পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ভানু নেছা মুক্তিযোদ্ধা। বয়স এখন আশি ছুঁইছুঁই। দেশের স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে জীবনবাজি রেখে পাবনার মুক্তিযোদ্ধাদের বাঙ্কারে গোলাবারুদ সরবরাহ, সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণসহ নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধে রেখেছিলেন অসামান্য ভূমিকা। সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে কপালে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু গত প্রায় ছয় মাস ভালো নেই স্বাধীনতা যুদ্ধের বীরসেনানী পাবনার তালিকাভুক্ত এবং জীবিত একমাত্র এই নারী মুক্তিযোদ্ধা। বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগে গুরুতর অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী তিনি। রণাঙ্গনের অসীম সাহসী এই মুক্তিযোদ্ধার সুচিকিত্সার দায়িত্ব নেবে সরকার, দাবি সহযোদ্ধা ও স্থানীয়দের।
তেঁতুলিয়া গ্রামের ভানু নেসার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় মাঘের শীতেও কুঁড়েঘরের মেঝেতে শুয়ে আছেন প্রায় ৮০ বছর বয়সি এই বৃদ্ধা। পুত্রবধূ সূর্য খাতুন কমলালেবুর রস করে খাওয়াতে চেষ্টা করছেন। কেমন আছেন জানতে চাইলে ইশারায় এই প্রতিবেদককে নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে ভানু নেসা ভেঙে পড়েন কান্নায়।
সূর্য খাতুন জানালেন, প্রায় ছয় বছর ধরে ভানু নেছার বার্ধক্যজনিত নানা রোগ বাসা বেঁধেছে শরীরে। তবে গত ছয় মাস ধরে অবস্থার ক্রমাবনতি হয়েছে। হাঁটাচলার শক্তি হারিয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি হারিয়ে ফেলেছেন কথা বলার শক্তিও। ১০ সদস্যের পরিবারে দিনমজুর সন্তানদের সীমিত আয়ে সম্ভব হয়নি উন্নত চিকিত্সা। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেলেও তার সবটুকুই চলে যায় দুধ, ফল ও ওষুধ কিনতেই। ধারদেনা করে ছেলেরা দুইবার নিয়ে গেছেন ঢাকায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি চিকিত্সার সামর্থ্য না থাকায় এখন বাড়িতেই ফেলে রেখেছেন।
উন্নত চিকিত্সায় সরকারের সহায়তা চেয়ে ভানু নেছার নাতি মনিরুল ইসলাম বলেন, দাদিকে এখন তিলে তিলে নিঃশেষ হতে দেখে খুব কষ্ট হয়। তিনি খুব শক্তিশালী ও দৃঢ় মনোবলের মানুষ ছিলেন। তাদের সব সময় শাসনে রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের কত গল্পই না তিনি বলেছেন। অথচ এখন তিনি বিনা চিকিত্সায় তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। দেশের জন্য যে মা নিজের জীবনের মায়াই শুধু নয় কোলের সন্তানের কথাও ভাবেননি, তার জীবন বাঁচাতে কি রাষ্ট্র কিছুই করবে না?
সাঁথিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সাঁথিয়ার ধূলাউড়ি, ধোপাদহ, রাজাই প্রামানিকের বাড়িসহ বিভিন্ন রণাঙ্গনে ভানু পুরুষ যোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছেন সম্মুখসমরে। ডিসেম্বরের ৮ তারিখে মাধপুর এলাকায় পাকসেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে তাদের গুলি শেষ হয়ে যায়। ভানু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সহযোদ্ধাদের বাঁচাতে সেদিন সাঁথিয়া থেকে গুলির বস্তা মাথায় নিয়ে, পৌঁছে দিয়েছেন বাঙ্কারে বাঙ্কারে। সেদিন ভানুর সাহসিকতার কারণেই তারা প্রাণে বেঁচে যান। অথচ আজ স্বাধীন দেশে ভানুই ধুঁকে ধুঁকে মরছে। ভানুর চিকিত্সায় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।
