সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) সুপারিশ করিবার পরও চূড়ান্ত নিয়োগ পাননি ৩৯তম বিসিএস উত্তীর্ণ ৫৭ জন চিকিত্সক। ফলে, সন্তানদের দেশসেরা অর্জনে যেই পরিবারগুলি একদিন আনন্দে মাতিয়া উঠিয়াছিল, এখন সেই পরিবারগুলিই নিমজ্জিত হইয়াছে হতাশার অন্ধকারে, ভুগিতেছে প্রতিবেশী ও স্বজন-বন্ধুদের সন্দেহ-ভ্রুকুটির ছোবলে। উল্লেখ্য, ৩৯তম বিশেষ বিসিএসে চূড়ান্ত উত্তীর্ণদের মধ্যে সাড়ে তিন শত জনের নিয়োগ নিয়া জটিলতা তৈরি হইয়াছিল। তন্মধ্যে বেশির ভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটাসংশ্লিষ্ট। তাহাদের সমস্যা সাময়িক সমাধানের পথে রহিয়াছে বলিয়া জানা যায়। কিন্তু আটকাইয়া গিয়াছে কোটার বাহিরে থাকা উত্তীর্ণ এই ৫৭ জন ডাক্তার। কোটার বাহিরের এসকল উত্তীর্ণরা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রতিদিন ধরনা দিতেছেন। বিসিএস উত্তীর্ণ হইয়াও নিয়োগবঞ্চিত হইয়া তাহারা বিক্ষুব্ধ।
২০১৮ সালের এপ্রিলে ৩৯তম বিশেষ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়; আগস্টে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় ৩৭ হাজারের অধিক পরীক্ষার্থী অংশ নেন। তন্মধ্যে ১৩ হাজার ৭৫০ জন উত্তীর্ণ হন। ইহার পর মৌখিক পরীক্ষা শেষে ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে সরকারি কর্মকমিশনের পক্ষ হইতে ৪ হাজার ৭৯২ জনকে চাকরিতে নিয়োগদানের জন্য জনপ্রশাসন চূড়ান্ত সুপারিশ করে। তাহারই ভিত্তিতে গত ১৯ নভেম্বর ৪ হাজার ৪৪৩ জনকে প্রথম নিয়োগ দেয় সরকার। দ্বিতীয় দফায় গত ৮ ডিসেম্বর আরো ১৬৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাকি থাকে ১৮১ জন। ইহার মধ্যে ১২৪ জন মুক্তিযোদ্ধা কোটার। এই কোটাভুক্তদের প্রাথমিকভাবে চাকরিতে নেওয়ার জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত হইয়াছে। কিন্তু বাকি ৫৭ জন এখন চোখে অন্ধকার দেখিতেছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগ বলিতেছে, উল্লিখিত ৫৭ জনের বিষয়ে সরকারের একটি সংস্থা হইতে নেতিবাচক প্রতিবেদন আসিয়াছে। তাই আপাতত তাহাদের নিয়োগ দেওয়া হইতেছে না। আবারও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে নূতনভাবে তথ্য যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হইবে। এক ডাক্তার দম্পতির যাহারা দুই জনেই ৩৯ বিসিএস উত্তীর্ণ হইয়াছিলেন, বিবাহিত হওয়ায় যোগাযোগের জন্য শ্বশুরবাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করিয়াছিলেন স্ত্রী। তাহার শ্বশুর বিরোধী দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আর এই কারণে তাহার নিয়োগ দেওয়া হয় নাই বলিয়া তিনি ধারণা করিতেছেন। আর তাহার স্বামী বলিতেছেন, আমার বাবা তো নিষিদ্ধ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ইহার জন্য আমাকে কেন ভুগিতে হইবে!
যথাযথ যাচাই-বাছাই করিয়া সরকারি উচ্চপদগুলিতে নিয়োগদানের রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে সকলেই একমত হইবেন। এইরূপ পদপ্রার্থীদের অসামাজিক বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের রেকর্ড আছে কি না, তাহাও সঠিকভাবে যাচাই করিয়া দেখা প্রয়োজন। কিন্তু সেই সঙ্গে আমরা ইহাও বলিতে চাই, বিশেষ কিছু রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কোনো না কোনোরকম সংশ্লিষ্টতার অভিযোগই যদি এই সকল বিসিএস উর্ত্তীণদের নিয়োগদানে অনীহার কারণ হয়, তাহা হইলে আদালতের রায় উত্তীর্ণ ডাক্তারদের পক্ষেই যাইবে। কারণ রাষ্ট্র সর্বজনীন একটি প্রতিষ্ঠান। একটি স্থিতিশীল ও সহমর্মিতাপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে চাহিলে আমাদের কিছু বিষয়ে সর্বজনীন ঐকমত্যে পৌঁছাইতে হইবে। দল-মতের ঊর্ধ্বে সকল নাগরিকের অধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করিতে হইবে। আর এইরূপ তত্পরতার মাধ্যমে সরকার নন্দিত হইবেন, নিন্দিত নহে।
