তি। বাপের মৃত্যুটাকে সে এখনো হজম করতে পারেনি বোধ হয়। নাকি এটা তার অভিনয়!
অলোকেশ কাজের ছেলে রবিউলের মুখ থেকে শুনেছেন যে কিছুদিন ধরেই বাপের সঙ্গে মুশফিকের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। টাকা চেয়ে পায়নি, তাই সে বাপকে সমানে শাপশাপান্ত করছিল।
বলুন মুশফিক, নিরীহ বুড়ো লোকটাকে আপনি কেন মারলেন? চাহিদামতো টাকা দেয়নি তাই! এতটা নিষ্ঠুর আপনি হতে পারলেন! নিজের বাপ বলে কথা! সোজাসুজি মুশফিকের দিকে সন্দেহের আঙুল তোলেন অলোকেশ।
তাতে তুতলে যায় মুশফিক। তো তো করে কিছু বলতে গিয়ে তার গলায় আটকায়। তারপর ডাঙায় তোলা মাছের মতোন খানিকক্ষণ খাবি খেয়ে শেষে বলল, বাপকে আমি অপছন্দ করতাম ঠিকই, কিন্তু খুন আমি করিনি।
আপনার পক্ষে কী অ্যালিবাই আছে শুনি? কড়া ধাতানি দেন ইন্সপেক্টর গণেশগোপাল পাইন।
আছে তো স্যার। আমি দরজায় সিটকিনি তুলে ঘুমাই। মা জানে, বাইরে ধাক্কাধাদ্ধিক্কর শব্দ শুনে আমি বেরোই। মা নিশ্চয়ই আমার সিটকিনি খোলার শব্দও পেয়েছেন।
হাঃ হাঃ হাঃ! এটা কী হলো মিস্টার মুশফিক! আপনি নিজের ঘরে কখন কয়বার সিটকিনি তুলবেন আর খুলবেন, সেই খবর আপনার মা বা অন্য কেউ রাখবে কীভাবে! সত্যি, হাসালে ভাই মুশফিক। তুমি খুনটা করে দিব্যি নিজের ঘরে অর্গল তুলে লেপমুড়ি দিতে পারো। তাতে কারো বাবার আটকাবার সাধ্যি নেই।
কী যেন ভাবলেন অলোকেশ। তারপর ইশারায় বললেন, মিস্টার পাইন, এবার আপনি অন্যদের জেরা করতে পারেন। চেয়ে দেখুন, এই ছেলের হাত কাঁপছে। নিউরোটিক প্রবলেম। এর পক্ষে শক্তহাতে ছুরি ধরা অসম্ভব।
ফাইন, তবে অন্যরা আসুক। বললেন মিস্টার গণেশগোপাল পাইন।
এবার এলো নুরুল সাহেবের শালা বরকত মিঞা। তার কাজকাম কিছু নেই। বোনের ঘাড়ে চেপে বেশ খাচ্ছে। বয়স পঞ্চাশের আশপাশে। এই দুনিয়ায় চড়ে খেতে পারলে কে ‘করে’ খায় বলুন। সত্যি বলতে, বরকত একটা ধম্মের ষাঁড়। খৈনি খাওয়া ছাড়া তার বুঝি আর কাজ নেই।
তারপর, বরকত। বলুন, কাজটা আপনি কেন করলেন? মাথায় টুপিটা অ্যাডজাস্ট করতে করতে জানতে চান ইন্সপেক্টর গণেশগোপাল।
কী কাজ স্যার?
আঃ ন্যাকা! নুরুল সাহেবকে কেন খুন করলেন, বলুন! জবাব দেন। অমনি তেড়েফুঁড়ে উঠলেন গণেশ পাইন।
আমি করি নাই স্যার। আমি নির্দোষ।
কিন্তু তার পাশের রুমটাই তো আপনার। কাজটা টুক করে সেরে ফেললে তো কেউ টেরই পাবে না, তা-ই না বরকত! ইন্সপেক্টরের সঙ্গে অমনি কথার লেজুড় জুড়লেন অলোকেশ রয়।
না না স্যার, বিশ্বাস করেন, আমি মারি নাই। দুলামিঞারে মাইরা আমার কী লাভ, কন! ভালোই তো বসে বসে খাচ্ছিলাম।
হুম। এর কথায় যুক্তি আছে। এমন নয় যে, নুরুল সাহেব দুনিয়া থেকে সরে গেলে তার বিপুল অর্থাগম হবে। তিনি না থাকলেই বরং অসুবিধে। ভাগনেরা হয়তো তাকে বাসা থেকে পত্রপাট তুলে দেবে। তখন তাকে রাস্তায় গিয়ে ভিখ্ মাগতে হবে।
বাকি রইল দুই—নুরুল সাহেবের স্ত্রী রেহনুমা আর বড়ো ছেলের বউ লিজা।
আনো আনো, তাদেরকেও ডেকে আনো। জলদি আনো। মেয়ে বলে খুনি হতে নেই, এমন তো কথা নয়। বললেন মোহাম্মদপুর থানার দুঁদে ইন্সপেক্টর গণেশগোপাল পাইন।
বলুন মিসেস রেহনুমা, কে আপনার স্বামীকে খুন করতে পারে? কোন ছেলে? নাকি আপনার ভাই বা কাজের ছেলে রবিউল!
