ঢাকা সিটিতে নির্বাচন কমিশন পাশমার্ক পাবে তো?

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২০, ০৮:২৬

১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় প্রার্থীরা তৎপর রয়েছেন। ঢাকা এখন পোস্টারের নগরী। মাইকের শব্দে কান ঝালাপালা হওয়ার নগরী। ঘরে-বাইরে যেখানেই থাকুন, শব্দাঘাতে আপনাকে ঘায়েল হতেই হবে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে রোগযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন? আপনাকে দুদণ্ড শান্তি দেবে সুমধুর সংগীতধ্বনি। গানে গানে ভোট প্রার্থনা এবার ভালোভাবেই চলছে। আপনি পরীক্ষার্থী, বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে ক্লান্তি বোধ করছেন? আপনার মনোযোগ একটু অন্যদিকে নেওয়ার জন্য এবার টনিকের কাজ করছে ভোটের প্রচার। বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে পাড়া মাতিয়ে রাখছে বিভিন্ন প্রার্থীর সমর্থকরা। ‘অমুক ভাইয়ের সালাম নিন, তমুক মার্কায় ভোট দিন’—এই আওয়াজ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে, যেন অবিরাম পাউরুটি ভক্ষণ!

প্রচার-প্রচারণায় কোনো ঘাটতি দেখা না গেলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোট নিয়ে উত্সাহের ঘাটতি আছে। শতকরা কত ভাগ ভোটার ভোটকেন্দ্রে যাবেন, তা বলা যাচ্ছে না। ভোট নিয়ে নেতিবাচক কথাই বেশি। সাধারণভাবে এটা মনে করা হচ্ছে যে, ভোট দিলেও যা, না দিলেও তা। কে জিতবে সেটা সবাই জানে। যে নির্বাচনের ফলাফল পূর্বনির্ধারিত, সে নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষ উত্সাহী হবে কেন? তবে উত্সাহ আছে আওয়ামী লীগের ও বিএনপির। কারণ জয়-পরাজয় এই দুই দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগ জিতে প্রমাণ করতে চায় যে তাদের জনপ্রিয়তা কেবল অক্ষুণ্ন নেই, তা ক্রমবর্ধমান। তারা ক্ষমতায় থেকে দেশের যে উন্নয়ন করেছে, ভোটের মাধ্যমে মানুষ তার মূল্যায়ন করবে। আর বিএনপি প্রমাণ করতে চায়, সরকার জনবিচ্ছিন্ন, সরকারের পায়ের নিচে মাটি নেই। বেগম খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করার জন্য মানুষ নাকি বিএনপিকে ভোট দিতে তৈরি হয়ে আছেন।

নির্বাচনি প্রচার জমে ক্ষীর হলেও ভোটের পরিবেশ নিয়ে অবশ্য উদ্বেগ আছে। বিএনপির পক্ষ থেকে প্রতিদিন নানা অভিযোগ উত্থাপন করা হচ্ছে। বিএনপি প্রার্থীদের ওপর হামলা হয়েছে। পোস্টার ছেঁড়াসহ প্রচারণায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ নির্বাচন কমিশনে জমা দিলেও নির্বাচন কমিশন নির্বিকার রয়েছে। বাইরে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি পালটাপালটি দোষারোপ করছে। ভেতরে নির্বাচন কমিশনেও ঠেলাঠেলি চলছে। নির্বাচন কমিশনের মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিরোধ আছে। একজন নির্বাচন কমিশনার প্রকাশ্যে যেসব কথা বলছেন তা নির্বাচন কমিশনকেই অস্বস্তিতে ফেলছে। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারকে বিএনপির প্রতিনিধি হিসেবে উল্লেখ করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

মাহবুব তালুকদারের কথার সঙ্গে বিএনপি নেতাদের কথার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কমিশনে মাহবুব তালুকদার একা। তার বক্তব্যের সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য কমিশনাররা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একমত হন না। তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত মানেন না। এটা তিনি করতেই পারেন। কিন্তু ভিন্নমত পোষণ করে ব্যক্তিগতভাবে কিছু বাহবা পাওয়া ছাড়া এতে আর কী অর্জন হচ্ছে—সেটা অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সুষ্ঠু নির্বাচন করা। বিতর্ক বাড়ানো এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নয়।

কথা হলো, প্রচারণা চালাতে গিয়েই যারা নগরজীবনকে বাস অনুপযোগী করে তুলেছেন তারা জিতে এসে কী করবেন তা নিয়ে সংশয় প্রকাশের সুযোগ আছে। পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছে সমস্ত ঢাকা। অলিগলি কিছুই বাকি নেই। এই যে লাখ লাখ লেমিনেটিং পোস্টার ঝুলছে সর্বত্র, ভোট শেষে এগুলোর গতি কী হবে? এগুলো যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকবে, পরিবেশের জন্য এগুলো কত ক্ষতিকর হবে তা কি নির্বাচন প্রার্থীরা একবার ভেবে দেখেছেন? আদালত লেমিনেটিং পোস্টার ব্যবহার না করার পরামর্শ দিলেও তা কেউ মানছেন না। এই পোস্টারগুলো শহরকে অপরিচ্ছন্ন করছে, করবে। এগুলো সহজে নষ্ট না হওয়ায় পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে।

মানুষের কল্যাণ করার, উপকার করার জন্য নির্বাচনে দাঁড়িয়েই তারা মানুষের কত অকল্যাণ ও অপকার করছেন, সেটা যদি তারা বুঝতেন! মাইকের শব্দে পরীক্ষার্থী, রোগী, বয়স্ক মানুষ, শিশুসহ অনেকেরই কান ঝালাপালা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। ভোটে দাঁড়ানো এবং ভোট দেওয়া—দুটোই মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। এই অধিকার চর্চা করতে গিয়ে কারো শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি করা নিঃসন্দেহে অনুচিত কাজ। নির্বাচনি প্রচারে শব্দদূষণ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো মাথাব্যথা নেই।

