রাজধানীর ঢাকার ফুটপাতের বিভিন্ন খুঁটিতে হঠাত্ দেখিলে মনে হইতে পারে কোনো দৈত্যের বড় বড় চুল অযত্নে জট লাগিয়া গিয়াছে। কিন্তু তাহা চুল নহে, তার। ইন্টারনেট, ডিশ, টেলিফোন, বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনগুলি জড়াইয়া রহিয়াছে একসঙ্গে। এই ‘জটাতারের’ ভারে কোথাও কোথাও নুইয়ে পড়িয়াছে বৈদ্যুতিক ও সড়কবাতির খুঁটি।
রাজধানী ঢাকার বহুদিনের সমস্যা ঝুলন্ত তার। জানা যায়, ২০০৯ সাল হইতেই সরকার রাজধানীতে ঝুলিয়া থাকা বিদ্যুত্, ডিশ ক্যাবল, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (আইএসপি), মোবাইল কোম্পানি, বিটিসিএলের ল্যান্ড ফোনের তারসহ সকল ধরনের তারকে বিশ্বের অন্যান্য আধুনিক শহরের মতো মাটির নীচ দিয়া স্থাপনের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই লক্ষ্যে ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) প্রকল্পের আওতায় দুইটি প্রতিষ্ঠানকে মাটির নিচ দিয়া তার পরিচালনার জন্য অবকাঠামো স্থাপনের লাইসেন্স দেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয়, তাহাদের তৈরি ভূগর্ভস্থ ফাইবার অপটিকেসর সঙ্গে যুক্ত হইয়া সেবা প্রদান করিবে সংস্থাগুলি। ফলে সমগ্র দেশে একটি নেটওয়ার্কের আওতায় সকল প্রতিষ্ঠান মাটির নিচ দিয়াই তাহাদের সংযোগ প্রদান করিতে পারিবে। প্রকল্প মোতাবেক সরকারি সংস্থাগুলির প্রায় বেশিরভাগ তারই মাটির নিচে চলিয়া গেলেও অভিযোগ রহিয়াছে যে, বেশিরভাগ ডিশ অপারেটর আর ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের তার এখনো মাটির উপরেই রহিয়াছে। বৈদ্যুতিক খুঁটি কিংবা সড়ক বাতির খুঁটির সঙ্গে পেঁচাইয়া পরিস্থিতি আরো বিপজ্জনক আকার ধারণ করিয়াছে। শুধু ঝুলিয়া থাকাতেই এই সমস্যার শেষ নহে। ঝুলিতে ঝুলিতে অনেক স্থানে তারগুলি মাটি স্পর্শ করিয়া ফেলিতেছে। সেই তার পায়ের সঙ্গে জড়াইয়া গিয়া প্রায়শই অনেকে আহত হইতেছেন। তাহা ছাড়া বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হইয়া প্রাণহানি ঘটিবারও নজির রহিয়াছে। ঝুলিয়া থাকা ডিশ বা ইন্টারনেটের ক্যাবল হইতে অগ্নিকাণ্ড ছড়াইয়া পড়িবার আশঙ্কাও অমূলক নহে। বিটিআরসি সূত্রমতে, গত চার বত্সরে ঝুলন্ত তারের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ভূগর্ভে স্থানান্তরিত হইয়াছে। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ এখনো রাস্তায় ঝুলিতেছে। জানা গিয়াছে, বেশিরভাগ এলাকার ইন্টারনেট সেবাদাতা ও ক্যাবল টিভি অপারেটররা ভূ-গর্ভস্থ কমন নেটওয়ার্কে যুক্ত হইতে চাহিতেছেন না। তাহাদের দাবি, ভূ-গর্ভস্থ এই কমন নেটওয়ার্কে ঢুকিতে মাশুল বেশি ধরিতেছে সংশ্লিষ্ট দুই কোম্পানি। ইহাতে ব্যবসায়িক ক্ষতির কথা চিন্তা করিয়া তাহারা এই ব্যাপারে কম আগ্রহ দেখাইতেছেন। অন্যদিকে ইন্টারনেট সেবাদানকারী আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলি বলিতেছে, এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানগুলি যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি ভবনে ক্যাবল নিয়া যাইতে না পারিবে, ততদিন পর্যন্ত ঝুলন্ত তার অপসারণ করা সম্ভব হইবে না।
সরকার প্রায়শই অবৈধ তারের বিরুদ্ধে অভিযান চালাইয়া থাকে। কিন্তু এই তার ফুটপাতের অবৈধ দখলদারদের মতো হইয়া গিয়াছে। একবার অভিযান করিয়া আসিবার কিছুক্ষণ পরই আবার তার ঝুলিতে দেখা যায়। ঝুলন্ত তারের জঞ্জাল হইতে মহানগরবাসী মুক্তি চাহেন। ঝুলন্ত তার অপসারণ একটি চলমান প্রক্রিয়া। সুতরাং এই অবৈধ তার অপসারণ করিতে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় আরো বৃদ্ধি করিতে হইবে।
