মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী নিজেদের ভূমিকা বলতে হবে

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ০০:৪৭

এক যুগ আগে ওয়ান ইলেভেন পরবর্তী সময়কালে নিজদের ভূমিকা কী ছিল তা লিখিত আকারে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের কাছ থেকে জমা নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরমে প্রার্থীর বিবরণীর একটি ঘরে ‘২০০৭ সালের ১ জানুয়ারি পরবর্তী সময়ের ভূমিকা’ লিখতে বলা হয়েছে মনোনয়ন-প্রত্যাশীদের। নেতাকর্মীরা মনে করছেন, জরুরি অবস্থার মধ্যে দলের দুঃসময়েও যারা সক্রিয় ছিলেন, তাদের মূল্যায়নের জন্যই ফরমে ওই ঘর এবার রাখা হয়েছে। তারা জানান, সর্বশেষ ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরমে এ ধরনের কোনো ঘর ছিল না। এবারের ফরমে বিষয়টি নতুন যোগ করা হয়েছে। এদিকে তিনশটি আসনে নৌকার প্রার্থী হতে চাইছেন ৪ হাজার ২৩ জন। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের আগামীকাল বুধবার সাক্ষাত্কার নিবেন দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে বেলা ১১টায় এ সাক্ষাত্কার গ্রহণ শুরু হবে এবং আজকের মধ্যেই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মনোনয়ন বোর্ডের সভায় সাক্ষাত্কার শেষ করা হবে। অপরদিকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন উত্তোলন কার্যক্রম শেষ হয়েছে। তবে আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত জমা দেওয়া যাবে।  

ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা অফিসে গত চারদিন ধরে হাজার হাজার মনোনয়ন প্রত্যাশী ও লাখ লাখ নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখর ছিল। উদ্দেশ্য মনোনয়ন ফরম কেনা ও জমা দেওয়া। দুটোই সম্পন্ন হয়েছে গতকাল। গতকাল মনোনয়নপত্র সংগ্রহের শেষ দিন। অন্যান্য দিনের তুলনায় সংগ্রহ বুথ মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ভিড় কম দেখা গেছে। তবে ভিড় বেশি জমা বুথে। তৃতীয় দিনে মনোনয়ন ফরম তুলেছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান। অপরদিকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সদস্য র আ ম ওবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী।  

মোট চারদিনে ৪ হাজার ২৩ ফরম বিক্রি হয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রতিটি মনোনয়নপত্রের দাম ৩০ হাজার টাকা। এ হিসেবে ১২ কোটি ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকার মনোনয়নপত্র বিক্রি করেছে দলটি। মনোনয়ন গ্রহণকারী জাতীয় ওয়ান ডে ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার প্রতি সম্মান দেখিয়ে তার কাছ থেকে মনোনয়নের টাকা নেয়নি দলটি। মনোনয়ন ফরম বিতরণ কার্যক্রম শেষে গতকাল রাতে সাংবাদিক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রার্থী তালিকা চুড়ান্ত করা হবে। ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়েই এ বৈঠক হবে। একদিনেই এই প্রক্রিয়া শেষ হবে এমনটি বলা যাচ্ছে না। এতে সময় লাগবে। এছাড়া আওয়ামী লীগ একা নয়, জোট, মহাজোট রয়েছে। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুর্ভোগের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন হানিফ।   

সোমবার মনোনয়ন ফরম বিতরণ কার্যক্ষম শেষ হওয়ার পর থেকে বুথ সংশি­ষ্টরা জানিয়েছেন, যেসব আসনে একক প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন তুলেছেন সেগুলো হলো গোপালগঞ্জ-৩ আসনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা, গোপালগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, বরিশাল-১ আসনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য শেখ হাসনাত আবদুল­াহ, খুলনা বিভাগ থেকে বাগেরহাটে শেখ হেলাল উদ্দিন, খুলনা-২ আসন থেকে শেখ সালাহ উদ্দীন জুয়েল, সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার-১ আসন থেকে শাহাবুদ্দিন, চট্টগ্রাম বিভাগের নোয়াখালী-৫ আসন থেকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এদের মধ্যে শেখ সেলিম ও হাসানাত আবদুল­াহ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ফুপাত ভাই। অন্যদিকে শেখ হাসিনার চাচাত ভাই হলেন শেখ হেলাল ও শেখ জুয়েল। রংপুর বিভাগ, রাজশাহী বিভাগ, ময়মনসিংহ বিভাগে কোন আসনে একক প্রার্থীর নামের তালিকা পাওয়া যায়নি।

মা লাঙ্গলে, ছেলে নৌকায়

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১ আসন থেকে রবিবার জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনয়ন ফরম নেন অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি। তিনি দলের লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়বেন। আর ঢাকা-১১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে আবেদন জমা দিয়েছেন তার ছেলে শামীম ইসলাম, যিনি যমুনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। গতকাল সোমবার ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন এবং জমা দেন তিনি।  

মনোনয়নকে জয় ভাবছেন আওয়ামী লীগের অনেক প্রার্থী

দলের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা ১০ জন সাবেক ছাত্রনেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এবার বিপুল পরিমাণে মন্ত্রী-এমপি বাদ পড়বেন- এমন আলোচনা আছে। এখনই নিজেকে উপস্থাপন করার সেরা সময়। মনোনয়ন পেলে জয়ের সম্ভাবনাও বেশি। আর না পেলেও ভবিষ্যতে মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে বলেও তাদের ধারনা।

