রোকসানা সুইটি
একজন নারী এবং পু্রুষ যখন বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয় তখন স্বামীর দ্বায়িত্ব থাকে স্ত্রীর ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা। তার মানে স্ত্রীর সব চাহিদা স্বামী পূরণ করতে বাধ্য তার সামর্থ্য অনুযায়ী।
আমাদের সমাজে একটা নিয়ম হয়ে গেছে এবং আমাদের ধর্মীয় দিক অনুসরণ করলেও দেখতে পাই—নারীকে সর্বোত্তম মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। দেনমোহর হলো নারীর হক; কিন্তু বাস্তবে কি তা পাচ্ছেন সব নারী!
স্বামী তার উপার্জনের সব টাকা নিজের আয়ত্তে রেখে যদি বলে থাকে—তোমার কি কিছু লাগবে! তখন স্ত্রীরা কি সব সময় মন খুলে স্বামীর কাছে তা চায়? একজন নারী হিসেবে বলব চায় না। স্বামীকে খুশি করতে কিংবা লজ্জায় হলেও বলে থাকে—কিছুই লাগবে না! অথচ সেই মেয়েই কিন্তু বিয়ের আগে তার পছন্দের পোশাক বা পছন্দের অন্য কিছু না পেলে ঘরে তুলকালাম করে বসত, মান-অভিমানে ভরিয়ে তুলতো বাবার বাড়ি। কিন্তু বিয়ে নামক অদৃশ্য বেড়াজাল নারীকে চুপ করিয়ে দেয়।
এর কারণ কিন্তু একটাই; তা হলো তার স্বামীর আচরণ এবং তার আর্থিক অসচ্ছলতা। স্বামীর টাকায় স্ত্রীর অধিকার আছে ঠিকই কিন্তু কয়জন স্বামী তার স্ত্রীকে সেই টাকা খরচের স্বাধীনতা দিয়ে থাকে? হিসাব করলে দেখতে পাব তার সংখ্যা খুবই কম! সামর্থ্য থাকার পরেও যদি স্বামীরা স্ত্রীকে কিছু টাকা তার নিজেরমতো করে খরচ করার জন্য না দিয়ে থাকে, সেই সব স্বামীকে কী বলা উচিত? আমি এমন কয়জন নারীকে খুব কাছ থেকে দেখেছি তাদের স্বামীরা বেশ সামর্থ্যবান কিন্তু তারা তাদের স্ত্রীকে খরচের স্বাধীনতা দেন না। সেই সব নারী অক্লান্ত পরিশ্রম করে যায় যেই সংসারে, সেই সংসার বা স্বামী কি সত্যিই তার আপন?
এক চাকরিজীবী নারীকে যদি বেতনের সব টাকা তার স্বামীর হাতে তুলে দিতে হয়, তাহলে কেন তার এত কষ্ট করা? আবার কখনো দেখা যায় যে, যদিও স্ত্রীকে টাকা দিয়ে থাকেন তার পাইপাই করে হিসাব নিয়ে থাকেন। এটা কেমন মানসিকতার পরিচয় বহন করে?
সেই সব স্বামী কি কখনো তাদের স্ত্রীদের কিছু টাকা দিয়ে দেখেছেন যে তারা তা কী কাজে ব্যয় করে!
অথচ বিপদে সেই অল্প অল্প টাকা বিশাল সাপোর্ট হয়ে দাঁড়াবে আপনার পাশে। দিয়ে দেখুন একবার তাকে বিশ্বাস করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গৃহিণী বললেন, ২৩ বছরের সংসার জীবনে তিনি তার স্বামীর কাছ থেকে কোনো প্রকার খরচের স্বাধীনতা পাননি। গত চার মাস আগে অনেক ঝগড়াবিবাদের পর স্বামীকে তার মাসিক ১ হাজার টাকা করে খরচ দিতে রাজি করিয়েছেন। অথচ অবাক করা বিষয় সেই নারীর স্বামীর মাসিক আয়! তা কি না ১ লাখ টাকার ওপরে! সেই ১ হাজার টাকারও হিসাব স্বামীকে দিতে হয়, যা কি না স্ত্রীকে হাতখরচের জন্য তিনিই ধার্য করেছেন!
আরেক নারী গৃহিণীর বিয়ে হয়েছে ২৬ বছর। তিনি জানালেন, তার স্বামী তাকে হাতখরচ তো দূরের কথা তার ফ্রিজে কত প্যাকেট মাছ-মাংস থাকে তার হিসাবও সেই স্বামী রাখেন। সে স্বামীর মাসিক আয়ও ১ লাখ টাকার বেশি। তিনি সরকারের উচ্চ পদে চাকরি করেন।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক নারী জানালেন—তার বিয়ে হয়েছে প্রায় ১৫ বছর। তার স্বামী নিজ হাতেই সব খরচ করে থাকেন। বাচ্চাদের স্কুলে রিকশায় করে দিয়ে আসার ভাড়া দিলেও তাকে আসতে হবে হেঁটে, আবার ছুটির পর হেঁটে যাবে বাচ্চাকে আনতে, আসার সময় রিকশায় আসবে। সেই ভাড়াটা হিসাব করেই তিনি প্রতিদিন সকালে দিয়ে থাকেন। সেই নারী কিন্তু উচ্চশিক্ষিত। তার স্বামীর মাসিক আয় যা কি না ৮০ হাজারের ওপরে।
জানি না আমাদের সমাজে নারীরা কতভাবে জিম্মি হয়ে থাকবে! আর কত কিছুর জন্য স্বাধীনভাবে চলাতে লড়াই করে যেতে হবে। নারীর অধিকার আদায়ের দাবির মধ্যে, ‘খরচের স্বাধীনতা চাই’ তবে এটাও কি একসময় স্লোগানে পরিণত হবে? নারীর স্বাধীনতা আদায়ের মতো করে!
বর্তমান প্রেক্ষাপট দেখলে আমরা দেখতে পাই—অনেক উচ্চশিক্ষিত নারী যোগ্যতা থাকার পরও সন্তানের ভবিষ্যত্ চিন্তা করে নিজেকে কোনো পেশার সঙ্গে না জড়িয়ে সংসার-সন্তান নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তার এই ত্যাগটুকুকে সম্মান দেখান তার জীবন সঙ্গীটি।
আমার মতে, নারীকে স্বাবলম্ব্বী হতে হবে। তার যতটুকু শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে সেই অনুযায়ী তাকে কোনো একটা পেশা বেছে নেওয়া উচিত। যা দিয়ে সে নিজের মনের মতো স্বাধীনভাবে খরচ করতে পারবে।
n লেখক :সাবেক শিক্ষার্থী, নোয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজ
