আমরা ভবিষ্যত্ প্রজন্মের ভালো-মন্দের ব্যাপারে অনেকটা উদাসীন বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। আজকের শিশু আগামী দিনের দেশ ও জাতির কর্ণধার। তাহাদের সঠিকভাবে গড়িয়া উঠিবার উপর দেশের ভবিষ্যত্ নির্ভরশীল। কিন্তু তাহারা আজ বিশেষত শহর-নগরে অবহেলায়-অনাদরে বাড়িয়া উঠিতেছে। তাহাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের প্রধান হাতিয়ারগুলি হইল সুষম খাবার, সুশিক্ষা, সুস্থ বিনোদন, খেলাধুলার ব্যবস্থা থাকা ইত্যাদি। বিশেষ করিয়া তাহাদের খেলাধুলার জন্য যে অবারিত মাঠ দরকার তাহা শহরাঞ্চলে দিন দিন সংকুচিত হইয়া যাইতেছে। রাজধানীতে এই সংকট আরো বেশি। কিন্তু ইহার কোনো সমাধান তো হইতেছেই না, বরং অন্যান্য নগরীতেও এখন তাহার বিরূপ প্রভাব পড়িতেছে। রাজধানীর মাঠগুলি রক্ষা না করিতে পারার ব্যর্থতায় অন্যান্য সিটি করপোরেশনেও মাঠ দখলকারীরা দুঃসাহস পাইতেছে। যেমন রংপুর সিটি করপোরেশনের অগ্রযাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালে। ইহারই মধ্যে এই সিটি করপোরেশন হইতে খেলার মাঠ হারাইয়া যাইতে শুরু করিয়াছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এইরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হইলেও এই ব্যাপারে কাহারো কোনো মাথাব্যথা আছে বলিয়া মনে হয় না।
দুঃখজনক হইলেও সত্য, বর্তমানে রংপুর সিটি করপোরেশনের নিজস্ব কোনো মাঠই নাই। এমনকি কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ, ক্রিকেট গার্ডেন, রংপুর স্টেডিয়াম, কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠ ছাড়া এই নগরে আর কোনো উল্লেখযোগ্য খেলার মাঠ নাই। ২০৫ দশমিক ৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই নগরে রহিয়াছে ৩৩টি ওয়ার্ড। লোকসংখ্যা ১০ লক্ষাধিক।, যাহার মধ্যে ৪ লক্ষাধিক শিশু-কিশোর। এই শিশু-কিশোররা উন্মুক্ত প্রান্তরে অবাধে বিচরণের সুযোগ না পাওয়ায় তাহাদের সোনালি শৈশব হারাইয়া ফেলিতেছে। টিভি দেখা, ভিডিও বা মোবাইল গেম খেলা ইত্যাদি নিয়াই তাহাদের ব্যস্ততা বাড়িতেছে। ইহাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাহারা নেশাগ্রস্ত হইয়া পড়িতেছে। মোবাইল ফোন ছাড়া খাওয়াদাওয়াও করিতেছে না। ইহাতে অনেক সময় দেখা দিতেছে শিশুর স্থূলতা সমস্যা। সবচাইতে ভয়ংকর ব্যাপার হইল, তাহাদের কেহ কেহ মাদকাসক্তিতে জড়াইয়া পড়িতেছে। পরিবার-পরিজনের সহিত খারাপ আচরণ করিতেছে। তাহাদের সংসারে অশান্তি-অস্থিরতা লাগিয়াই আছে।
বড়ো আশঙ্কার কারণ হইল, রংপুর নগরীর মূল এলাকা সাবেক পৌরসভার ১৮টি ওয়ার্ড ছাড়া সিটি করপোরেশনের গ্রামীণ আবহ থাকা ১৫টি ওয়ার্ডেও আজকাল শিশুরা খেলাধুলা করিতে পারিতেছে না। এখানকার মাঠগুলিতেও গড়িয়া উঠিতেছে মার্কেট বা আবাসিক ভবন। এই নগরে মাঠ রক্ষার উদ্যোগ না নিলে এবং পরিকল্পিতভাবে নগরকে সাজাইতে না পারিলে আগামী দিনগুলিতে বহুমুখী সমস্যা মাথা চাড়া দিয়া উঠিবে। এই জন্য শহর, নগর, গ্রাম যাহাই বলি না কেন, সর্বত্র খেলাধুলার মাঠ ও বিনোদনের পার্ক অবশ্যই থাকিতে হইবে। সারাদেশের জন্যই এই ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করিতে হইবে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, রাস্তাঘাট ইত্যাদি সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করিতে হইবে, যাহাতে তাহা বেদখল হইয়া না যায়। পূর্ব হইতে পরিকল্পনামাফিক বিভিন্ন স্থান চিহ্নিত না করিবার কারণে যে যাহার মতো স্থাপনা গড়িয়া তুলিতেছে। আমরা মনে করি, মাঠঘাট রক্ষায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নাগরিকদের সচেতনতা সবচাইতে জরুরি। তাহারা প্রতিরোধ-প্রতিবাদ না করিলে এই সংকটের কোনো সুরাহা হইবে বলিয়া আশা করা যায় না।