দুশ্চিন্তা অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে

গত পাঁচ বছরে যত স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হয়েছে, সব কটিতেই প্রার্থীর ছড়াছড়ি দেখা গেছে। এবার জাতীয় নির্বাচনেও প্রার্থীর ছড়াছড়ি। এ কারণে কোন্দলের আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় রয়েছে আওয়ামী লীগ।

এক পরিবারের অনেকে নিয়েছেন ফরম

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনতে শনিবার ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয় অভিমুখে মোটর সাইকেল শোভাযাত্রা নিয়ে যান মনোনয়ন প্রত্যাশী একজন।  আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহকারীদের মধ্যে অনেকেই পরস্পরের আ্তীীয়। সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম অসুস্থ থাকায় কিশোরগঞ্জ সদর আসনে তার জন্য নেওয়ার পাশাপাশি তার তিন ভাই নিজেরাও মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। সিলেট-১ আসন থেকে নির্বাচনের জন্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও তার ভাই এ কে মোমেন মনোনয়নপত্র কিনেছেন।  আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ ফরম কিনেছেন কুষ্টিয়া-৩ আসন থেকে। তার ভাই রশিদুল আলম কিনেছেন কুষ্টিয়া-১ ও কুষ্টিয়া-২ আসনের জন্য। চাঁদপুর-২ আসনে ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং তার ছেলে সাজেদুল হোসেন চৌধুরী দিপু মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। টাঙ্গাইল-২ (ভূঞাপুর-গোপালপুর) আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য খন্দকার আসাদুজ্জামান, তার ছেলে মশিউজ্জামান রোমেল দুজনেই মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনে একই পরিবারের কয়েকজন মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। তারা হলেন জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি শহীদ মমতাজ উদ্দীন, তার ছোট ভাই বর্তমান সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ, আরেক ভাই শহীদ মমতাজ উদ্দীনের স্ত্রী ও সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শেফালী মমতাজ, শেফালী মমতাজের ছেলে ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক শামীম আহম্মেদ সাগর। নাটোর-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস এবং তার মেয়ে যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি কোহেলী কুদ্দুস মুক্তি মনোনয়ন ফরম কিনেছেন।

কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু) আসনে একই পরিবারের তিন ভাইবোন মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। তাদের একজন বর্তমান এমপি সাইমুম সরওয়ার কমল। তার বড় ভাই রামু উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোহেল সরওয়ার কাজলও বসে নেই। অন্যদিকে তাদের ছোট বোন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজনিন সরওয়ার কাবেরীও মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। পাবনা-৪ আসনে ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর পাশাপাশি তার মেয়ে মাহাজাবিন শিরিন পিয়া ও তার স্বামী আবুল কালাম পিন্টুও মনোনয়ন ফরম কিনেছেন।

যেভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত হবে

আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র বিতরণ উত্সব শেষ হয়েছে। এবার মনোনয়ন প্রত্যাশী ৪ হাজার ২৩ জনের মধ্য থেকে ২৯৩ জনকে বাছাইয়ের পালা। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরমের অঙ্গীকারনামায় স্পষ্ট করে উল্লেখ রয়েছে, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে তাত্ক্ষণিক দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। এমন অঙ্গীকারে স্বাক্ষর করেই মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ফরম জমা দিয়েছেন। সাক্ষাত্কার অনুষ্ঠানে এ কথাটিই পুনর্বার মনোনয়ন প্রত্যাশীদের স্মরণ করিয়ে দিতে পারেন মনোনয়ন বোর্ডের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্বনামধন্য জরিপ প্রতিষ্ঠান এবং দলের অভিজ্ঞ একাধিক টিমের মাধ্যমে কয়েক দফা মাঠ জরিপ চালিয়ে তিনশ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের জনপ্রিয়তার বাস্তব চিত্র এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ল্যাপটপে। নেতা-এমপি-মন্ত্রীরা যত বড় বড়ই শোডাউন করুন না কেন, প্রধানমন্ত্রীর হাতেই রয়েছে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নির্বাচনী এলাকায় সর্বশেষ অবস্থান সমর্থিত তথ্য।

গত টানা ১০ বছরে কোনো মন্ত্রী-এমপি বা সম্ভাব্য প্রার্থী এলাকায় কী করেছেন, জনপ্রিয়তা বেড়েছে নাকি কমেছে, অনিয়ম-দুর্নীতি কিংবা দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে কিনা, এসব আমলনামা রয়েছে দলীয় প্রধানের হাতে। তাই সংসদীয় বোর্ডের বৈঠক থেকে সর্বশেষ জরিপসহ সবকিছু বিবেচনা করেই এবার আওয়ামী লীগ একক প্রার্থিতা ঘোষণা করবে।

জানা গেছে, এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৯শ প্রার্থী তাদের মনোনয়নের জন্য আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। বাকিরা আজ মঙ্গলবার জমা দিতে পারবেন। এদিকে আওয়ামী সংসদীয় বোর্ডে দুইজন সদস্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। এরা হলেন- দুই প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক ও ফারুক খান। এ নিয়ে বোর্ডের সদস্য সংখ্যা দাঁড়ালো ১২ জন।