রম্য গল্প
/ অয়েজুল হক
ঢাকা যাওয়ার বিরাট আয়োজন শেষে কবি মারুফ বাসে চেপে বসেন। বাস চলছে না ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করা হচ্ছে বুঝে ওঠা মুশকিল। একটু পরপর বিরাট ঝাঁকুনি। কবি মারুফ এক হাত উঁচু হয়ে আবার চেয়ারে আছড়ে পড়ছেন। তার পাশের ভদ্রলোক একটু হালকা পাতলা হওয়ায় তিনি দিচ্ছেন দেড় হাতের লাফ। সারা বাসে লাফালাফি চলছে। শুধু যাত্রীরাই লাফাচ্ছে এমন নয়। ছিট কভার লাফাচ্ছে। কাচের জানালা কড়কড় শব্দ করে জানান দিচ্ছে, যেকোনো সময় ছিট কভারের মতো সেও লাফ দিয়ে পড়তে পারে। কাচের জানালা লাফিয়ে পড়লে মারাত্মক বিপদ ঘটে যেতে পারে। ড্রাইভারের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। তিনি দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন।
মানুষ ভেদে ধৈর্য ভিন্ন। কবি মারুফের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। চিত্কার করে বলেন, ‘এই যে ড্রাইভার, আমরা হাই জাম্পের প্রতিযোগিতায় যাচ্ছি না যে আমাদের লাফানোর প্র্যাকটিস করাতে হবে।
‘চেতেন ক্যান? রাস্তা ভাঙা।’
‘ভাঙা রাস্তায় গাড়ি আস্তে চালতে হয়। এতগুলো যাত্রী, বোধ জ্ঞান নেই?’
‘না নাই। আফনে আইস্যা গাড়ি চালান।’
কথা শেষ করে ড্রাইভার স্টার্ট বন্ধ করে দেয়।
এত সময় ধরে ক্ষিপ্ত মানুষগুলো বিড়বিড় করে ড্রাইভারের নিকুচি করে মুহূর্তে ভোল পাল্টায়।
‘ড্রাইভার তার মতো করে গাড়ি চালাবে। অল্প রাস্তাই তো ভাঙা।’
আরেকজন বললেন, ‘এই লোকটাকে ঘাড় ধরে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিন।’
উত্তেজিত মানুষের কথায় কবি মারুফ নিজেকে সামলাতে পারেন না। তিনিও উত্তেজেত হন, ‘আমি কে আপনি জানেন? জানেন কোথায় যাচ্ছি?’
‘আমার জানার কোনো দরকার নেই। ইশ, কোথায় যাচ্ছে! যেন ক্রিকেট টিমের প্লেয়ার। বড়ো রিস্ক নিয়ে পাকিস্তান সফরে যাচ্ছে...’
এদেশের মানুষ যখন উত্তেজিত হয়, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে বুঝে না বুঝে সবাই ক্ষিপ্ত হয়। ক্ষিপ্ত হয় যে অসহায় তার ওপর। উচ্চ পর্যায়ের হুমকি-ধামকিতে কবি মারুফ থ হয়ে যান। প্রতিজ্ঞা করে, এখন থেকে চুপ করে বসে থাকবে কেউ ছাদ ফুটো হয়ে বেরিয়ে গেলেও কিছু বলবেন না। ঢাকা পৌঁছাতে সকাল দশটা বাজে। মাথা এলোমেলো তারওপর ক্ষুধার্ত। পেটের ভাষায় বললে, আমি আর সহিতে পারি না এ জ্বালা!
কবি, তোমার ভাবনায় আছে শুধু মেলা।
কবিরা আর যাই হোক, নিষ্ঠুর নন। ঢাকা শহরে হোটেল খুঁজে পেতে কষ্ট হয় না। এপাশে ওপাশে হোটেল। মোড়ে মোড়ে হোটেল। ফুটপাতে হোটেল। প্রথম খাবারটা দামি হোটেলেই খাবেন। তৃতীয় তলায় হোটেল স্বপ্নপুরী। বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা। কবি মারুফ তরতর করে সিড়ি বেয়ে উঠে যান।
রিসিপশন লেখা কক্ষে বড়ো টেলিভিশন নিয়ে বসে আছে আধাবয়সী এক ভদ্রলোক।
‘কী খাবার আছে?’
লোকটা ভ্রুকুঞ্চন করে কবি মারুফকে পর্যবেক্ষণ করেন। তার হাবভাবে মনে হয় যেন বিমানবন্দরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির থার্মাল স্ক্যানার পরীক্ষা করছেন। প্রতিদিন পৃথিবী একটু একটু করে অভিশপ্ত হয়ে উঠছে। দায়ী কে?
হোটেল ম্যানেজার নীরবতা ভেঙে ফিসফাস করে বলেন, ‘কতক্ষণ থাকবেন, কী টাইপ, ফার্স্ট ক্লাস না সেকেন্ড ক্লাস?’
একঝাঁক প্রশ্নে কবি মারুফ কিছুটা চিন্তিত হয়ে ওঠেন। খাবারের সঙ্গে ক্ষণের সম্পর্ক, তার সঙ্গে টাইপ! কী টাইপ সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। কম্পিউটার টাইপ না পুরোনো আমলের ঘড়ঘড়ে টাইপ? টাইপের পর রেজাল্ট আছে। ফার্স্ট ক্লাস, সেকেন্ড ক্লাস! তিনি নিশ্চয়ই ভুল করে কোনো কলেজে ঢুকে পড়েছেন!
‘সরি স্যার। আমার ভুল হয়েছে। আমি হলাম কবি। পড়াশোনা করতে আসিনি। বইমেলায় এসেছি।’
লোকটা নাক সিঁটকায়। কবিদের গায়ে যেন কটু গন্ধ। কবি মারুফ নেমে আসে। নিচে নেমে ফুটপাতের এক দোকান থেকে ভুনাখিচুড়ি খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে ভাবেন এবার আরাম করে মেলায় যাওয়া যাবে। প্রথম বই, প্রথম মেলা, প্রথম ঢাকা। ভাবতেই কেমন মজা লাগে! প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলা দরকার।
‘হ্যালো।’
‘জি ভাই বলেন।’
‘আমি কবি মারুফ।’
‘হু, বলেন।’
‘ঢাকায় নতুন মানুষ। কোথায় আসবো বুঝতে পারছি না।’
‘শাহবাগের দিকে চলে আসেন। মেলায় যাবেন বললেই হবে।’
একটা রিকশা দাঁড় করিয়ে বললেন, ‘মেলায় যাবে?’
‘কী মেলায় যাবেন হেইডা কন, মেলার কী আর শেষ আছে।’
‘মানে!’
‘মানে আর কী...বাণিজ্য মেলা, বিজ্ঞান মেলা, বস্ত্র মেলা, সামনে দেখবেন যাগো সুন্দরী সুন্দরী বউ আছে হেরা বউ মেলা শুরু করে দিছে।’
‘প্রতিযোগিতার যুগ। সবাই চায় তার আপন প্রতিভা বিকশিত হোক। মানুষের কাছে পৌঁছে যাক।’
‘আফনে কী কবি ভাইজান?’
‘হু।’
‘কবি দেখলেই আমার কাতুকুতু দিতে ইচ্ছা করে। হেরা হাসে না। হুতুমপেঁচার মতো মুখ গম্ভীর কইরা বসে থাকে।’
‘কই আমি তো গম্ভীর হয়ে বসে নেই। কথা বলছি।’
‘কথা কইলে কী হবে, আপনার চেহারায় হুতুমপেঁচা ভাব আছে।’
মারুফ উত্তেজিত হয়ে বললেন, ‘ছোট মুখে বড়ো কথা, যা ভাগ!’
‘ভাইগা যামু, কিন্তু তার আগে কী আফনেরে একটু কাতুকুতু দিতে পারি স্যার? খুব রাগ করছেন! একটু হাসবেন?’
রিকশা ড্রাইভার অনুমতির অপেক্ষা না করেই কবি মারুফকে কাতুকুতু দেওয়া শুরু করেন।
পেটের ভেতরে ভুনাখিচুড়ির দাপাদাপি। কাতুকুতু। হড়বড় করে বমি করে দেন কবি মারুফ। কাতুকুতু দেওয়া রিকশা ড্রাইভার বৃষ্টি ভেজার মতো বমি ভেজা হয়ে ক্যাবলার মতো তাকিয়ে থেকে বারবার শুধু বলছে, ‘এ কী করলেন স্যার!?’
কবির কোনোদিকে খেয়াল নেই। অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে যায়, ‘মেলায় এত জ্বালা...’ g
