অস্ট্রেলিয়ার দাবানল অস্ট্রেলিয়াকেই শিক্ষা দিতে ব্যর্থ!

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২২:০৫

মো. ইমরান হোসেন

দাবানল অস্ট্রেলিয়ার জন্য কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। গ্রীষ্মকালে দাবদাহের কারণে প্রতি বছরই সেখানে দাবানল হয়। তবে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার চলমান দাবানল। গত মাসের সেপ্টেম্বর থেকে এখন অবধি এই দাবানল অব্যাহত আছে। বিগত তিন মাসের উষ্ণতা অস্ট্রেলিয়ার ১২০ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অস্ট্রেলিয়ার সরকার জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত দেশটির ২ কোটি ৫০ লাখ একর জমি পুড়ে গেছে! এই পুড়ে যাওয়া জমির পরিমাণ এতটা বিস্তীর্ণ যে, তা পৃথিবীর বহু দেশের মোট আয়তনের চেয়ে বেশি। পুড়ে যাওয়া জমির বেশির ভাগই ছিল বনাঞ্চল, গরু ও ভেড়ার চারণভূমি। আগুনে পুড়ে মারা গেছে দেশটির লক্ষাধিক গবাদি পশু। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি পশুপাখি। চলমান দাবানলে অস্ট্রেলিয়ার ৩০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চল ও আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে লাখো মানুষ। হাজার হাজার মানুষের বসতবাড়ি পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে আগুনের লেলিহান শিখা। পরম যত্নে চাষ করা কৃষকের ফসল খেতেই পুড়ে ভস্ম হয়ে গেছে।

ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনতে অস্ট্রেলিয়ার সরকার প্রাণপণে চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের সহযোগিতা করতে পাশে দাঁড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নিউজিল্যান্ডসহ আরো অনেক দেশ। সর্বশেষ খবর হলো—অস্ট্রেলিয়া এখনো জ্বলছে।

অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে এই যে ভয়াবহতম দাবানল চলছে, এর জন্য তীব্র দাবদাহ, খরা ও ঝড়ো বাতাসকে দায়ী করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তনই আগুনের তীব্রতা বাড়ার সবচেয়ে বড়ো কারণ। আর জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কার্বন নিঃসারণের সম্পর্ক সমানুপাতিক। উন্নত দেশগুলো প্রতি বছর ভয়াবহ পরিমাণ কার্বন নিঃসারণ করছে। ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ছে। একই হারে বাড়ছে নানান রকমের প্রাকৃতিক দুর্যোগ; কিন্তু দেশগুলোর সরকার কার্বন নিঃসারণ হ্রাসে আন্তরিক নয়।

কার্বন ট্যাক্সের কারণে মাত্র দুই বছরে খোদ অস্ট্রেলিয়ারই গ্রিনহাউজ গ্যাস ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমে গিয়েছিল। অথচ অস্ট্রেলিয়ার সরকার কার্বন ট্যাক্সনীতির সংস্কার করে ফেলেছে। ফলে সেখানে বেড়ে যাচ্ছে গ্রিনহাউজ গ্যাস। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্বন নিঃসারণ হ্রাসের বিকল্প নেই। বরং কার্বন নিঃসারণ একদম বন্ধ করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়। অথচ এই অস্ট্রেলিয়ারই প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনের প্রতিনিধিদল ২০১৪ সালে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে কার্বন নিঃসারণ হ্রাসের বিরোধিতা করেছিল!

গত ডিসেম্বরেই দাবানলে নিহত দুই দমকল কর্মীর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন। তিনি স্বীকার করেছেন যে, চলমান দাবানলের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। এরপরও তিনি দেশটির জলবায়ুনীতি পরিবর্তনে জোর অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

বিশ্ব জুড়ে কার্বন নিঃসারণকারী দেশের তালিকায় সবচেয়ে ওপরে আছে চীন, আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারত। উইকিপিডিয়ার তথ্যানুসারে তালিকায় অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান ১৪তম; কিন্তু ভয়াবহতম দাবানলে পতিত হয়েও যদি অস্ট্রেলিয়া তাদের কার্বন নিঃসারণ কমাতে আগ্রহী না হয়, তবে চীন বা যুক্তরাষ্ট্রই বা কী করে কার্বন নিঃসারণ হ্রাসে রাজি হবে? চরম বিপদ থেকেও যখন বিপদাপন্নরা শিক্ষা না নেয়, তবে সে বিপদ ঘনীভূত হতে বাধ্য। এর মানে হলো আমরা একটা দুর্যোগপূর্ণ পৃথিবীর দিকে অগ্রসর হচ্ছি। বিশ্বনেতাদের বোধোদয়ের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের বিশেষ কিছু করবার নেই।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।