কুষ্ঠরোগমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ২২:১১

রেভারেন্ড মার্টিন অধিকারী

অন্যান্য অনেক দেশের মতো এ বছর ‘বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস’ হিসেবে পালিত হবে। সংক্ষেপে এর উদ্দেশ্য, কুষ্ঠরোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সঠিক জ্ঞান দান করা। কুষ্ঠ (ইংরেজি, Leprosy) ‘মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপ্রি’ (Mycobacterium leprae) নামক জীবাণুঘটিত, কিন্তু সবচেয়ে কম সংক্রামক, একটি রোগ। এ রোগ বিশেষ করে চামড়া ও প্রান্তিক স্নায়ুকে আক্রমণ করে। চামড়ায় এক বা অনেক দাগ হতে পারে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে চামড়ায় দানা বা গুটি দেখা যায়। চামড়ার দাগগুলো চুলকানীবিহীন হয় এবং কিছু কিছু দাগ অনুভূতিহীন হয়। চামড়া তথা প্রান্তিক স্নায়ু আক্রান্ত হওয়ায় হাত, পা এবং চোখে অনুভূতিহীনতা ও প্রতিবন্ধীতা দেখা দিতে পারে। রোগ শনাক্ত করায় দেরি হলে রোগীর অঙ্গবিকৃতি দেখা দেয়, যা পরবর্তীকালে প্রতিবন্ধীতার সৃষ্টি করতে পারে। কুষ্ঠ বংশগত কোনো রোগ নয়। ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে নরওয়ের একজন বিজ্ঞানী ডা. জি এইচ আরমার হ্যানসেন সর্বপ্রথম কুষ্ঠরোগের কারণ যে ‘মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপ্রি’, তা আবিষ্কার করেছিলেন বলে কুষ্ঠরোগের অন্য নাম হ্যানসেন্ ডিসিস্। শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষের স্বাভাবিকভাবেই এ রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে।

 সঠিক চিকিত্সা নেননি এমন কোনো আক্রান্ত ব্যক্তির নাক ও মুখ থেকে ঐ জীবাণু অত্যন্ত সূক্ষ্ম জলকণার সঙ্গে বের হয়ে এসে বাতাসে মিশে থাকে। তাই ঐ রকম রোগীর সঙ্গে দীর্ঘ ও সরাসরি যোগাযোগের ফলে রোগ ছড়িয়ে থাকে বলে মনে করা হয়। এ রোগের চিকিত্সা হয় এমডিটি (MDT) অর্থাত্ ‘মাল্টি-ড্রাগ থেরাপি’ নামক অত্যন্ত কার্যকর এক প্রকার ওষুধের দ্বারা। গত আশির দশকের প্রথম দিকে ঐ ওষুধের ব্যবহার শুরু হয়। এমডিটি ওষুধটি হচ্ছে ড্যাপসন, ক্লোফাজিমিন ও রিফামপিসিন এই তিন প্রকারের ওষুধের মিশ্রণ এবং তা অবস্থা ভেদে ৬ মাস থেকে ১২ মাসব্যাপী ব্যবহার করতে হয়। এমডিটির প্রথম ডোজই জীবাণুর ৯৯.৯ শতাংশ মেরে ফেলে। কুষ্ঠরোগের জীবাণু কোনো ব্যক্তির দেহে প্রবেশ করার পরে তা তার দেহে দৃশ্যমান হতে লম্বা এক সময়, ৫-২০ বছর পর্যন্ত লাগতে পারে। এ রোগ ওষুধে ভালো হয়, বিনামূল্যে এর চিকিত্সা মেলে। এ রোগে আক্রান্ত মানুষদের সমাজ থেকে দূরে রাখা বা তাদের সামাজিক ও মানবীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কোনো যুক্তি নেই। কুষ্ঠ কেবল একটি স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা নয়, বরং একটি বড়ো সামাজিক সমস্যা এবং তা একটি মানবোন্নয়ন প্রসঙ্গ। দারিদ্র্য এর একটি কারণ। ১৯৯৫ থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পৃথিবীর সব দেশেই বিনামূল্যে এমডিটি সরবরাহ করে আসছে।

‘বাংলাদেশ জাতীয় কুষ্ঠ উচ্ছেদ কার্যক্রম’ এনজিওসমূহের সহযোগিতায় সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা অবকাঠামোর মাধ্যমে সারাদেশে কুষ্ঠরোগের সেবা প্রদান করে আসছে। এই চিকিত্সা সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।

কুষ্ঠ শুধু একটি চিকিত্সা সংক্রান্ত সমস্যা নয় বরং একটি জটিল সামাজিক ও মানবিক সমস্যা। মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টির মধ্যে এই প্রাচীন রোগের বিরুদ্ধে প্রচার মাধ্যমগুলো সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে। তবেই কুষ্ঠ আক্রান্ত রোগীরা স্বেচ্ছায় রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিত্সার জন্য এগিয়ে আসবে এবং কুষ্ঠমুক্ত একটি বাংলাদেশ গড়তে নিজেরাও অবদান রাখবে।

নিজ পরিবার-পরিজন, সমাজ, সরকার কর্মক্ষেত্র চিকিত্সালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার থেকে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অতীতে এবং বর্তমানেও অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক ও মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে কিন্তু আজ আমাদের এই আঘাত ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। আমাদের বড়ো একটি প্রত্যাশা যে, সরকারি ও বেসরকারি সকল প্রচেষ্টা ও উদ্যোগের ফলে অচিরেই আমাদের কুষ্ঠমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।

n লেখক :‘লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল’-এর অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রাক্তন পরিচালক