রেহানা চুপ। তার মুখে কোনো কথা সরে না। তিনি কষ্টে শোকে বিপর্যস্ত। বস্তুত, বয়স পেরোলে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে যে সম্পর্ক তৈরি হয় তাতে স্বার্থগন্ধের চেয়ে বরং নির্ভরতা বা নিশ্চয়তাবোধ বেশি থাকে।
খানিকটা মায়াও কি জন্মে! ঠিক ছায়ার মতো। সহজে কেউ কাউকে পর বা দূর করতে চায় না!
ইন্সপেক্টর পাইন এসব ঠুনকো কথায় কান দেন না। তার বক্তব্য স্পষ্ট—খুনির কোনো বয়স, সম্পর্ক বা লিঙ্গভেদ হয় না। লালসা মানুষকে স্রেফ জানোয়ার বানিয়ে দেয়। সুযোগ বুঝে চোরও হয়ে ওঠে খুনে-ডাকাত। তিনি বললেন, রেহনুমা, খুনটা আবার আপনি নিজেই করেননি তো!
তাতে কেঁদে ভাসান তিনি। অলোক অস্বস্তি বোধ করেন। গোয়েন্দাসহযোগী রিপোর্টার শুভও উসখুস করে। উর্দিঅলা পুলিশের এই এক স্বভাব, কাউকেই তারা ঠিক বিশ্বাস করতে পারেন না।
নাহ, স্বামীকে তিনি খুন করেননি। তার পক্ষে মোক্ষম অ্যালিবাই, ক্রনিক ইনসমনিয়া। রাতে তিনি কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমান। কালও খেয়েছিলেন। ফলে তার পক্ষে কাকভোরে উঠে স্বামীকে খুন করা রীতিমতো অসম্ভব।
হুম, বুঝলাম। বাকি থাকে বড়ো ছেলের বউ লিজা। সে-ই কি তবে খুনটা করেছে!
উঁহু, সেটা কী করে সম্ভব! তার তো আর্থরাইটিস। হাতে-পায়ের গিঁটে সবখানে ব্যথা। চাইলেও কি তিনি ছুরি ধরতে পারবেন! বা পারলেও খুনের পেছনে তার মোটিভ কী!
শোনা যায় এই বাসায় লিজাকেই নাকি নুরুল সাহেব বিশেষ পছন্দ করতেন। কারণ তিনি ছিলেন শ্বশুরঅন্তপ্রাণ। তাছাড়া অলোকের অনুমান, এই খুন কোনো পুরুষই করেছে, নারী নয়। অন্তত ছুরিকাঘাতের ধরন তা-ই বলে।
কেন ডিটেকটিভ, নারীরা খুন করতে পারে না! নারী অবলা! আপনি কি শোনেনি, ‘নারী ও নরক, পুরুষের মড়ক!’
এপাশ ওপাশ মাথা নাড়লেন অলোকেশ রয়। সে আপনি যা-ই বলুন ইন্সপেক্টর, নুরুল সাহেবের খুনি একজন পুরুষ, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কেন, সেটা আমি পরে বুঝিয়ে বলব।
তাহলে আর কে বাকি রইলো! এই বাসার মামুলি কাজের ছেলে রবিউল। নুরুল সাহেবের একান্ত বশংবদ প্রাণী।
আসো তো এদিকে, বলো, নুরুলকে কে খুন করতে পারে! তোমার কমন সেন্স কী বলে! কাউকে দেখেছো খুন করতে, নাকি তুমি নিজেই খুনটা করেছ? শুনলাম, তুমি নাকি সবার আগে ছুরিবিদ্ধ লাশ দেখেছিলে? অলোকেশ বললেন।
তাতে সমানে না না করে রবিউল। অবশ্য কেই বা কবে অপরাধ করে তা নিজমুখে স্বীকার করেছে! করে নাকি কেউ! কারণে অকারণে মিথ্যা বলা আর অপরাধপ্রবণতা মানুষের মজ্জাগত। উই আর বর্ন ক্রিমিনালস।
অলোকেশ রবিউলকে দেখলেন। বয়স পঁচিশ বা একটু বেশি, রুক্ষ চেহারা, মাথায় কোঁকড়ানো চুল গুল্টি পাকিয়ে আছে। গালে কয়দিনের না-কামানো দাড়ি, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘স্টাবল’। পরনে ঢোলা পাজামা, টি-শার্ট। দুটোই ময়লা পুরনো ও রংচটা। অনুমান করা যায়, ড্রেস ওর নিজের নয়। বাসার কারোটা চেয়ে নিয়েছে হয়তো।
রবিউলের কথা শুনতে শুনতে অলোকেশ বাকিদের বয়ানও রি-ওয়াইন্ড করে ভাবছেন। খুনি এই বাসারই, বাইরের কেউ নয়। এতে সুবিধে-অসুবিধে দুটোই হয়েছে। নিজের লোক ক্ষতি করলে তা পূরণ হবার নয়।
অলোকেশ ভেবে দেখলেন, খুনের সুযোগ কম-বেশি সবারই ছিল। তবে মেয়েরা বাদ। কারণ তাদের একজন ঘুমের ওষুধ খায়, দেরিতে ঘুম ভাঙে তার। অপরজন আর্থরাইটিসের রোগী। তার পক্ষে ছুরি মারা অসম্ভব।
আবার ছোট ছেলে মুশফিক হিসাবের বাইরে, কারণ তার হাত কাঁপে। পারকিনসন্স ডিজিজ আছে কি না, কে জানে! অবশ্য ওটা যদি তার ভনিতা বা অভিনয় হয় তো তাহলে ভিন্ন কথা!
