মুজিববর্ষে একুশের নবজাগরণ

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২২:৪৬

এবার মুজিব-বর্ষের মহাক্ষণে আমাদের অমর ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারিতে একুশের বইমেলা শুরু হচ্ছে। শহিদদের এই একুশে আমরা শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করব। সর্বপ্রথম আমি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করছি। ভাষা শহিদ, মুক্তিযুদ্ধের সব শহিদ, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহিদদের অবনত মস্তকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। ফেব্রুয়ারি বাঙালির জীবনে এক অসাধারণ মহিমায় দীপ্তিময়। এই ফেব্রুয়ারিতে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় আগে বাঙালি জাতি জেগে উঠেছিল, সে তার আত্মপরিচয় আবিষ্কার করেছিল। বুঝেছিল আমরা বাঙালি, বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। মায়ের ভাষা। আবহমান বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য উন্মোচিত হয়েছিল এই ফেব্রুয়ারিতে। এক পরম গৌরবের মাস। আত্মত্যাগে, সাহসে, আত্মবলিদানে এই মাসকে মহিমান্বিত করে তুলেছিল বাঙালি, বাঙালির তরুণেরা, ছাত্ররা। তারা মাতৃভাষার জন্য গুলির সামনে দাঁড়িয়ে অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত দ্বিতীয়টি নেই।

এই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি আত্মপরিচয় যেমন আবিষ্কার করেছিল, তেমনি নতুন করে জেগে উঠেছিল। সাহিত্যে, শিল্পকর্মে, অভিনয়ে, সংগীতে, বিজ্ঞানে, আধুনিকতায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি একটা নবযুগের সূচনা ঘটিয়েছিল। ভাষা আন্দোলনে শহিদদের জন্য যে শোকের গান রচিত হয়েছিল, তা এখনো বুকের মধ্যে বাঙালি গেঁথে রেখেছে।

বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির নবজাগরণ। এই ভাষা আন্দোলনের পরেই হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় যে একুশের সংকলন বেরিয়েছিল, তা থেকেই এই অঞ্চলে বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্যের, আধুনিক জীবনের শুরু। আধুনিকতা ও বিজ্ঞান চেতনায় বাঙালি নিজেকে নতুন করে সমৃদ্ধ করে তোলে। আমার এই মুহূর্তে ভাষা আন্দোলনে বীর শহিদদের অমর আত্মত্যাগের কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে রফিক জব্বার সালাম বরকত আমাদের যে রক্তঋণে বেঁধে দিয়ে গেছেন, আমরা আমাদের সভ্যতা বিকাশের মধ্য দিয়ে যুগ যুগ ধরে সেই রক্তঋণ শোধ করার চেষ্টা করে যাব। যে জাতির জীবনে মহান ভাষা আন্দোলন আছে, সাতই মার্চ আছে, বঙ্গবন্ধুর সেই অমর ভাষণ আছে, মুক্তিযুদ্ধ আছে, পহেলা বৈশাখের উত্সব আছে, সেই জাতি কখনো পিছিয়ে পড়তে পারে না, সর্বক্ষেত্রে তার জয় হবেই। কে রুধিবে এই যৌবনজলতরঙ্গ, এই সাহস এই উদ্দীপনা? বাঙালি কখনো হারবে না।

‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী,/ ভয় নাই, ওরে ভয় নাই—নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান / ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই’। একুশের মধ্য দিয়ে বাঙালি নতুন করে জীবন দেওয়া শিখেছে। ভাষার জন্য, দেশের জন্য অকাতরে নিজেকে আত্মোত্সর্গ করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এ দৃষ্টান্ত বিরল। আমি যখন এই সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের কথা ভাবি, তখন আমার বুক গর্বে ভরে ওঠে। বাঙালি এক অনন্য সম্ভাবনাময় জাতি। সাহিত্যে, শিল্পে, ক্রীড়া নৈপুণ্যে এ জাতি পৃথিবীতে একদিন শীর্ষস্থান অধিকার করবে। আমি এই স্বপ্ন দেখতে সুখবোধ করি।

এই ভাষার মাসে মাসব্যাপী একুশে বইমেলা হচ্ছে। এ হচ্ছে অক্ষরের উত্সব মাতৃভাষার উত্সব; পাশাপাশি এই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেই সামান্য দূরে হচ্ছে জাতীয় কবিতা উত্সব। প্রতিবাদ ও সংগ্রামের উত্সব। ৩৪ বছর ধরে এই উত্সব চলছে। দেশ-বিদেশের কবিদের নিয়ে পৃথিবীতে কবিতার এত বড়ো উত্সব বোধহয় আর কোথাও হয় না। এত শ্রোতা, এত দর্শক, কবি-শিল্পী-আবৃত্তিকার অসংখ্য মানুষ। ধীরে ধীরে এ কবিতা উত্সব সমুদ্র থেকে মহাসমুদ্র হয়ে উঠছে, মহা ইতিহাস হয়ে উঠছে। আমার পরম সৌভাগ্য, আমাকে এ বছর জাতীয় কবিতা উত্সবের উদ্বোধনের বিরল সম্মান দেওয়া হয়েছে। আমার শারীরিক অপারগতার জন্য আমি উত্সবে উপস্থিত থাকতে পারিনি। কিন্তু আমার মন-প্রাণ পড়ে রয়েছে বন্ধু-কবি-পাঠক-শ্রোতাদের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে, উত্সব চত্বরে। ৩৩ বছর আগে এই উত্সবের উদ্বোধন করেছিলেন কবি বেগম সুফিয়া কামাল। বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশ কয়েক বছর এ উত্সবে উপস্থিত থেকে কবিদের উত্সাহিত করেছেন।

এই মেলায় ও কলকাতা বইমেলা মিলে আমার ১০টির মতো নতুন বই বের হবে। এর মধ্যে বিভাস প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে ‘মুজিব সমগ্র’। এতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা সব কবিতা, গান, গদ্য মিলে একটি বড়ো বই প্রকাশিত হয়েছে। এটা মুজিববর্ষে আমার প্রথম বই।

এই বইমেলা কবিতা উত্সব আমাদের একুশকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আমি আগেও বলেছি, এ হচ্ছে অক্ষরের উত্সব। অসংখ্য বই বের হবে এ মেলায়। নতুন বই, নতুন প্রচ্ছদের বর্ণচ্ছটায় বাংলা একাডেমির আকাশ রঙিন হয়ে উঠবে। মনে হবে যেন অগণিত ফুল ফুটে উঠেছে। আমরা এই ভাষার মাসে নতুন চেতনায় জেগে উঠব। এ মাস আমাদের নতুন পথের সন্ধান দেবে। জয় হবে বাঙালির। জয় হবে বাংলা ভাষার, বাংলা কবিতার।