রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় আইসিজের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২০, ০০:২৬

মো. রাজিবুল হাসান সৈকত

বিশ্ব মানবতার বিপর্যয় ঠেকাতে ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিলেন জাতিসংঘের আওতাধীন দ্য হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দিতে এবং চলমান নিপীড়ন অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গত নভেম্বরে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিজেতে মামলা করে পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট একটি দেশ গাম্বিয়া। উভয় দেশই ১৯৪৮ এর গণহত্যা সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ।

উল্লেখ্য, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে চরম বর্ণবৈষম্যের শিকার। দেশটিতে বহু দিন আগেই ১৯৮২ সালে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানে তারা সব ধরনের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। ২০১৭ সালের আগস্টে দেশটির সামরিক বাহিনী নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং তাদের ওপর নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড, গণধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা চালায়। ফেসবুক, টুইটারেও তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপমানজনক মন্তব্য ও ঘৃণাবাক্য ছড়ানো হয়। এসব মন্তব্যে তাদের ‘কুকুর’, ‘সন্ত্রাসী’, ‘পোকামাকড়’, ‘অবৈধ বাঙালি অভিবাসী’, ‘কালো সুনামি’সহ আরো অনেক অবমাননাকর অভিধায় অভিহিত করা হয় যা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি দেশটির চরম বর্ণবাদী আচরণের বহিঃপ্রকাশ। এই নিষ্ঠুরতম অভিযানে প্রাণ বাঁচাতে সেই সময় সাড়ে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা সীমান্তবর্তী নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী মানবেতর জীবনযাপন করছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বিদ্যমান ৬ লাখ রোহিঙ্গা এখনো গণহত্যার মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে আছে। পুরো ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এক প্রকার উদাসীন ভূমিকা রেখেছে। এরপর রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে গাম্বিয়া আইসিজের দারস্থ হয়।

গত ১০-১২ ডিসেম্বর তিন দিনব্যাপী শুনানির পর গত বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের প্রতি চারটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। অন্তর্বর্তী আদেশ চারটি হচ্ছে—১. গণহত্যা সনদের ধারা ২ অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের হত্যাসহ সব ধরনের নিপীড়ন থেকে বিরত থাকতে হবে। ২. সশস্ত্র বাহিনী বা অন্য কেউ গণহত্যা সংঘটন, ষড়যন্ত্র বা উসকানি দিতে পারবে না। ৩. গণহত্যার সব আলামত রক্ষা করতে হবে। ৪. চার মাস পর আদেশ অনুযায়ী মিয়ানমার যেসব ব্যবস্থা নিয়েছে তা আদালতকে জানাতে হবে এরপর চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত ছয় মাস পরপর আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

আদালতের ১৭ জন বিচারক সর্বসম্মতভাবে এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গাম্বিয়ার এই মামলা করার অধিকার নেই—মিয়ানমারের এমন আবেদন নাকচ করে আদালত জানিয়েছেন গণহত্যা সনদের ধারা ৮ ও ৯ এর আওতায় গাম্বিয়া মামলা করার অধিকার রাখে। এই মামলা আইসিজের এখতিয়ার বহির্ভূত—মিয়ানমারের এমন আরেকটি দাবিও আদালত খারিজ করে দেন। এছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ভূমিকা ইতিবাচক ছিল না বলে আদালত তার পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আদালত জানিয়েছেন ক্ষুদ্র রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর সুরক্ষা লাভের অধিকার রয়েছে। রোহিঙ্গা গণহত্যায় মিয়ানমারের অভিপ্রায় থাকতে পারে এমন একটি মত দিয়েছেন আদালত।

যদিও আইসিজের অন্তর্বর্তী আদেশ এই মামলার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ, তথাপি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার রক্ষায় এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দশকের পর দশক ধরে মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে জাতিগত নির্মূল অভিযান চালিয়ে আসছিল মিয়ানমার তাতে এই প্রথম আইনি বাধার মুখে পড়লো দেশটি। আইসিজের এই রায় মেনে চলতে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাধ্য। বিশ্লেষকদের মত—এই রায়কে উপেক্ষা করা মিয়ানমারের জন্য খুবই কঠিন হবে। এখন দেখার বিষয় আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশ অনুসারে কি পদক্ষেপ গ্রহণ করে সু চির সরকার। বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে একটি ভীতিকর পরিবেশ বিরাজমান। এজন্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেখানে একটি উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা মিয়ানমারের অবশ্য কর্তব্য। দেশটিকে এই রায় বাস্তবায়ন করতে বিশ্ব মানবাধিকার সংগঠনগুলো থেকে শুরু করে জাতিসংঘ এবং বহির্বিশ্বের নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করা উচিত। যেহেতু রায় কার্যকরের কোনো উপায় আইসিজের হাতে নেই; ফলে আইসিজের নির্দেশ সঠিকভাবে মেনে না চলার দৃষ্টান্ত আছে। মিয়ানমারও যদি সেই পথে হাঁটে তখন রায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিরাপত্তা পরিষদের ওপর বর্তাবে। নিরাপত্তা পরিষদের দুই স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র চীন ও রাশিয়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে শুরু থেকেই মিয়ানমারের পক্ষাবলম্বন করে চলেছে। ফলে রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের পক্ষে তাদের ভেটো দেওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। কৌশলগত কারণেই হোক অথবা বাণিজ্যিক স্বার্থে কিংবা ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে তারা এটি করতে পারে। তবে বিশ্বের সর্বোচ্চ আদালতের এই রায় দেশ দুটোর ওপর মিয়ানমারের প্রতি তাদের বর্তমান অবস্থান বদলাতে নৈতিক চাপ বাড়াবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের এক্ষেত্রে কূটনৈতিক তত্পরতা জোরদার করা দরকার—চীন ও রাশিয়া বিশেষত চীনকে এটা বোঝানো খুবই জরুরি যে, মিয়ানমারের বর্তমান রোহিঙ্গানীতি অদূর ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বৃহত্ বিপদের কারণ হতে পারে।

n লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়