মুদি দোকানে প্রযুক্তির ছোঁয়া

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:৫৮

 রেজাউল হক কৌশিক

 

শহর কিংবা গ্রাম। ঘর থেকে বের হলেই যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চোখে পড়ে তা হলো মুদি দোকান। মুদি দোকানের ব্যবসা যুগ যুগ ধরে সনাতনী পদ্ধতিতেই একই ধারায় চলে আসছে। এভাবে ব্যবসা করে কেউ অনেক টাকা উপার্জন করেছেন। আবার বাকির চক্করে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন এমন দোকানির সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। তবে সম্প্রতি সে ধারায় পরিবর্তন এসেছে। দোকানিরা মোবাইল অ্যাপসে দোকানের বেচাকেনার হিসাব রাখতে পারছেন। শিখেছেন দোকানের মালপত্র কীভাবে সাজালে ক্রেতা আকর্ষণ করা যায়। ক্রেতার সঙ্গে কেমন আচরণ করলে দোকানে বেশি ক্রেতা আসে। ব্যবসার পুঁজি কীভাবে রক্ষা করতে হবে বা বাকি দেওয়া অর্থ কিভাবে আদায় করতে হবে তাও শিখছেন তারা। এমনকি ব্যবসার ক্ষেত্রে পাইকারদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যেমন জরুরি তেমনি জরুরি বিষয় ঝটপট সিদ্ধান্ত নেওয়াও। সঞ্চয় কীভাবে বিপদের দিনে কাজে লাগে তাও শিখছে মুদি দোকানিরা।

দেশে এখন মুদি দোকানের সংখ্যা ১৩ লাখের বেশি। আর মুদি দোকানের মাধ্যমে বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি ডলার বা দেড় লাখ কোটি টাকার ব্যবসায় হয়। দেশব্যাপী এত বড়ো ব্যবসা চলছে সনাতনী পদ্ধতিতে। এখানে প্রযুক্তির কোনো ছোঁয়া লাগেনি। তবে সম্প্রতি এ মুদি দোকানিদের ব্যবসাকে সহজ এবং আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে সম্পৃক্ত করতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) এবং জাতিসংঘ। ডিজিটাল পদ্ধতিতে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড এবং আর্থিক লেনদেনে মুদি দোকানিদের অভ্যস্ত করতে চারটি জেলায় পাইলট প্রকল্প শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পের অংশ হিসেবে মুদি দোকানিরা নানা রকম প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন। তারা ডিজিটাল পদ্ধতিতে পণ্য কেনাবেচা এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন করছেন। এতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দোকানিরা ব্যবসা সম্পর্কে সচেতন হচ্ছেন। বাড়ছে ব্যবসার পরিধিও।

ইইউর অর্থ সহযোগিতায় জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড নেশনস ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইউএনসিডিএফ) শেপিং ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স ট্রান্সফরমেশন-শিফট কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। মাঠপর্যায়ে দোকানিদের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ডিনেট নামের একটি বেসরকারি সংস্থা। কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এবং বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি।

মুদি দোকানিদের নিয়ে এক গবেষণা প্রতিবেদনে শিফট উল্লেখ করে, সারাদেশের ১৩ লাখ মুদি দোকানির বছরে ঋণের চাহিদা আনুমানিক সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু হিসাব কাঠামোর অভাব, ব্যাংকের অনীহা, কাগজপত্রের জটিলতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক উত্স থেকে ঋণ পান না তারা। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন মাত্র ৮ শতাংশ দোকানি। এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন ৪২ শতাংশ। বাকি ৫০ শতাংশ ঋণ নেননি। সারাদেশের দোকানিদের ৮৫ শতাংশই আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখেন না এবং ৪৩ শতাংশের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টই নেই।

মুদি দোকানিদের ব্যবসা উন্নয়নে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যাংক ব্যবহারে অনুপ্রাণিত করতে ২০১৭ সাল থেকে চারটি জেলায় শিফট কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই জেলাগুলো হচ্ছে জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ঐ কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এই তিন বছরে ২ হাজার ৬৪৩ জন মুদি ব্যবসায়ীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ১০ হাজার দোকানিকে ডিজিটাল ব্যবসায় ও লেনদেনের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং তার সবাই ‘আমার দোকান’ নামক মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন।

সম্প্রতি জামালপুর জেলা পরিষদ কার্যালয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুদি দোকানিদের নিয়ে মতবিনিময়ের আয়োজন করা হয়। প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী মুদি দোকানিরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে কীভাবে ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং অর্থ লেনদেন করছেন তার বিস্তারিত সেখানে তুলে ধরেন। মতবিনিময়ে অংশগ্রহণকারী দোকানিরা জানান, ব্যবসার ক্ষেত্রে তাদের মূল সমস্যা মূলধনের অভাব, ব্যাংকে ঋণের অপর্যাপ্ততা, উচ্চসুদহার, ঋণ পেতে জটিলতা। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের সামিউল হক, মনোয়ারা বেগম এবং বিপ্লব সরকারের মতো প্রায় ৫০ জন মুদি দোকানদার এসেছিল সে সভায়।

মুদি দোকানি ছাড়াও একই দিনে স্থানীয় বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাকে নিয়ে আরেকটি মতবিনিময়সভার আয়োজন করা হয়। সভা দুটিতে ইউএনসিডিএফের কান্ট্রি প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর আশ্রাফুল আলম, ডিনেটের চিফ প্রোগ্রাম অফিসার মো. ফরহাদ উদ্দিনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। মতবিনিময়ে বলা হয়, মুদি দোকানে বিক্রি বাড়লে উত্পাদন বাড়বে। অথচ এ খাত অনেক অবহেলিত। মুদি দোকানিরা ব্যাংক ঋণ পেতে নানা হয়রানিতে পড়েন। এছাড়া এ খাতের জন্য কোনো বিমা সুবিধা না থাকায় কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে আর উঠে দাঁড়াতে পারেন না। সমস্যা সমাধানে মুদি দোকানিদের জন্য বিনাসুদে বা কম সুদে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানানো হয়। শিফট থেকে জানানো হয়, পর্যায়ক্রমে সারাদেশে এই কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে তাদের।