প্রতিভাদীপ্ত এক বাঙালির কথা

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২০, ২২:০৭

এই বাংলাদেশ, সোনার মানুষের বাংলাদেশ। অনাদিকাল থেকে এই বাংলার মাটিতে যেমন ফলেছে সোনালি শস্য, তেমন জন্ম দিয়েছে সোনার মানুষ। সেই আদর্শিক সোনার মানুষদের একজন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। জন্মেছিলেন ৩১ জানুয়ারি ১৯২১ সালে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার নাগবাড়ী গ্রামে। তার পিতা আবদুল হামিদ চৌধুরী ছিলেন তদানীন্তন প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ছিলেন অসম্ভব ধীশক্তিসম্পন্ন মেধাবী ও মননশীল মানুষ। ছিলেন মানবিক ও প্রগতিশীল ধারার নেপথ্য নায়ক। এক জীবনে অনেক কাজ করেছেন, অনেক দায়িত্ব পালন করেছেন। সবচেয়ে বড়ো দায়িত্ব পালন করেছেন মুক্তিযুদ্ধের সময়ে, প্রবাসে বাঙালিদের স্বাধিকার আন্দোলনে দৃঢ় ভূমিকা পালন করেছেন বিশ্বব্যাপী।

‘প্রতি ঘণ্টায় বিবিসি খবর দিচ্ছিল, ঢাকা বাইরের জগত্ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, গুরুতর কিছু ঘটেছে, কত গুরুতর সেটা বলা যাচ্ছে না। একাত্তরের ছাব্বিশে মার্চ সকালবেলা এই খবর পেল বিশ্ববাসী। আমি হয়ে গেলাম একেবারে স্তম্ভিত। প্রতি মুহূর্তে প্রত্যাশা করছিলাম ঢাকা থেকে আপস আলোচনার সন্তোষজনক সংবাদ।

‘যথারীতি সাড়ে দশটায় জেনেভাস্থ জাতিসংঘ প্রাসাদে মানবাধিকার কমিশনের কাজ শুরু হলো। চেয়ারম্যানের অনুমতি নিয়ে সভার প্রারম্ভে বিবিসির খবরের উল্লেখ করে বললাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে আমি শঙ্কিত হয়ে পড়েছি। আমি এখনই আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি। আজকেই লন্ডনে ফিরে যাব এবং সেখান থেকে সম্ভব হলে ঢাকায়। আজকের সন্ধ্যায় বর্তমান অধিবেশনের সমাপ্তি পর্যন্ত থাকতে পারছি না।...

‘লন্ডনে নেমেই শুনলাম ইয়াহিয়া খানের দুটি ঘোষণা—আওয়ামী লীগ বেআইনি সংগঠন আর শেখ মুজিব দেশদ্রোহী। এই ঘোষণার পরিণাম কি বুঝতে বাকি রইলো না।...’

