সুধীর সাহা
আমরা ইতিহাসকে আধুনিকপূর্ব ও আধুনিক সময়ে ভাগ করতে পারি। ইতিহাস রচয়িতারা ইতিহাসের প্রাচীন সময়কে (ইতিহাসপূর্ব সময়) পুরাতন পাথরের যুগ বা প্রত্নপ্রস্তর যুগ বলেন। আধুনিকপূর্ব বলতে ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ব সময়কে বোঝায়। এই দীর্ঘ সময়ের তারিখ ধরা হয় প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ১০,০০০ প্রথম পাথরযন্ত্র নির্মাণের সময় থেকে। পুরাপলীয় মানুষগুলো ছিল যাযাবর, তারা অন্যান্য প্রাণীর অনুসরণ করতে এবং ভোজ্য গাছপালা অনুসন্ধান করতে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে ঘুরে বেড়াত। তারা প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন মানুষের সংঘ করে সামান্য শিকার ও খাবার খেয়ে বেঁচে থাকত। ইতিহাস অনুযায়ী ৫০০০,০০০ থেকে ২০০০,০০০ খ্রিষ্টপূর্ব ছিল এমন সময়, যখন প্রাচীন মানুষ পাথরযন্ত্র নির্মাণ করেছিল। পুরুষ ও নারীরা সাধারণ যন্ত্র ও অস্ত্র তৈরি করেছিল, যেমন—খননকারী লাঠি, বর্শা ও কুঠার।
প্রায় ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন বছর আগে পদার্থ শক্তি, সময় ও মহাশূন্য যা বিগ ব্যাংগ হিসেবে পরিচিত তা অস্তিত্ব লাভ করেছিল। তাদের আবির্ভাবের প্রায় ৩ লাখ বছর পরে পদার্থ ও শক্তি ‘পরমাণু’ নামক জটিল আকার গঠনে মিলিত হতে শুরু করে, যা তখন অণুতে সংযুক্ত হয়। প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী নামক গ্রহে বিশেষ অণুগুলো ‘জীব’ নামে বিশেষভাবে বড়ো ও জটিল আকার ধারণ করা শুরু করে। প্রায় ৭০ হাজার বছর আগে হোমো সেপিয়েন্স প্রজাতির জীবগুলো আরো বিশদ আকার গঠন করতে শুরু করে।
প্রায় ৫ হাজার ৫০০ বছর আগে লেখা আবিষ্কার দিয়ে ইতিহাস শুরু হওয়ার কথা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু পূর্ব ইতিহাস নিয়ে লেখা উন্নত করার আগেই মানবজাতির ইতিহাস শুরু হয়। সবচেয়ে সহজলভ্য প্রামাণিক তথ্য ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা পূর্ব আফ্রিকায় প্রায় ৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন বছর আগে প্রথম মানবাকৃতির প্রাণীর অস্তিত্ব চিহ্নিত করেন। মানুষ ও মানুষাকৃতির যে প্রাণী আগে একত্রে ছিল তা হোমিনিড নামক প্রাণীর দলে অন্তর্ভুক্ত। প্রথম মানবপূর্ব হোমিনিড প্রায় সাড়ে ৩ ফুট থেকে ৫ ফুট লম্বা ছিল এবং দুই পায়ে হেঁটেছিল। তাদের ছোট্ট মস্তিষ্ক, চ্যাপটা নাক ও লম্বা দাঁত ছিল।
বিজ্ঞানীরা মানুষের গোত্র হোমোকে তিনটি প্রজাতিতে ভাগ করেন, যা দেহাকৃতিতে কিছুটা ভিন্ন ছিল এবং বিভিন্ন সময়ে এসেছিল। তিনটি প্রজাতির সবচেয়ে প্রথমটি ছিল অতি প্রাচীন হোমো হেবিলিস, যাদের সক্ষমতা ছিল। তারা প্রায় ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন বছর আগে পর্যন্ত জীবনধারণ করেছিল। হোমো হেবিলিসের পর পূর্ব-মানুষের দ্বিতীয় প্রকারটি হোমো ইরেকটাস, যারা খাড়া-সিধা হাঁটত। ১০ হাজার ও ২ লাখ বছর পূর্বসময়ের মধ্যে তাদেরকে অনুসরণ করে অন্য একটি প্রজাতি; যাদের নাম হোমো সেপিয়েন্স এবং যারা চিন্তা করতে পারত। আজ সকল মানুষ যারা বাস করছে তারা হোমো সেপিয়েন্স প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত।