ভোটপ্রার্থীরা, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে যারা মনোনয়ন পেয়েছেন, তারা ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য নানা ধরনের অঙ্গীকার করছেন, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। দুর্নীতিমুক্ত, বাসযোগ্য, সচল এবং সুশাসিত ঢাকা উপহার দেওয়ার কথা মেয়রপ্রার্থীরা বলছেন। স্বল্পমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকল্পনার কথাও কেউ কেউ বলছেন। তবে এর কোনটা, কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে তাদের কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা তাদের আছে কি না, সেটা একটা বড়ো প্রশ্ন। ভোটের আগে ভোটভিক্ষুকরা যতটা জনবান্ধব বলে নিজেদের উপস্থাপন করে থাকেন, ভোটের পরে আর তা থাকে না।

গত মেয়র নির্বাচনে ঢাকা উত্তরে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তাবিথ আওয়াল। তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থী আনিসুল হকের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। তারপর কি তিনি আর কোনো নাগরিক সমস্যা নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন? মানুষ কি তাকে কাছে পেয়েছে? যারা জনগণের প্রতিনিধি হতে চান, যারা নিজেদের জনকল্যাণে ব্রতী বলে মনে করেন, তাদের তো সব সময় মানুষের পাশেই থাকার কথা। ভোটের সময় জনবান্ধব, ভোট ফুরালে ফুট—এই যদি হয় নীতি তাহলে কি মানুষের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করা সহজ হয়?

ভোটের আগে প্রার্থীরা যেসব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, সেগুলো পূরণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব কি না, সেটা তাদের ভাবনায় আছে বলে মনে হয় না। সিটি করপোরেশনের মেয়রদের ক্ষমতা খুব বেশি নেই। তবে আন্তরিকতা, সদিচ্ছা, ন্যায়বোধ এবং দৃঢ়তা থাকলে যেটুকু ক্ষমতা আছে, তার সবটুকুর সর্বোত্তম ব্যবহার করে নাগরিকদের কিছু সমস্যা লাঘব করা সম্ভব। আনিসুল হক ও সাঈদ খোকন দুজনেই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে ঢাকা উত্তর এবং দক্ষিণের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। উত্তরের আনিসুল হক তার মেয়াদের অর্ধেক সময়ও দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। মৃত্যু তার পথরোধ করে দিয়েছে। কিন্তু ঐ স্বল্প সময়েই তিনি তার আন্তরিকতার প্রমাণ দিতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি যে পারেন, পরিবর্তন করা যে তার বিশ্বাসের অংশ ছিল, সেটা তিনি দেখিয়েছেন।

সাঈদ খোকনকে নিয়ে ভোটের লড়াইয়ে নামা নিরাপদ বোধ করেনি আওয়ামী লীগ। তাই দক্ষিণে এবার তাকে বাদ দিয়ে মেয়র প্রার্থী করা হয়েছে শেখ পরিবারের সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসকে। তার ইমেজ পরিচ্ছন্ন বলে মনে করা হচ্ছে। তাপসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতা করছেন বিএনপির ইশরাক হোসেন। ঢাকার সাবেক মেয়র ও বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা, মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ছাড়া তার আর কোনো যোগ্যতা আছে, সেটা জানা না-থাকলেও মার্কার জোরে (ধানের শীষ) তিনি তাপসের ঘাম কিছুটা ঝরাতে পারছেন।

উত্তরে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ব্যবসায়ী নেতা আতিকুল ইসলাম। বিএনপি থেকে লড়ছেন তাবিথ আওয়াল। তিনিও ব্যবসায়ী এবং ব্যবসায়ী-কাম রাজনৈতিক নেতা আবদুল আওয়াল মিন্টুর পুত্র। আতিকুল ইসলাম একাধিকবার বলেছেন, তাবিথ তার ভাতিজা। এখন দেখার বিষয় এই চাচা-ভাতিজার মধ্যে ভোটাররা কাকে পছন্দ করেন। ভাতিজার কপাল খুলবে—এমন আশার কথা কেউ ব্যক্ত করছেন বলে শোনা যায় না।

দুই সিটিতেই আরো বেশ কয়েকজন প্রার্থী আছেন। তবে তাদের নিয়ে খুব আলোচনা নেই। প্রচারেও তারা পিছিয়ে। অবশ্য খুব বেশি হইচই না করলেও ভোট পাবেন ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের দুই মেয়র প্রার্থী। এদের বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। তাদের ভোট নির্দিষ্ট। না জিতলেও সম্মানজনক ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা তাদের আছে।

নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের সামনে বড়ো চ্যালেঞ্জ একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান। উদ্যোগ, আয়োজন আড়ম্বরের কোনো কমতি নেই। শেষ মুহূর্তে নির্বাচন নিয়ে টানটান উত্তেজনাও দেখা যাচ্ছে। একেবারে একতরফা, পানসে নির্বাচন হচ্ছে না। ফলাফল যা-ই হোক না কেন, নির্বাচনটি যে বিতর্কমুক্ত হবে না, সেটা বলা যায়। অবশ্য এই বিতর্ক দেশের রাজনীতিতে বড়ো কোনো ঝড় তুলতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ রাজনীতি এখন বিতর্কের মধ্যেই আছে। ভোটের দিন কোনো হানাহানি, রক্তপাত না হলে এবং ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হলেই পাশমার্ক দেওয়া যাবে নির্বাচন কমিশনকে।

লেখক : বিভুরঞ্জন সরকার

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক