অস্বস্তি বাড়াচ্ছে শুল্ক আদায়ে বড়ো ঘাটতি

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২০, ২২:৩১

চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশ পিছিয়ে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর মধ্যে প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে শুল্ক খাতের রাজস্ব। এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অর্থবছরের প্রথমার্ধে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে শুল্ক আদায় কম হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে আদায় বেড়েছে মাত্র আড়াই শতাংশ। ছয় মাসেই শুল্ক আদায়ে এত পিছিয়ে থাকায় অস্বস্তিতে রয়েছে রাজস্ব প্রশাসন।

সূত্র জানিয়েছে, গত ছয় মাসে আমদানিতে প্রত্যাশিত গতি আসেনি। অন্যদিকে উচ্চহারের শুল্ক আদায় হওয়া পণ্যের চেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে শূন্য হার কিংবা স্বল্পহারের শুল্ক আরোপিত রয়েছে এমন পণ্য, কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি। শুল্ক আদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা শুল্ক আদায়ের পেছনে এটিকে বড়ো কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন। অবশ্য অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি প্রত্যাশিত মাত্রায় না হলে শুল্ক আদায়ে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু শুল্ক আদায়ে      প্রবৃদ্ধি এত হওয়াও যৌক্তিক নয়। এটি অর্থনীতির স্বাভাবিক গতির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়।

অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর ইত্তেফাককে বলেন, আমদানি কিছুটা কমে গেছে। অন্যদিকে আমদানির একটি বড়ো অংশ অব্যাহতি কিংবা ছাড় পাচ্ছে। এগুলো মূলত সরকারি প্রকল্পের। এ কারণে আমদানি শুল্ক কমে গেছে। অন্যদিকে সার্বিকভাবে আমদানি কমার পেছনে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা শ্লথগতির হওয়াকেও দায়ী করছেন তিনি। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন প্রকল্পসহ বিভিন্ন খাতে ঢালাও ছাড় দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, এসআরওর (আদেশ) মাধ্যমে প্রচুর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের এসআরও সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা দরকার।

সম্প্রতি শুল্ক আদায়ের বিষয়ে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট বিভাগ একটি বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখা গেছে, শুল্ক আদায়ের প্রধান ২০টি খাত থেকে আদায় কমে গেছে অস্বাভাবিকহারে। এ তালিকায় রয়েছে  মোটরসাইকেল, ডিজেলসহ জ্বালানি তেল, সয়াবিন তেল, স্টিল জাতীয় পণ্য, মোবাইল ফোন, চাল, ব্ল্যাক টি, সেমি ট্রেইলারসহ আরো কিছু পণ্য। অন্যদিকে গুঁড়ো দুধ ও স্টিল জাতীয় পণ্যের দর বিশ্ববাজারে কমে যাওয়াও শুল্ক আদায় কমার কারণ। সূত্র জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে  মোটরসাইকেল আমদানি কমেছে ৪৪ শতাংশ। এ খাত থেকে গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে রাজস্ব আদায় কমেছে ৫৫ শতাংশ। ডিজেল আমদানি কমেছে ১৬ শতাংশ। এ খাত থেকে রাজস্ব আদায় কমেছে ১৫ শতাংশ। অন্যদিকে অব্যাহতি পণ্যের আমদানি বেড়েছে ব্যাপকহারে। এনবিআরের হিসাবে, অব্যাহতি পাওয়া পণ্যের আমদানি বেড়েছে ১২ শতাংশ।

চলতি অর্থবছর রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা এ লক্ষ্যমাত্রাকে মাত্রাতিরিক্ত বলছেন। অন্যদিকে এনবিআরের কর্মকর্তারাও বলছেন, আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অনেক বেশি হওয়ায় ব্যবধান বড়ো হচ্ছে। তবে শুল্ক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে গত কয়েক বছর ধরে এনবিআর বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এর কিছু কিছু বাস্তবায়ন হলেও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এর সুফল দেখা যাচ্ছে না।  এমন বাস্তবতায় আজ ২৬ জানুয়ারি বিশ্বব্যাপী পালন হচ্ছে আন্তর্জাতিক কাস্টমস দিবস। ওয়ার্ল্ড কাস্টম অর্গানাইজেশনের সদস্যভুক্ত ১৮৩টি দেশে একযোগে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে : ‘মানুষ, সমৃদ্ধি তথা এই গ্রহকে টেকসই করতে শুল্ক ব্যবস্থা’। দিবসটি উপলক্ষ্যে আজ সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় রাজস্ব ভবন প্রাঙ্গণ থেকে শোভাযাত্রা বের হবে। এছাড়া সন্ধ্যায় রাজধানীর বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে অর্থমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া ঢাকার বাইরেও দেশের বিভিন্ন কাস্টম হাউজগুলোতেও দিবসটি উপলক্ষ্যে শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।

দিবসটির গুরুত্ব তুলে ধরে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন,  রাজস্ব আহরণের পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, দেশীয় শিল্প সুরক্ষা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে জনগণের জীবনমান উন্নয়নে বাংলাদেশ কাস্টমসের অবদান অপরিসীম।

প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অতি সংবেদনশীল তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়াকে আরো সহজতর করেছি। এরই মধ্যে ৩৮টি ভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বিত সেবা কার্যক্রম ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইনডো বাস্তবায়ন শুরু করেছি।