২ মিলিয়ন ১০ হাজার বছর পূর্বসময়ের মধ্যে পৃথিবী ঠান্ডা জলবায়ুর দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল, যা বরফযুগ হিসেবে পরিচিত। বলা হয়, শেষ বরফযুগ ১০,০০০ খ্রিষ্টপূর্বে শেষ হয়েছিল। বরফযুগের সময়গুলোতে প্রকাণ্ড হিমবাহ মেরু থেকে বিস্তৃত হয়ে ভূমিরূপকে ক্ষত করেছিল; ভূমিকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। যেহেতু বরফের আস্তরণ গঠিত হয়েছিল, কাজেই সমুদ্র স্তর ৩০০ ফুটেরও বেশি নিচে নেমে গিয়েছিল। পুরোনো মানুষ বিভিন্নভাবে বরফযুগের পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রত্যুত্তর দিয়েছিল। অনেকে অধিকতর উষ্ণ স্থানগুলোতে স্থানান্তরিত হয়েছিল। অন্যরা নিজেকে উষ্ণ রাখতে উপায় উন্নত করেছিল, যেমন—পোশাক ও আগুন। যারা খাপ খাওয়াতে পারেনি তারা অনাহার বা ঠান্ডায় মারা গিয়েছিল।
পুরাপলীয় বা পুরাতন পাথরযুগ শুরু হয়েছিল প্রায় ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন বছর আগে হোমো হেবিলিস কর্তৃক প্রথম যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে এবং এটি প্রায় ১২,০০০ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। মেসোলিথিক বা পুরাতন পাথরযুগ সচরাচর ১২,০০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে প্রায় ৮,০০০ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত। নবোপলীয় বা নতুন পাথরযুগ স্থায়ী ছিল প্রায় ৮,০০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ৫,০০০ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত।
হোমো ইরেকটাসের আবির্ভাব ঘটেছিল আফ্রিকায় এবং সেখানে প্রায় ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন থেকে ৩০ হাজার বছর আগে পর্যন্ত বসবাস করেছিল। তাদের বসবাসের এলাকাগুলো আফ্রিকার বনভূমি ও তৃণভূমি থেকে এশিয়া ও ইউরোপের বনাঞ্চল ও সমতল ভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। হোমো ইরেকটাস নারীরা সংগ্রহ করত ফলমূল, বাদাম ও বীজ—যখন পুরুষরা মাংস অনুসন্ধান করত। পুরুষরা বর্শা ও লাঠি দিয়ে ছোট্ট প্রাণী শিকার করত। হোমো ইরেকটাস প্রায় ১ দশমিক ৬ থেকে ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন বছর আগে ঐ অঞ্চলে পৌঁছেছিল। হোমো ইরেকটাস ৪ লাখ ৬০ হাজার বছর আগে চীনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইউরোপের সবচেয়ে পুরোনো কঙ্কালগুলো সম্ভবত হোমো ইরেকটাসের এবং প্রায় ৪ লাখ বছর আগের।
হোমো সেপিয়েন্স আধুনিক মানব প্রজাতির প্রামাণিক স্বাক্ষর, যা প্রায় ২ লাখ বছর আগের বিষয় ছিল। যখন হোমো সেপিয়েন্সের আবির্ভাব ঘটল, তখন অত্যাধুনিকায়নের সঙ্গে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটেছিল। প্রথম হোমো সেপিয়েন্স ছিল সম্ভবত নিয়ান্ডারথালস, যাদের নামকরণ করা হয়েছিল জার্মানির নিয়ান্ডার উপত্যকা অনুসারে— যেখানে ১৮৫০ খ্রিষ্টপূর্বে প্রথম তাদের অবশেষ আবিষ্কার করা হয়েছিল। নিয়ান্ডারথালস মানুষেরা আফ্রিকাতে উত্পত্তি লাভ করেছিল এবং প্রায় ১ লাখ বছর আগে ইউরোপ ও এশিয়ায় ছড়াতে শুরু করেছিল। নিয়ান্ডারথালস ছিল প্রায় সাড়ে ৫ ফুট লম্বা এবং তাদের গাট্টাগোট্টা দেহ ছিল। তারা ছিল যাযাবর শিকারি, যারা ছোটো দলে ভ্রমণ করত। হোমো সেপিয়েন্স বা আধুনিক মানুষ প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে আফ্রিকাতে উত্পত্তি লাভ করে। ২০ হাজার বছরের মধ্যে তারা অস্ট্রেলিয়া, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকাতে স্থানান্তরিত হয়েছিল।
৫ হাজারেরও বেশি সময় মানুষ খাবার শিকার ও সংগ্রহ এবং উত্পাদন করার মধ্যে অবস্থান করেছিল। এই উন্নয়নকে বলা হয় নবোপলীয় বিপ্লব, যা মানুষের কাজ ও জীবনধারায় বিশাল পরিবর্তনের দিক খুলে দিয়েছিল। নবোপলীয় বিপ্লব ঘটেছিল ধীরে ধীরে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন সময়ে। মধ্যপ্রাচ্যে কৃষির প্রামাণিক তথ্য পাওয়া গিয়েছিল ৮০০ খ্রিষ্টপূর্বের পূর্ব পর্যন্ত। পক্ষান্তরে, চীন ও আমেরিকাতে ৫,০০০ ও ৪,০০০ খ্রিষ্টপূর্বের আগে কৃষিকাজ ছিল না। নবোপলীয় মানুষ পানি মজুত এবং পরিবহনের জন্য রৌদ্রশুকানো শক্ত কাদামাটির মৃিশল্প প্রস্তুত করত। অনেক ক্ষেত্রেই খামার তখনকার জীবনকে অধিকতর সহজ করে তুলেছিল। এটি খাদ্য সরবরাহ এনেছিল এবং মানুষকে এক স্থানে দীর্ঘসময় থাকতে সাহায্য করেছিল। বিজ্ঞানীরা হিসাব করেছেন যে, ৪০০০ খ্রিষ্টপূর্বের মধ্যে বিশ্ব জনসংখ্যা ৯০ মিলিয়ন ছিল।
ইসরাইলের দখলকৃত পশ্চিম তীরে অতি পুরোনো গ্রামগুলোর একটি ছিল জেরিকো, যা প্রত্নতাত্ত্বিকেরা আবিষ্কার করেছিলেন ৮০০০ খ্রিষ্টপূর্বেরও আগে। বর্তমান টার্কির অন্য একটি গ্রাম ক্যাটাল হিউকের অস্তিত্বের আবিষ্কার হয়েছিল ৭০০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ৬৩০০ খ্রিষ্টপূর্বের মধ্যে। পরিশেষে নবোপলীয় কৃষকেরা লাঙল আবিষ্কার করে এবং ষাঁড়গুলোকে এটি টানতে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের কাজকে আরো সহজ ও উত্পাদনশীল করে তুলেছিল। তারা শিখেছিল কীভাবে ছাই, মাছ ও সার দিয়ে জমি উর্বর করা যায়। নবোপলীয় গ্রামবাসী পশমও আবিষ্কার করল এবং লিনেন ও উলের পোশাক তৈরি করতে শুরু করল। তারা চাকা আবিষ্কার করল এবং এটি পরিবহনে ব্যবহার করতে লাগল। তারা নির্মাণকাজের জন্য কাদামাটির ইট তৈরির উপায় বের করল। ইতিমধ্যে তারা শিখে ফেলল কীভাবে স্বর্ণালংকার ও অস্ত্র তৈরিতে কপার, লিড ও সোনার ধাতুগুলো ব্যবহার করা যায়।
কৃষিপদ্ধতি জীবনকে অনেক পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। মানুষ ঋতু পরিমাপ করতে এবং কখন গাছ ও ফসল লাগানো যায় তা নির্দিষ্ট করতে ক্যালেন্ডার তৈরি করেছিল।
n লেখক :সাবেক সেনা কর্মকর্তা
