বেস্টসেলার বই

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:৫০

রম্য গল্প

/ তারেকুর রহমান

মধুপুরের নিখিল হঠাত্ করে লেখক বনে গেল। বাংলায় তিনবার ফেল করা নিখিল এখন আলোচিত লেখক। ফেসবুকে পোস্ট একটা দিলে লাইক কমেন্টস গুনে শেষ করা যাবে না। তার অবশ্য যোগ্যতাও কম না। দুই লাইন নিজে থেকে লিখলে তিন লাইন অন্য জায়গা থেকে কপি করে নেয়। এজন্য অনেকে তাকে কপি রাইটার বলে। নিখিল এসবে কান দেয় না। সে মনে করে তার জনপ্রিয়তার কারণেই একটা গোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়। প্রতিবার বইমেলা এলে সে বড়ো লেখক হয়ে যায়। সারা বছর একটা লেখাও কারো চোখে না পড়লেও ফেব্রুয়ারি এলে সে লেখক হয়ে যায়। এই লেখক হওয়ার পেছনেও একটা বড়ো ইতিহাস রয়েছে।

ভবঘুরে নিখিল পড়াশোনাটাও ভালো করে শেষ করতে পারেনি। টেনেটুনে ইন্টার পাস করেছে। বহু বছর তার কোনো খোঁজ ছিল না। হঠাত্ করেই ফেসবুকে তাকে আবিষ্কার করা গেল। দুই-তিন লাইনের স্ট্যাটাস দিয়ে বেশ আলোচিত হলো সে। অবশ্য এ লেখাগুলো সে বিভিন্ন জায়গা থেকে কপি করে নিজের নামে চালিয়ে দেয়। আস্তে আস্তে তার জনপ্রিয়তা বাড়তে লাগল। কপিবাজ থেকে সে হয়ে গেল তথাকথিত ফেসবুক সেলিব্রিটি। দিন দিন ফেসবুকে নিখিলের উত্পাত বাড়তে লাগল। ঘণ্টায় ঘণ্টচায় ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করল সে। কিছুদিনের মধ্যে কী এক চাকরিতে ঢুকল সে। তারপরও ফেসবুকে নিয়মিত সরব। একদিন ফেসবুকে লিখল, আগামী বইমেলায় একটা বই বের করলে কেমন হবে? এই পোস্ট দেখে তার ভক্তরা তেলের বন্যা বইয়ে দিল। তার বই প্রকাশিত হওয়া বাংলা সাহিত্যের জন্য এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে। নিখিল অনেক বেশি উত্সাহ পেল। এদিকে এক প্রকাশনী তার সঙ্গে যোগাযোগ করল। এই প্রকাশনীর কাজই হলো এই টাইপের অখ্যাত লোকজনের বই টাকার বিনিময়ে ছাপানো। প্রকাশনীর আগ্রহ দেখে নিখিলের মন আনন্দে ভরে গেল। তার লেখক হওয়া এখন কেউ ঠেকাতে পারবে না। প্রকাশক জানাল বইয়ের টাকা লেখককেই দিতে হবে। বিনিময়ে তাকে দু শ বই দেওয়া হবে। নিখিল এ প্রস্তাব শুনে একটু ভীত হয়ে গেল। অতঃপর তার ফেসবুক জনপ্রিয়তার কথা চিন্তা করে রাজি হয়ে গেল। সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে গেল। শুধু পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত নেই। নিখিল খুব দ্রুত পাণ্ডুলিপি তৈরিতে মনোযোগ দিল। নানান লেখকের নানান লেখা কপি করে তার সঙ্গে কিছু সংযোজন-বিয়োজন করে একটা পাণ্ডুলিপি দাঁড় করাল। কিছুদিনের মধ্যে প্রচ্ছদ হাতে চলে এলো। প্রচ্ছদের ছবিখানা ফেসবুকে দিয়ে দিল। তার ভক্তরা আশ্বাস দিল, এবারের বইমেলায় প্রথমেই তার বইটিই কিনবে। বইমেলা আসার পর অবশ্য এসব মানুষের দেখা মেলেনি। নিখিল খুব পরিশ্রমী মানুষ। মেলা ঘুরে পরিচিত কাউকে পেলে জোর করে হলেও তার বইটি কিনিয়ে ছাড়বে। শুধু কিনিয়ে ক্ষান্ত না সে। দাঁত কেলিয়ে একখানা সেলফি তুলে তা ফেসবুকে দিতেও ভুল করে না। আগের কালে পাঠকেরা লেখকের কাছ থেকে অটোগ্রাফ নিতে পাগল হয়ে যেত। এখনো বড়ো লেখকদের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য পাঠক উদগ্রীব হয়ে থাকে। নিখিল একটু ব্যতিক্রম। সে দিলদরিয়া মানুষ। নিজেই খপ করে পাঠককে ধরে এনে সেলফি তুলে নেয়। মেলা শেষে বেশিরভাগ বই-ই অবিক্রীত থেকে যায়। এ নিয়ে নিখিল বেশ চিন্তায় পড়ে। প্রকাশকের সঙ্গে এক বৈঠকে বসল তাই। প্রকাশক একটা প্রস্তাব দিল। কিছু টাকা দিলে আপনার বই বেস্ট সেলার হয়েছে এই মর্মে আমরা প্রচারণা চালাব। নিখিল ভাবল বেশ ভালো আইডিয়া। তাছাড়া এ রকম অপেশাদার প্রকাশককে দিয়েই নিজের স্বার্থ উদ্ধার করতে পারব। নিখিল ভালো করেই জানে বেশিরভাগ প্রকাশক এ কাজ করবে না। এদের মতো কিছু আগাছা টাইপের লোক আছে, যারা নতুন করে প্রকাশক তকমা লাগিয়েছে তাদের দ্বারাই এ কাজ সম্ভব। নিখিল প্রকাশকের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। পরের দিন ফেসবুকে প্রচার চলতে লাগল, এবারের বইমেলায় বেস্ট সেলার হলো নিখিলের বই। কত পাঠক তাকে অভিনন্দন জানিয়ে পোস্ট দিল। যতজন অভিনন্দন জানাল তত কপি বইও বিক্রি হয়নি। এ আফসোস কোথায় রাখে নিখিল?

এবারের বইমেলায় মাস্টারপ্ল্যান হাতে নিয়ে নেমেছে নিখিল। কয়েকজন লোককে টাকা দিয়ে বিভিন্ন গ্রুপে তার বইয়ের রিভিউ দেওয়ানো শুরু করেছে। বই বাজারে আসার আগেই রিভিউ চলতে লাগল। এদিকে অনলাইনে প্রিঅর্ডারও দিয়ে দিল। পাঠক প্রিঅর্ডার না করলেও বিশাল একটা অংশ নিখিল নিজেই প্রিঅর্ডার দিয়ে দিল। এরই মধ্যে বইমেলার আগেই প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে গেছে। প্রকাশক তো তাজ্জব হয়ে গেল। এত বই অনলাইনে চলে গেল? এ তো দেখি বইমেলার আগেই বই বেস্ট সেলার হয়ে গেছে।