ইইউর সঙ্গে বিচ্ছেদ ৩১ জানুয়ারিই

তার পরও দুঃস্বপ্ন!

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৩১

শিফারুল শেখ

 

এলোমেলো চুল, ব্যতিক্রমী চাহনি আর ঝাঁঝালো বক্তব্যের জন্য খ্যাতিমান নয়া ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। সাংবাদিকতা ছেড়ে রাজনীতির মাঠে আসা জনসনের বেড়ে ওঠার গল্পও বিচিত্র রকম। সেই বিচিত্র রকমের মানুষটিই ব্রিটেনে এক ‘অসাধ্য’ সাধন করলেন। তিনি তার অঙ্গীকার মতো ৩১ জানুয়ারিই ব্রিটেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছেন। তবে আইনগতভাবে। চূড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘটবে চলতি বছরের শেষ দিনে। নানা চড়াই-উত্রাইয়ের পর বরিস শেষ পর্যন্ত সফল হলেও ইইউর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করাটাই হবে তার জন্য বড়ো চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত নিধারিত সময়ে সমঝোতা সম্ভব না হলে চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের দুঃস্বপ্ন আবারও তাড়া করবে ব্রিটেনকে।

শেষ বাধাও দূর হলো

২০১৬ সালের ২৩ জুন। ব্রিটেনের ইতিহাসে আক্ষরিক অর্থেই ‘রেড লেটার্স ডে’। ইইউ ছেড়ে একলা চলার পক্ষেই রায় দেয় ব্রিটেনের ৫২ শতাংশ মানুষ। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। তারপর টেমসের নদী দিয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে। ইইউর অধীনতা থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তকে যুক্তরাজ্যের স্বাধীনতা অর্জন হিসেবে দেখছেন বিচ্ছেদপন্থিরা। কিন্তু পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট বিলের বিরোধিতার কারণে এই বিচ্ছেদ অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। গত ১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ব্রেক্সিটপন্থি কনজারভেটিভ দল বড়ো ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফেরার পর ব্রেক্সিট কার্যকরের অনিশ্চয়তা দূর হয়। ব্রেক্সিট বিলের আনুষ্ঠানিক নাম ‘ইইউ উইথড্রোয়াল বিল’। গত বুধবার কোনো পরিবর্তন ছাড়াই পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে পাশ হয়। এরপর ছিল রানি এলিজাবেথের স্বাক্ষরের অপেক্ষা। বৃহস্পতিবার রানির স্বাক্ষর এবং ইইউর অনুমোদনে পাকাপাকি হয় দুই দেশের দুই পথে যাওয়ার রাস্তা। প্রধানমন্ত্রী বরিস বলেছেন, ‘একটা সময় মনে হয়েছিল কখনই হয়তো ব্রেক্সিট বিল পাশ করা সম্ভব হবে না। আমরা সেই অসাধ্য সাধন করেছি’।

ব্রেক্সিট আইন অনুযায়ী, ৩১ জানুয়ারি স্থানীয় সময় রাত ১১টায় ইইউর সঙ্গে ব্রিটেনের বিচ্ছেদ কার্যকর হবে। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ইইউর সঙ্গে ব্রিটেনের বাণিজ্যিক ও অন্যান্য বিষয় সংক্রান্ত সমস্ত সম্পর্ক একই থাকবে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে ব্রিটেন ইইউর কোনো প্রশাসনিককাজ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবে না। ২৯ জানুয়ারি ত্যাগ করার আগে ইইউ পার্লামেন্টে এই ব্রেক্সিট বিল পাশের জন্য বিশেষ অধিবেশন হবে।

কেমন সমস্যা হবে ব্রিটেনের

৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ব্রিটেন ও ইইউর মধ্যে বোঝাপড়া সম্ভব না হলে বিশেষ করে ব্রিটিশ অর্থনীতির ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইইউর বাকি ২৭টি দেশের বাণিজ্যের প্রায় ৯ শতাংশ ব্রিটেনের সঙ্গে সম্পন্ন হলেও ব্রিটেনের ৪৩ শতাংশ রপ্তানির গন্তব্য এই দেশগুলো। ব্রিটেনের আমদানিরও প্রায় অর্ধেক আসে ইইউ দেশগুলো থেকে। সেই বাণিজ্যের ওপর শুল্ক চাপানো হলে অর্থনীতির ক্ষতি অনিবার্য। এত কম সময়ের মধ্যে অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে সেই ধাক্কা সামলানো সম্ভব হবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

