পর্যটনশিল্পের উন্নয়নের সম্ভাবনা

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ২২:১১

অজানাকে জানার ইচ্ছা ও মানুষের বিনোদনের চাহিদা মেটানোর সব উপকরণ নিয়েই গড়ে উঠেছে পর্যটনশিল্প। পর্যটন এখন শুধু ব্যক্তিমনের আনন্দের খোরাক নয়, এটি এখন শিল্প। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে পর্যটন এখন অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। প্রতি বছর বিশ্ব পর্যটন সংস্থা (ইউএনডব্লিউটিও) পর্যটকদের সংখ্যার ভিত্তিতে সর্বাধিক ভ্রমণকারী দেশের তালিকা তৈরি করে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার মতে, ২০১৮ সালে ১০টি শীর্ষ পর্যটকদের দেশ হলো—ফ্রান্স, স্পেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইতালি, মেক্সিকো, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, জার্মানি ও থাইল্যান্ড। অথচ, বিশ্বের অন্যতম পর্যটনবান্ধব দেশ হয়েও সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে বাংলাদেশ পর্যটনশিল্পে তলানিতেই পড়ে আছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘ভ্রমণ ও পর্যটন প্রতিযোগী সক্ষমতা প্রতিবেদন-২০১৭’ অনুযায়ী ১৩৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৫তম। ১৯৫০ সালে পৃথিবীতে পর্যটকের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৫ মিলিয়ন; যা ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৩৫ মিলিয়নে। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছর প্রায় ১৩৯ কোটি ৫৬ লাখ ৬০ হাজার পর্যটক সারা পৃথিবী ভ্রমণ করবেন। অর্থাত্ বিগত ৬৭ বছরে পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ৫০ গুণ বেড়েছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি ব্যাপকতা লাভ করেছে।

বর্তমানে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি ও উত্সবের পাশাপাশি কিছু বিদেশি উত্সবও বাংলাদেশের মানুষ পালন করে আসছে। ইংরেজি নববর্ষ ঠিক তেমনি একটি অনুষ্ঠান। এই সময় নানারকম অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। পর্যটকরা তখন দেশের নানা এলাকা ঘুরে বেড়ায় তাদের পদচারণায় মুখরিত থাকে পর্যটন এলাকা। ইংরেজি নববর্ষকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যটন স্থানে পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এই সংখ্যা প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সময় কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, বান্দরবান, সাজেক, খাগড়াছড়িতে বিপুল পরিমাণ মানুষ ঘুরে বেড়ায়। এসব স্থানে বিভিন্ন রকম পর্যটন-আকর্ষণ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। ইংরেজি নববর্ষ উদ্যাপনকে ঘিরে কয়েকটি দেশে থাকে জমকালো আয়োজন। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, স্কটল্যান্ডের এডিনবরা, ফ্রান্সের প্যারিস, হংকং, দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন মুখর হয়ে ওঠে ভ্রমণপ্রেমীদের হইহুল্লোড়ে। বর্ণিল আতশবাজিতে থার্টিফার্স্ট নাইটে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি মানুষ আনন্দের ঢেউয়ে ভাসে।

একইভাবে ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা স্থান করে নেওয়ায় বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ নিয়ে বিদেশি ভ্রমণপিপাসুদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অসাম্প্রদায়িক, বিশ্বজনীন ও মানবকল্যাণে নিবেদিত শোভাযাত্রা হিসেবে ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর এটি ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পায়। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শান্তি, গণতন্ত্র ও বাঙালি জাতিসত্তার ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রাকে। ১৯৮৯ সাল থেকে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে এর মাধ্যমে অপশক্তির অবসান ও মানুষের কল্যাণময় ভবিষ্যতের আশা ব্যক্ত করা হয়।

পর্যটনশিল্প বিকাশের অবারিত সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশে। আশার খবর হচ্ছে, এখন প্রতি বছর প্রায় ৯০ লাখ দেশীয় পর্যটক ঘুরতে যায়। পাঁচ বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ২৫ থেকে ৩০ লাখ। ২০০০ সালের দিকে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ থেকে ৫ লাখ। বিদেশি পর্যটকনির্ভরতা ছাড়াও দেশীয় পর্যটকদের নিরাপত্তা, যোগাযোগের সুবিধা, আকর্ষণীয় অফার এবং পর্যটন ব্যয়সীমার মধ্যে থাকলে দেশের মানুষ আগ্রহ নিয়ে দেশ ঘুরে দেখতে চাইবে। এক হিসাবে বলা হয়, ১৬ কোটির বেশি মানুষের গড়ে প্রতিবছর ১০ ভাগও যদি দেশ ঘুরে দেখে, তাহলে বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক তত্পরতা সৃষ্টি হবে। দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন ঘটছে পর্যটনশিল্প বিকাশের ফলে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৭—গত আট বছরে ৬৬৯৯.১৬ কোটি টাকা পর্যটনশিল্পের মাধ্যমে আয় হয়েছে। বিভিন্ন উত্সবকালীন মানুষের ঘুরে বেড়ানোর যে প্রবণতা, তা এই অর্থনৈতিক বিকাশকে আরো বাড়িয়ে দেবে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বে ২০২০ সাল নাগাদ পর্যটন থেকে প্রতি বছর ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হবে। ২০৫০ সাল নাগাদ ৫১টি দেশের পর্যটক আমাদের দেশে আসবে। বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১০ শতাংশ এই পর্যটন খাত থেকে আয় করা সম্ভব।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যুগে যুগে বহু পরিব্রাজক ও ভ্রমণকারী মুগ্ধ হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে এই সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন সম্ভাবনা অপরিসীম। আমাদের রয়েছে সুবিশাল সমদ্রসৈকত, পাহাড়, অরণ্যঘেরা জলপ্রপাত, প্রত্নতত্ত্বের প্রাচুর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শনসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান, যা পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস, বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি আমাদের দেশকে পরিণত করেছে একটি বহুমাত্রিক আকর্ষণসমৃদ্ধ অনন্য পর্যটন গন্তব্যে, যা বাংলাদেশকে গড়ে তুলেছে পর্যটকদের জন্য তীর্থস্থান হিসেবে।