ওপরের উদ্ধৃতি বিচারপতি অধ্যাপক আবু সাঈদ চৌধুরীর। উদ্ধৃতিটা শুরুতেই একটু বড়ো হয়ে গেল, কিন্তু একজন বড়ো মানুষের মানস-মানচিত্র জানবার, বুঝবার ও অনুধাবনের জন্য প্রয়োজনও। একাত্তর সালে সবুজে শ্যামলে মোড়ানো বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানি হায়েনাদের কবলে আক্রান্ত, পোড়া বারুদের গন্ধে ছিন্নবিচ্ছিন্ন, সেই মহাদুর্যোগকালে তিনি বিদেশের মাটিতে একটি ফ্রন্ট বা সেক্টর খুলেছিলেন। চিরকালের শান্তিবাদী মানুষ বিচারপতি চৌধুরী এটাও জানতেন, শান্তির জন্য লড়াই করতে হয়। তিনি সেই লড়াইয়ে ছিলেন একজন নির্ভীক লড়াকু সৈনিক। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ রাতের অন্ধকারে নিরীহ ঘুমন্ত বাঙালি জাতির ওপর পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ার পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ ভারতে প্রবেশ করেন এবং ১৭ই এপ্রিল প্রবাসী মুজিবনগর সরকার গঠন করেন। মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের জন্য গোটা বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে এক-একজন মেজরের নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালনার ভার দিয়েছিলেন। আমার মনে হয়, এই ১১টি সেক্টরের বাইরে প্রবাসী বাঙালিদের একটি সূত্রে গাঁথার জন্য, একত্রিত করবার জন্য, স্বাধীনতাসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়বার জন্য, বাঙালির মন্ত্রে দীক্ষা দেবার জন্য প্রবাসের পথে-প্রান্তরে একটা সেক্টর খুলেছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। একাত্তরের সেই দুঃস্বপ্নের দিন রাতকে মনে রেখে নিঃসন্দেহে এই সেক্টরটিকে মুক্তিযুদ্ধের ‘বারো নম্বর’ সেক্টর হিসেবে আখ্যা দেয়া যায়। দিনরাত, খেয়ে না খেয়ে সততার সঙ্গে, নিষ্ঠার জাদুতে তিনি ঘুরে বেরিয়েছেন ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা দেশের পথে পথে। প্রাঞ্জল ভাষায় তার চষে বেড়ানো সেই পথের চমত্কার স্মৃতি লিখেছেন তিনি, ‘প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি’ বইয়ে।

আবু সাঈদ চৌধুরী কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এমএ ও আইন শাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪৬ সালে নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশনের ব্রিটেন শাখার সভাপতি দায়িত্ব পালন করেন। লন্ডনের লিংকস ইন হতে ব্যারিস্টার হওয়ার পরে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর জুনিয়র হিসেবে আইন ব্যবসায় শুরু করেন চৌকস এই মানুষটি। জীবনের নানা ক্ষেত্রে দেশ ও জাতির কল্যাণে নানা দায়িত্ব পালন করেছেন। যেমন পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাডভোকেট জেনারেল, ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। তার মেধার স্বীকৃতি দেশে যেমন দেশের বাইরেও পেয়েছেন। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে দেশীকোত্তম উপাধি প্রদান করে। এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আবু সাঈদ চৌধুরীকে সম্মানসূচক ডক্টর অব ল’ ডিগ্রিতে ভূষিত করে।

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী সম্পর্কে লিখতে গিয়ে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান “প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি’ বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন—‘বাঙালির অন্তর্নিহিত শক্তি ও আন্তরিক ইচ্ছায় তার আস্থা ছিল অপরিসীম। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, সত্যের জয় হবে। তাই জোরের সঙ্গে বলতে পেরেছিলেন : ‘লন্ডনের রাস্তায় আমার শবদেহ পড়ে থাকবে তবু পাকিস্তানের সঙ্গে আপস করে দেশে ফিরব না।”

এখানে স্মরণ করতে হয় অনেকটা তার একক প্রচেষ্টায় ’৭১-এর আগস্ট মাসে যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের পূর্বচুক্তিকৃত ৫০০ গানবোট পাঠানো বন্ধ হয়। এটি তখন না হলে পাকিস্তানি বাহিনীর তাণ্ডব আরো অনেকাংশে বৃদ্ধি পেত।

১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তিনি বঙ্গবন্ধুর হাতে প্রবাসী বাঙালিদের দানকৃত তহবিল থেকে সাড়ে চার লক্ষ পাউন্ড তুলে দেন। এটিই ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকে জমাকৃত প্রথম বৈদেশিক মুদ্রা। এমন মহত্ হূদয়ের মানুষেরা ছিলেন বলেই তো আজ আমরা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিক। বড়ো বেদনার সঙ্গে লিখতে হচ্ছে—বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কান্ডারি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নামে দেশের কোথাও কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। তাকে নিয়ে মৃত্যুদিনে বা জন্মদিনে কোথাও কোনো অনুষ্ঠান নেই। কেউ এই মহত্তর কর্মবীর মানুষটিকে মনে রাখছে না। ক্ষমা করবেন পরলোক থেকে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী—আমাদের এই নির্মম অক্ষমতা।

n লেখক : কথাসাহিত্যিক