মাত্র ১৭-১৮ দিনে চীনের নতুন ছোঁয়াচে করোনা ভাইরাস রোগ চীন তো বটেই, সারা পৃথিবীতে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। আমাদের দেশে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু হয়নি—এটা যেমন সত্য এবং এটাও সত্য, চীনের সঙ্গে বিভিন্ন কারণে আমাদের যাতায়াত ও যোগাযোগ উপেক্ষা করার মতো নয়। এছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে এই ভাইরাস রোগী শনাক্ত করা হয়েছে।
করোনা ভাইরাস কী
করোনা ভাইরাস সংক্ষেপে সিওভি। এটি নতুন ভাইরাস। যা মনুষ্যসমাজে আগে কখনো ছিল না। চীনের ইউনান প্রদেশের একটি বাজারে, যেখানে বন্যপশু ও মাছ বিক্রি হতো, সেখান থেকেই প্রথম মানুষ সংক্রমিত হয়। এভাবে জন্তু-জানোয়ার থেকে মানুষের দেহে এই নতুন ভাইরাস প্রবেশ করে। তারপর এটা বিদ্যুদ্গতিতে মানুষ থেকে মানুষের মধ্যে (ছোঁয়াচে রোগ) ছড়িয়ে পড়ছে। আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। ইবোলা, এইচআইভি সংক্রমণের মতো এটাও মানবসমাজের ওপর একটি নতুন ভাইরাসের আক্রমণ। এর ফলে এই ভাইরাস ও রোগ সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দ্রুতগতিতে সমাধান খুঁজছে। বর্তমানে চীনের সমস্ত পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সব প্রদেশে এটা এপেডিমিক পর্যায়ে ছড়িয়ে গেছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে।
অন্য দেশে
চীনেই এটা থেমে থাকেনি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এর সংক্রমণ চলছে। দেখা গেছে, চীন থেকে যারা অন্যান্য দেশে গেছেন তাদের মধ্যে এই রোগ দেখা যাচ্ছে। হংকং, তাইপে, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডে। এছাড়াও ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রে এই রোগী শনাক্ত করা গেছে। সব ক্ষেত্রেই যারা সম্প্রতি চীন ঘুরে এসেছেন তাদের মধ্যে এ রোগ ধরা পড়ছে। এই লেখা তৈরি পর্যন্ত প্রকাশিত চীনের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, শনাক্ত করা ২ হাজার রোগীর মধ্যে ১০৫ জন মারা গেছেন। এখনো গুরুতর অসুস্থ ৩০০ জন। ১৬-১৭ দিনে এই অবস্থা। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক এতে কোনো সন্দেহ নেই।
এ রোগের উপসর্গ ও লক্ষণ
করোনা ভাইরাস এটি শ্বাসনালি সংক্রমক ভাইরাস। সুতরাং এর গুরুত্বপূর্ণ তিনটি উপসর্গ হচ্ছে : জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট। গুরুতর শ্বাসকষ্ট একটি মারাত্মক উপসর্গ। যার মানে হচ্ছে রোগটি নিউমোনিয়ার দিকে যাচ্ছে। বিশেষ করে, বৃদ্ধ ও শিশুদের নিউমোনিয়া অত্যন্ত মারাত্মক পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। শেষ পর্যায়ে লিভার ও কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে।
চিকিত্সা
এ রোগের এখন পর্যন্ত খুব ভালো চিকিত্সা বের হয়নি। প্রথমত রোগী থেকে সংক্রমণ যাতে না ছড়াতে পারে, সেজন্য তাকে আলাদা রাখতে হবে। এর জন্য সংক্রামক হাসপাতালে (ইনফেকশাস হসপিটাল) তাকে ভর্তি করতে হবে। এই হাসপাতালে ছোঁয়াচে রোগের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিত্সক ও সেবক-সেবিকার মাধ্যমে চিকিত্সা দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছে তার মধ্যে প্রোটিএইচ ইনহিবিটর, যথা লোপেনাভির এবং রেটোনাভির এজেন্ট। (নিউমোনিয়া রোগীদের জন্য) এক্সপেরিমেন্টাল জন্তুদের ওপরে ইন্টারফেরন ব্যবহার করা হয়েছে। মানুষের ওপর ব্যবহারের ফলাফল এখনো জানা যায়নি এবং এই রোগের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা হয়নি। তবে চেষ্টা শুরু হয়েছে।