গত বছর ইংরেজি নববর্ষে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে রাশিয়া, নাইজেরিয়া ও সুদান থেকে শতাধিক পর্যটক ঘুরতে আসে। তবে বাংলাদেশে ইংরেজি নববর্ষকেন্দ্রিক কোনো আইকনিক উদ্যাপন এখনো করা হয়নি, যা বিদেশি পর্যটন আকর্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন করে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ ও অনুকূল সুবিধা সৃষ্টি করতে পারলে শুধু বিশ্বের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার থেকে বছরে কমপক্ষে ২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় করা সম্ভব। বর্তমানে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পর্যটনে কিছু মেগা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যাতে অদূর ভবিষ্যতে নববর্ষকে কেন্দ্রে করে আয়োজন করা যেতে পারে। তাছাড়া আমাদের সমুদ্রসৈকতগুলোতে নানা আয়োজন করা যেতে পারে। এতে করে আরো বেশি দেশি-বিদেশি পর্যটকের সমাগম হবে। সময়োপযোগী ও পরিকল্পনামাফিক পদক্ষেপ গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে এসব পর্যটন স্পট যদি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে নবদিগন্তের সূচনা হবে। তবে পর্যটন বলতে শুধু ঘোরাফেরার ধারণা পরিবর্তন করে একে বহুমুখী করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। পর্যটনের বহু শাখা-প্রশাখার মধ্যে বিনোদন পর্যটন, শ্রান্তি বিনোদন পর্যটন, সাংস্কৃতিক পর্যটন, ইভেন্ট পর্যটন, সংস্কৃতিভিত্তিক পর্যটন, ক্রীড়া পর্যটন, নৌ পর্যটন, হাওর পর্যটন, ধর্মভিত্তিক পর্যটনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এত সম্ভবনা থাকার পরেও আমরা পর্যটক আকৃষ্ট করার মতো কর্মপন্থাই এখনো নির্ধারণ করে উঠতে পারছি না। আমরা একটু সচেতন হলেই নিজেদের পর্যটন সক্ষমতা বাড়িয়ে বিপুলসংখ্যক বিদেশি দর্শনার্থীকে নিজের দেশে আনতে পারি। আধুনিক জীবনের চাওয়া মাথায় রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে আমাদের পর্যটনশিল্পের বিকাশ সাধনে সচেষ্ট হতে পারি।

অপরূপ বাংলাদেশটাকেও বিশ্বমানুষ তাদের অবকাশ যাপনের ঠিকানা হিসেবে ভাববে, যদি আমরা মেধাবী ও যোগ্য মানুষদের ঠিক জায়গায় বসাতে পারি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হিসেবে সুপরিচিত বাংলাদেশে রয়েছে একাধিক পর্যটনকেন্দ্র। এছাড়া রয়েছে সম্ভাবনাময় আরো বহু পর্যটনবিধৌত স্থান। সময়োপযোগী ও পরিকল্পনামাফিক পদক্ষেপ গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে এসব পর্যটন স্পট যদি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে নবদিগন্তের সূচনা হবে। তবে প্রতি বছর বিভিন্ন উত্সবের সময় পর্যটকেরা বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে। এর মধ্যে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টে রুম না পাওয়া এবং অন্যান সময়ের চেয়ে অধিক মূল্যবৃদ্ধি প্রধান। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য সঠিক নিয়িম-নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। এতে করে পর্যটকেরা আরো বেশি ভ্রমণে উত্সাহিত হবে।

সর্বোপরি, পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন ঘটাতে পর্যটন নিয়ে লেখালেখি ও ওয়ার্কশপ, সেমিনার, প্রদর্শনী বাড়ানো দরকার। সার্বিক অবকাঠামোর উন্নয়ন ছাড়া পর্যটনের প্রসার ঘটানো কঠিন হবে। বিশ্বের কয়েকটি দেশ একমাত্র পর্যটনকে অবলম্বন করেই সমৃদ্ধির শিখরে আরোহণ করছে। আমাদের দেশে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঠিকমতো ও পরিকল্পিতভাবে করতে পারলে সুইজারল্যান্ড, পাতায়া, ব্যাংককের মতো ট্যুরিজম এখানেও গড়ে উঠতে পারে।

n লেখক :চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়