অণুভাবনা

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও শিশুসাহিত্য চর্চা

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২০:৫৬

 

বাঙালির শৌর্য-বীর্য তথা শ্রেষ্ঠত্বের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ আমাদের মহান মুুক্তিযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আমরা পেয়েছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ধীরে ধীরে সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখা গতি পেতে শুরু করে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হলে দেশের অগ্রগতি থেমে যায়। এই ধারা অব্যাহত থাকে প্রায় দীর্ঘ একুশ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের শিশুদের পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিকৃতি ঘটতে থাকে। বিজাতীয় ভাবধারায় পুষ্ট হতে থাকে আমাদের সংস্কৃতি ও শিশু-কিশোরদের চিন্তাচেতনার ধারা।

আমরা প্রায়শ বলে থাকি, শিশুরা জাতির ভবিষ্যত্। কিন্তু কোন শিশুরা কেমন ধরনের ভবিষ্যত্ তা আমরা গভীর বিবেচনায় রাখি না। দেশের ভবিষ্যত্ রচনায় শিশুদের উপযুক্ত নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলার ব্যাপারে শুধু রাষ্ট্র বা শিশুসাহিত্যিক নয়, তাদের বাবা-মা এবং অভিভাবকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। উপযুক্ত পরিচর্যা না পেলে একটি বৃক্ষ যেমন স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে না, তেমনি যথাযথ প্রশিক্ষণ না পেলে শিশুও সুনাগরিক হিসাবে গড়ে উঠতে পারে না। এজন্যে সবচেয়ে বড়ো প্রয়োজন দেশপ্রেম। যে শিশু মাতৃভাষাকে ভালোবাসে না, দেশকে ভালোবাসার শিক্ষা পায় না, দেশের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে যার কোনো জ্ঞান নেই, তার দ্বারা দেশের কোনো মঙ্গল সাধিত হয় না।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে শিশুদের সঠিক ধারণা দিতে হবে। ধারণা দিতে হবে দেশের শত্রু-মিত্র সম্পর্কে। তারা যে একটা বীর জাতির বংশধর এ ধারণা, এ বিশ্বাস তাদের মধ্যে গেঁথে দিতে হবে। শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নয়—পৃথিবীর সকল মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস তাদের জানাতে হবে। তাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। শিশুসাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে এ সমস্ত বিষয় বিবেচনায় রাখা অতীব জরুরি। ভোগ নয়, ত্যাগের মহিমার আদর্শ আমরা মুুক্তযুদ্ধ থেকে পেয়েছি। আমাদের সকল শুভ বুদ্ধির উত্স ও ভিত্তি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিয়ে হাসিমুখে আমাদের ছেলেরা প্রাণ দিয়েছিল। ‘জয়বাংলা’ আমাদের জাতিসত্তা বিকাশের স্লোগান। বিশ্বের ১৬৩ দেশের জাতীয় স্লোগান রয়েছে। জাতীয় স্লোগান নিয়ে সেসব দেশে কোনো বিতর্ক হয় না। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি কেন ‘জয়বাংলা’ স্লোগানকে ভয় পায়, তার ব্যাখ্যা শিশুদের কাছে তুলে ধরতে হবে।

বাংলাদেশের আনাচে কানাচে এখনো হাজার হাজার ‘গণকবর’ উপেক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। আমাদের শিশুরা এসব শহিদের করুণ কাহিনি জানে না, তাদের বীরত্বের কথা জানে না। শিশুদের মধ্যে দেশপ্রেমের ঘাটতির জন্য তাদের দায়ী করলে চলবে না। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি নীরবে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। বিকৃত ভাবধারার বই রচনা করে তারা আমাদের ছেলেমেয়েদের বিভ্রান্ত করছে। গণমুখি ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের অনুকূলে বই লিখে আমাদের শিশুসাহিত্যিকদের তার মোকাবিলা করতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধ অন্যান্য বিষয়ের মতো আমাদের শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গ্রন্থের প্রতি শিশুদের ব্যাপক আগ্রহ এই ধারণারই জন্ম দেয়। আশা মানুষের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করে। দীর্ঘ সংগ্রামের ভিতর দিয়ে যে জাতি অনেক ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সে জাতির পক্ষে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব কিছু নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানব কল্যাণের উদ্দেশ্যে আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কখনো ব্যর্থ হয় না। আদর্শ মৃত্যুহীন। ইতিহাস কখনো মিথ্যা বলে না।