এদিকে জেরা চলমান। অলোকেশ একই কথা আবার জানতে চাইলেন। বলো তো রবিউল, নুরুল সাহেবের রুমে ঢুকে তুমি ঠিক কী দেখলে?
দেখলাম স্যার আমার সাহেব মরে পড়ে আছে। তার বুকে ছুরি। ভয়ে আমি চায়ের কাপ নিয়ে ছুটে বেরিয়ে আসি।
অমনি ছুরির বাঁটের দিকে চোখ যায় অলোকের। উঁহু, খুনি বেশ চালাক। ছুরিতে দৃশ্যত কারো হাতের ছাপ নেই। সে নিশ্চয়ই গ্লাভস পরে নিয়েছিল।
গণেশগোপাল পাইন গভীর তিমিরে নিমজ্জিত। তিনি এই কেসে আশার আলো এখনো কিছু দেখছেন না। কী মনে করে কিচেনে যান অলোকেশ। রবিউলের বানানো চায়ের কাপে চোখ রাখেন। তারপর খুঁটিয়ে দেখেন ভিকটিম নুরুল সাহেবের ঘরের মেঝে এবং রবিউলের ছুটে বেরিয়ে আসার পদবিক্ষেপ। মুচকি হাসেন অলোকেশ।
তারপর! কী বুঝলেন ডিটেকটিভ? কে খুনি? খুনের মোটিভ! চিন্তাক্লিষ্ট সুরে বললেন গণেশ পাইন।
মোটিভ কী জানি না, তবে খুনটা যে রবিউলই করেছে, সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ইন্সপেক্টর! দুম করে বললেন অলোকেশ রয়।
সে কী! কীভাবে?
কী রবিউল, ঠিক বলছি তো! ভ্রু নাচান অলোকেশ।
না না, স্যার। আমি সাবরে মারি নাই। তাইলে আমি চা নিয়া যাবো কেন? মিনমিনে সুরে রবিউল বলল।
ওটা তো তোমার চালাকি রবিউল। কেসটা কী করে ধরলাম! শুনুন তাহলে মিস্টার পাইন। একটু ভেবে দেখুন, রবিউল চা নিয়ে ঘরে ঢুকলো। দেখলো যে তার সাহেব ছুরি খেয়ে মরে পড়ে আছে। ভয়ে সে ছুটে বেরিয়ে এলো, অথচ তার হাতের কাপ থেকে একটু চাও ছলকে পড়লো না! না কাপে বা প্লেটে, না মেঝেতে! এটা কী হতে পারে, ইন্সপেক্টর পাইন!
না না, এ হতেই পারে না। উচ্চ স্বরে বললেন ইন্সপেক্টর জি-জি পাইন।
বস্তুত, এই ছোট্ট মিথ্যাটুকু বলেই ধরা খেল নুরুল সাহেবের খুনি রবিউল।
আর খুনের মোটিভ! ইন্সপেক্টর গণেশের ধোলাই খেয়ে হড়হড় সব উগড়ে দেয় রবিউল। সে একটা অকর্মণ্য, উজবুক। এ মাসেই ছাড়িয়ে দেবে বলে তাকে নাকি হুমকি দিয়েছিলেন নুরুল সাহেব। কী জানি, মজা করেই হয়তো বলেছিলেন তিনি। পরিণতি কী হলো, খুন! তাই বলি কি, ভুলেও মজা করবেন না। হু নোজ, কে আপনাকে কখন খুন করবার জন্য তলে তলে ছক কষছে!