রোগ নিরাময়ের চাইতে রোগ প্রতিরোধ সহজ ও সস্তা
এখন পর্যন্ত রোগ প্রতিরোধের পুরোপুরি ব্যবস্থা সম্পর্কে আমরা জানি না। তবে এটা জানা যায়, মানুষ থেকে মানুষে এ রোগ সংক্রমিত হয়। আমরা এখন এ-ও জানি, যার ভেতরে এই জীবাণু প্রবেশ করেছে, তার থেকে সুস্থ মানুষের মধ্যে এ জীবাণু প্রবেশ করার ১০-১২ দিন পর রোগের উপসর্গ প্রকাশ পায়। কিন্তু উপসর্গ প্রকাশ করার আগে থেকেই জীবাণু তার ভেতরে প্রবেশ করার কারণে তিনি ছোঁয়াচে হয়ে যান। প্রথম পর্যায়ে তাই তিনি একজন সুস্থ মানুষ হিসেবে সমাজে বিচরণ করতে পারেন।
সাধারণত নিঃশ্বাসের মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়। তাদের হাঁচি, কাশিতে অজস্র জীবাণু বের হয়। সুস্থ মানুষ নিঃশ্বাসে অথবা ভেজা চোখের মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারে। হাতে বা আঙুলে জীবাণু থাকলে সেটা নাক, চোখ স্পর্শ করার কারণে হাতের মাধ্যমে এ রোগ ছড়াতে পারে দ্রুতগতিতে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ সারা দিনে ২০-২৩ বার তার হাত বা আঙুল মুখে, চোখে, নাকে লাগায় প্রতি ঘণ্টায়। সুতরাং জাগ্রত অবস্থায় ১৮ ঘণ্টায় ৩৬০ বার মুখমণ্ডলে, চোখ বা নাকে হাত দেয়। (এক) সে জন্য বারবার হ্যান্ড লোশন বা সাবান দিয়ে হাত ধোয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। (দুই) মাস্ক বা মুখোশ পরা আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে মাস্কের বড়ো অসুবিধা, এতে চোখ ঢেকে রাখা যায় না। মাস্কের আশপাশে ঢিলা থাকে এবং মাস্ক বারবার বদলানো যায় না। এর জন্য বড়ো ও টাইট মাস্ক ব্যবহার করা প্রয়োজন।
কোথা থেকে রোগ ছড়ায়
(এক) রোগীর বডি থেকে। (দুই) যেখানে অনেক জনসমাগম হয় যেমন—জনসভা, ধর্মীয় সভা, বাচ্চাদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতালের আউটডোর, ব্যক্তিগত ও সরকারি সামাজিক আয়োজন, পার্টি সেন্টার, পার্ক, সিনেমা হল ইত্যাদি। চীনের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে ইউনান প্রদেশে এসব স্থান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। গণপরিবহন, উড়োজাহাজ, রেলগাড়ি ইত্যাদি। এগুলো আমাদের মনে রাখতে হবে। এয়ারপোর্ট, সমুদ্রবন্দর, রেল স্টেশন, হাসপাতাল, আউটডোর ইত্যাদি জনবহুল স্থানে স্ক্যান করতে হবে।
চীনে ব্যবহূত জ্বর দেখার স্ক্যানার জোগাড় করতে হবে। এটা শুধু কপালের কাছে লাগালেই গাণিতিক অক্ষরে স্পষ্টভাবে দেখা যাবে, যা ভাইরাসের প্রথম উপসর্গ জ্বর।
টিভি, রেডিও, সংবাদপত্রকে তাদের যোগ্য ও প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে হবে। কেমন করে আত্মরক্ষা করতে হবে, তা শিখিয়ে দিতে হবে। কেউ যেন ভয় না পায়, সেটাও দেখতে হবে।
শেষ কথা
সরকার ও চিকিত্সক, সেবক-সেবিকাসহ জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মীদের এসব ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। এ ব্যাপারে ন্যাশনাল কমিটি অব এক্সপার্ট অবিলম্বে গঠন করা উচিত। আমাদের স্মরণে আছে, বহু বছর আগে প্রতিবেশী দেশে প্লেগের আবির্ভাব হয়েছিল। তখনকার জাতীয় কমিটিতে স্বাস্থ্য বিভাগ, পুলিশ, বিডিআরসহ জাতীয় কমিটির সাফল্যের ফলে একটি প্লেগ রোগীকেও বাংলাদেশে শনাক্ত করা যায়নি।
n লেখক :রোগবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি
