যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য ‘অশনি সংকেত’!

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:৫৮

 শফিকুর রহমান রয়েল

 

হতচকিত হওয়াটাই স্বাভাবিক; ভিরমি খেলেও দোষের কিছু নেই। গেল ডিসেম্বরের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারির রিপোর্ট প্রকাশিত হবার পর অগণিত লোকেরই চোখ উঠে গিয়েছে যেন চড়ক গাছে আর কপালে পড়েছে অসংখ্য ভাঁজ। সর্বশেষ জনগণনা জানান দিচ্ছে, ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ০.৪৮ শতাংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর থেকে আদম সন্তানের সংখ্যা নিয়ে এমন মহাবিপদে পড়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়াটা তাদের কাছে এবারই প্রথম। গতবছর যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধীরগতির জন্য মূলত তিনটি উপাদানকে দায়ী করা হচ্ছে। প্রথমত প্রত্যাশার তুলনায় কম শিশুর জন্ম নেওয়া। দ্বিতীয়ত নতুন অভিবাসীদের হ্রাসকৃত সংখ্যা। সর্বশেষ কারণটি হচ্ছে, সার্বিকভাবে আমেরিকানদের বুড়িয়ে যাওয়া, মানে তুলনামূলকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বয়স্ক জনগোষ্ঠী সঙ্গত কারণেই ইচ্ছে থাকলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্রে এতদিন জন্মহার ও অভিবাসন অনিবার্যরূপেই জনসংখ্যার গতিশীলতা বজায় রেখে আসছিল।

১৭৯০ সালে প্রথমবারের মতো আদমশুমারি চালুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ২০১০-এর দশকটা রেকর্ডবুকে ঠাঁই মিলতে পারে লোকসংখ্যা বৃদ্ধির প্রশ্নে সবচেয়ে ধীরগতির দশক হিসেবে। এসবের পাশপাশি ব্রুকিংস ইনস্টিটিউট আরো তথ্য দিয়েছে যে, প্রাক্কলন অনুসারে ২০২০-এর দশকে নিম্ন জন্মহারের পাশপাশি উচ্চ মৃত্যুহারও চলমান থাকবে। জনতাত্ত্বিক স্থবিরতার এই চিত্র আগামী দশকজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কর্মক্ষম আমেরিকান লোকদের সংখ্যায় সামান্য পরিবর্তন আসার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে, অর্থের বিনিময়ে গর্ভ ভাড়া দেওয়া নারীরা ক্রমাগতই অবসর জীবনে চলে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে অর্থনীতিতে ক্ষমতা যুক্ত করতে গিয়ে বিশাল সংখ্যক অবসরভোগীদের সঙ্গত কারণেই অতিবেশি নির্ভর করতে হচ্ছে সংকুচিত হতে থাকা কর্মক্ষম শ্রমিকের সংখ্যার ওপর। যে কারণে অধিকাংশ বিশ্লেষকই বলছেন, আগামী শতক জুড়েই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটবে গড়ে ২ শতাংশ। অথচ মহামন্দা শুরুর পূর্বের অর্ধদশকে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল সাধারণ ঘটনা। অন্যদিকে কম শ্রমিকের মানেই হচ্ছে সরকারের সংগ্রহ করা মাইনা করের পরিমাণ নিচের দিকে নামতে থাকা। এর প্রভাবে বয়স্কদের সাহায্যার্থে সামাজিক নিরাপত্তা ও চিকিত্সাসেবার মতো কর্মসূচিগুলোয় আঁটসাঁট অর্থায়নের জন্যে তীব্র চাপের সৃষ্টি হচ্ছে। প্রযুক্তি-নিহিত থিংক-ট্যাংক ইকোনোমিক ইনোভেশান গ্রুপ কর্তৃক প্রকাশিত গত বছরের একটি রিপোর্টে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৪১ শতাংশ অঙ্গরাজ্যই জাপানের মতো জনসংখ্যা হ্রাসের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছে। তারা জানিয়েছে জনসংখ্যার ঘাটতি প্রতিবিম্বিত হবে গৃহায়ন বাজার ও পৌর অর্থায়নের ক্ষেত্রে। নেতিবাচক প্রভাবে বাড়ির মূল্য ও স্থানীয় কর রাজস্ব কমে যাবে, যা কি না শিক্ষা ও অবকাঠামো গঠনের ক্ষেত্রে সাহায্য করে।

 ইকোনোমিক ইনোভেশান গ্রুপ প্রাক্কলন করেছে, ২০৩৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দুই-তৃতীয়াংশ রাজ্যেই ১৯৯৭ সালের তুলনায় কর্মক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক লোকের সংখ্যা কম থাকবে, যদিও ঐ দেশের মোট জনসংখ্যা প্রতিবছরই অন্তত কিছু না কিছু বেড়েই চলবে। এই প্রবণতা গ্রামীণ এলাকাগুলোকে হ্রাসের চক্রে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। পরিণামস্বরূপ ঐসব অঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের পড়াশোনা ও কর্মের জন্য অন্যত্র যাওয়ার পরিবর্তে নিজ এলাকার কাছাকাছি থাকাটা আরো কঠিন হয়ে পড়বে।

 প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণমূলক অভিবাসন নীতির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা অভিবাসীদের সংখ্যায় পিছুটান লাগার সম্পর্কটা খুবই ঘনিষ্ঠ। গত বছর মার্কিন মুলুকে অভিবাসী কমেছে ২ লাখের কাছাকাছি। ভাগ্য গড়ার জন্য আগের বছরের তুলনায় সেখানে লোক গিয়েছে ৭০ শতাংশ কম। কর্মক্ষম জনসংখ্যার জন্য স্বল্পমেয়াদে এটা মোটেও ভালো পূর্বাভাস নয়, যেহেতু কমপক্ষে আগামী পনেরো বছর অর্থাত্ ২০৩৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির অধিকাংশ প্রবৃদ্ধিই নির্ভর করছে অভিবাসীদের ওপর।

—মার্কেট ইনসাইডার অনুসরণে