ব্রিটেন ইইউর বিধিনিয়ম আর না মানলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্কসহ নানারকম জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের মতো ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সহযোগীদের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যেতে হলে ব্রিটেনকে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে পারে। দূরের দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি করে সেই ঘাটতি পূরণ করা সহজ হবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

দুঃস্বপ্ন তাড়া করছে

৩১ জানুয়ারি ব্রিটেন ইইউ ত্যাগ করার পরই সংলাপ শুরু হবে। বরিস সাফ জানিয়েছেন, ব্রিটেন ভবিষ্যতে ইইউর বিধিনিয়ম মেনে চলতে চায় না। ইইউর অভ্যন্তরীণ বাজারের নাগাল পেতে এগুলো মেনে চলতে হয়, নরওয়ে যেমনটা করে আসছে। তার বদলে তিনি অনেকটা কানাডার সঙ্গে ইইউর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আদলে বোঝপড়া করতে চান। বিরোধীদের আশঙ্কা, মাত্র ১১ মাসের মধ্যে জনসন কোনো চুক্তিই চূড়ান্ত করতে পারবেন না।

ইইউ কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডেয়ার লাইয়েনও একই সংশয় প্রকাশ করেছেন। তার মতে, এই সময়কালে বড়োজোর কিছু প্রধান বিষয়ের নিষ্পত্তি সম্ভব। সার্বিক বাণিজ্য চুক্তির জন্য সময়সীমা আরো দুই বছর পর্যন্ত বাড়াতে হতে পারে। ইইউ প্রধান মধ্যস্থকারী মিশেল বার্নিয়ে বলেছেন, সবার আগে বাণিজ্য ও নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বোঝাপড়ার বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া হবে। তবে প্রতিযোগিতার বাজারে ইইউর স্বার্থ রক্ষা করেই সেই পথে এগোনো হবে।

ইইউর বিভিন্ন সূত্রও বলছে, নির্ধারিত সময়সীমা বড়ানোর সম্ভাবনা আছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এই লক্ষ্যে ছাড়পত্র দেওয়ার কথা। সেক্ষেত্রে মার্চে আলোচনা শুরু করে অক্টোবরের মধ্যে কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে যাতে ডিসেম্বরের মধ্যেই আইনি প্রস্তুতি শেষ হয়ে যায়। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির কাঠামোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বোঝাপড়ার লক্ষ্যও স্থির করা হয়েছে। কোনো কারণে ব্রিটেন ও ইইউ সমঝোতায় আসতে না পারলে চুক্তিহীন ব্রেক্সিটের দুঃস্বপ্ন আবার বাস্তব হয়ে উঠবে।

অর্থনীতি চাঙ্গা করার চেষ্টায় বরিস

বিচ্ছেদের পর ইইউর সঙ্গে ভবিষ্যত্ সম্পর্ক স্থির করার ক্ষেত্রেও বিলম্ব চান না প্রধানমন্ত্রী বরিস। চলতি বছরেই সেই লক্ষ্য পূরণ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে ব্রিটেনের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে বদ্ধপরিকর তিনি। সেই উদ্যোগের আওতায় আফ্রিকা মহাদেশের দিকে নজর দিচ্ছেন জনসন। গত সোমবার লন্ডনে আফ্রিকার ২১টি দেশের এক সম্মেলনে তিনি সেসব দেশে ব্রিটিশ বিনিয়োগ বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন। ব্রিটিশ উন্নয়ন সাহায্য মন্ত্রী অলোক শর্মা মনে করিয়ে দিয়েছেন, আফ্রিকার ১৫টি দেশই বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দাবিদার। সেই সঙ্গে ২০৫০ সালের মধ্যে আফ্রিকার জনসংখ্যা দ্বিগুণ হচ্ছে। ফলে এই মহাদেশে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে।