শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মশতকের শেষ দশক ও পরবর্তী শতকের প্রথম দশকের গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় তাঁর স্বচক্ষে দেখা ও উপলব্ধি করা রক্ষণশীলতা, শ্রেণিসংঘাত, ধর্মাশ্রয়ী কুপ্রথা, প্রথানুগ্যতা, পুরুষশাসিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে চিরায়ত ভালোবাসাকাতর নারীমনের বিক্ষুব্ধ ও সংঘাতসংকুল অপ্রকাশিত দ্বন্দ্বের স্বরূপ প্রকাশে সচেষ্ট শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নিরন্তর যুদ্ধ ঘোষণা কেবল নারীর মনকেই প্রলুব্ধ করেনি; প্রথাবিরুদ্ধ, সহানুভূতিশীল ও প্রেমাশ্রয়ী হাজারো পুরুষহূদয়কেও নাড়িয়ে দিয়েছিল। পক্ষান্তরে সেখানে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার সঙ্গে প্রগতিশীলতাকে উস্কে দিয়েছিল। উথাল-পাথাল প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের মতো সামাজিক প্রচলিত শাসনকারার ভিতকে এলোমেলো করেছিল। শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এ যুদ্ধ সশস্ত্র নয়; ছিল কথাসাহিত্যে। রেঙ্গুনে অবস্থানকালে এ যুদ্ধে নিজের শারীরিক ও মানসিক উপস্থিতি তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন এক মিস্ত্রির মেয়ে—শান্তিদেবীকে বিয়ে করে। শান্তিদেবীর বাবা এক মদ্যপায়ী পথভ্রষ্ট বুড়োর সঙ্গে বিয়ে ঠিক করলে শান্তিদেবীর এ পরিস্থিতির পরিত্রাণের বিনীত অনুরোধেই তিনি স্বেচ্ছায় বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অবশ্য শান্তিদেবী বেশিদিন বেঁচে থাকেননি, সপুত্রক প্লেগ রোগে মারা যান।
বাংলা কথাসাহিত্যে ‘অমর কথাশিল্পী’, ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’, ‘অপ্রতিদ্বন্দ্বী’ ইত্যাদি বহু অভিধায় অভিষিক্ত ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটানা প্রায় পঁচিশ বছরের (১৯১৩-১৯৩৮) সৃষ্টিসাধনার বিশাল সম্পদসম্ভারে তাঁর উপন্যাসের গুরুত্ব সর্বাধিক। এসবের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে অসংখ্য অবহেলিত, নিপীড়িত, নিষ্পেষিত, চিরায়ত ভালোবাসায় পোড় খাওয়া, ধর্মাশ্রয়ী সামাজিক দণ্ডের আগুনে জ্বলা নারী চরিত্র। তিনি সাধারণ মেয়ের আটপৌরে রোমান্টিক ঠাঁসবোনা কাহিনিনির্ভর সরল ভাববিভোর ভাষাকে পুঁজি করে নিরন্তর লিখে গেছেন প্রেমবিভোর নারীর সুখ-দুঃখের গল্প। লেখনীতে পতিতা, বিধবা, বৈষ্ণবী, সতী, অরক্ষণীয়া—সে যেমনটাই হোক না কেন, শরত্চন্দ্র তন্ময় থাকতেন তাদের প্রেমের অনাস্বাদিত বিরহে ও বঞ্চনায়।
শরত্চন্দ্রের উপন্যাস বা গল্পে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে অধিক লেখক-সহানুভূতি পাওয়া প্রায় সবই নারী চরিত্র। এদের উল্লেখযোগ্য চরিত্র হচ্ছে—রাজলক্ষ্মী, অভয়া, অচলা, সাবিত্রী, ভারতী, বিন্দুবাসিনী, হেমাঙ্গিনী, শৈলজা, পার্বতী, চন্দ্রমুখী, কাত্যায়নী, বিজলী, কিরণময়ী, সবিতা, পিয়ারী, রমা, মাধবী, হেমনলিনী, কমললতা, অন্নদা দিদি, বিরাজ, বিজয়া, ষোড়শী প্রমুখ। সংক্ষিপ্ত পরিসরে অল্প কয়টি চরিত্রের আলোচনাই সম্ভব। এসব চরিত্র অপরাপর চরিত্রের ভিড়েও নিজস্ব প্রবণতা বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে আজো পাঠকমনে স্থায়ীভাবে আসন করে নিয়েছে। তাদের চরিত্রবৈশিষ্ট্য, অবয়ব, আদর্শিক নানাদিক, একজন প্রেমময়ী নারী হিসেবে স্ব স্ব প্রেমের দাবি বনাম প্রথাগত, ধর্মগত সামাজিক দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে তাদের অবস্থানের কিছু দিক আলোচ্য।
নারীর সতীত্ব কী পদার্থ—‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের অন্নদা দিদিকে না পড়লে অজানাই থেকে যাবে। কাহিনিতে স্বামীর প্রতি অন্নদা এতটাই একনিষ্ঠ যে খুনি ও ছদ্মবেশী স্বামীর জন্যই সে কুলত্যাগিনী হয় এবং সে কুল-কলঙ্ক বয়ে নিয়ে চলে। আর, অন্নদা দিদিকে দেখেই শ্রীকান্ত নারীর কলঙ্কে সহজে বিশ্বাস করত না। ‘বিরাজ বৌ’ উপন্যাসে বিরাজকে স্বামীর কাছ থেকে ভয়ানক যাতনা, গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছিল। ঘটনাচক্রে বিরাজ গৃহত্যাগ করেছিল ঠিকই, কিন্তু তার সতীত্বের অবমাননা করেনি। কিন্তু তাকে জীবনপণ করে সতীত্বের পরীক্ষা দিতে হয়েছিল ঠিকই। ‘দেনা-পাওনা’ উপন্যাসে ষোড়শীকে মর্মান্তিকভাবে পরীক্ষা দিতে হয় সতীত্বের।
সতীত্বের বিপরীতে বিধিবিরুদ্ধ যৌনতার ফলাফলও কিছু চরিত্রে প্রকাশ পেয়েছে। ‘শেষের পরিচয়’-এর সবিতা প্রথমে বিবাহ করে ব্রজবাবুকে, সবিতা এই ব্রজবাবুকে ছেড়ে বারো বছর রমণীবাবুর শয্যাসঙ্গিনী হয়ে থাকে, শেষ পর্যন্ত সে বুঝতে পারে যে, এই গণিকাজীবনের অবসান জরুরি। তাই বিমলবাবুর ভালোবাসায় তার এ জীবনের সমাপ্তি ঘটায়। এই নারী চরিত্রের মধ্যে আদিম যৌনপ্রবৃত্তির প্রকাশ পেয়েছে; যা মানবচরিত্রে কখনো সুপ্ততা ভেঙে ঘটনার আকস্মিকতায় অবচেতনেই জেগে ওঠে। তবে যৌনতা যে দাম্পত্যজীবনের নৈতিকভিত্তি ও ধর্মসংস্কারে ধস নামিয়ে দেয় তাও প্রকাশ পেয়েছে। এমন অনৈতিক যৌনাচার নারীজীবনের স্বাভাবিক জীবনাচারকে কোন অতলে নিয়ে যায়, তার শিক্ষাও শ্রীকান্তের কমললতার কাহিনি থেকে নেওয়া যায়।
শরত্চন্দ্র তাঁর উপন্যাসে পতিতা চরিত্রে তাদের প্রেম, প্রেমের একনিষ্ঠতা ও সেবাপরায়ণতার চিত্রগুলোই প্রাধান্য দিয়েছেন। পতিতা শ্রেণির পাপের দিকে যদিও সমাজচক্ষু বিস্তারিত, শরত্চন্দ্র কিন্তু বারবারই এই অচ্ছুত্ শ্রেণিকে একনিষ্ঠ প্রেমের পরিণতির দিকেই নিয়ে গেছেন। বিজলী সত্যেন্দ্রের প্রেমে বাইজি পেশা ছেড়ে দিয়ে বলে, ‘যে রোগে আলো জ্বাললে আঁধার মরে, সূর্যি উঠলে রাত্রি মরে, আজ সেই রোগেই তোমাদের বাইজি চিরদিনের জন্য মরে গেল’, পিয়ারী বাইজি বাল্যপ্রণয়ের টানে আজীবন শ্রীকান্তনিষ্ঠ হয়ে থাকে, সাবিত্রী-সতীশের মধ্যে চলে প্রেমের নানা খেলা, চন্দ্রমুখী অনুরক্ত হয়ে থাকে দেবদাসে। ‘দেবদাস’-এর চন্দ্রমুখী, ‘শুভদা’র কাত্যায়নী এবং ‘আঁধারে আলো’র বিজলীর মতো বারবণিতাদের কাহিনিও পাঠকদের হূদয়কে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে।
‘গৃহদাহ’র অচলার বিবাহিত জীবনের প্রেমকে সমাজ ক্ষমা করেনি। বিবাহোত্তর নারীর প্রেম রীতি গর্হিত কাজ। কিন্তু স্বামী মহিমের ভাবাবেগহীন কঠিন আবেদন, অন্যদিকে সুরেশের উন্মত্ত আবেগের ব্যাকুলতার মাঝে অচলার কোমল নারীমন কিংকর্তব্যবিমূঢ় ছিল। অবশেষে সুরেশের লাম্পট্যের জন্যই বিবাহিত অচলার সতীত্ব নষ্ট হলো। অচলাকেই এর মূল্য দিতে হলো। সুরেশই অচলার স্বামীপ্রেমের একনিষ্ঠতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল। সুরেশকেই বলতে দেখা গেল, ‘তুমি অসূর্যম্পশ্যা হিন্দু ঘরের কুলবধূ নও, এটুকুতে তোমার জাত যাবে না,... আসলে তুমি একটা গণিকা, তাই তোমাকে ভুলিয়ে এনেছি।’ অপরিনামদর্শী এই যৌন আস্বাদনের ক্লেদে তার অভিসম্পাত-আচ্ছন্ন শরীর একসময় ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। এখানে লেখকের মনের কোণে অচলার প্রতি সুপ্ত সহানুভূতি থেকে থাকলেও কাহিনিচিত্রণে অচলা সহানুভূতি পায়নি।
শরত্চন্দ্রের ‘বিন্দুর ছেলে’র বিন্দুবাসিনী, ‘মেজদিদি’র হেমাঙ্গিনী, ‘পথের দাবী’র ভারতী, এবং‘নিষ্কৃতি’র শৈলজা সরল ও স্নেহপ্রবণ নারীর মূর্ত-প্রতীক। এখানে চিরায়ত নারীরূপের অনন্য একটি দিকের সন্ধান পাই।
