ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিন রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় সাংবাদিকদের মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে তাদের আটক রাখাসহ ভয়ভীতি প্রদর্শনকারী গেন্ডারিয়া থানা ছাত্রলীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম খান রিয়াদকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। গতকাল সোমবার ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে রিয়াদকে সাময়িক বহিষ্কারের কথা উল্লেখ করা হয়।
এর আগে গত রবিবার পাঁচ সাংবাদিকের নামে বিএনপি-জামায়াত ও শিবিরের ক্যাডার উল্লেখ করে গেন্ডারিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন রিয়াদ। এরপর গতকাল সাংবাদিক নুরুল আমিন জাহাঙ্গীর ছাত্রলীগ নেতা রিয়াদ ও তার ক্যাডার বাহিনীর নাম উল্লেখ করে একই থানায় জিডি করেন। এদিকে, মোহাম্মদপুরে একটি ভোটকেন্দ্রে কাউন্সিলরের সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে ক্র্যাব সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান সুমনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় কুপিয়ে রক্তাক্ত করা এবং গেন্ডারিয়ায় নুরুল আমিন জাহাঙ্গীর, উজ্জ্বল হোসেন জিসান ও মাহবুব মমতাজীর ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)। একইসঙ্গে তাদের গ্রেফতারের দাবি জানানো হয়েছে। এ দাবিতে আগামীকাল বুধবার বেলা ১১টায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে ক্র্যাব কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ক্র্যাব।
অপরদিকে, ছাত্রলীগ নেতা রিয়াদের অপকর্মের নানা কাহিনি বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। শিবির ক্যাডার হিসেবে একদা শিবিরের মেসগুলো দেখভালের দায়িত্ব পালনকারী রিয়াদ ক্ষমতাসীন দলের এমপিপুত্রের হাত ধরে ছাত্রলীগে পুনর্বাসিত হয়েই বিশাল দাপুটে হয়ে উঠে বলে অভিযোগ উঠে।
অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা প?রিচালনার মাধ্যমে মাত্র পাঁচ বছরে অর্থ?বিত্তে প্রতাপশালী হয়ে ওঠা রিয়াদরাই এখন স্থানীয় রাজনী?তির নেপথ্য নিয়ন্ত্রক। অভিযোগ রয়েছে, ভারতীয় অস্ত্র চোরাচালানের মাধ্যমে আমদা?নি করে তা কিস্তিতে বাজারজাত করছে রিয়াদের সি?ন্ডিকেট। এ রমরমা বা?ণিজ্য বহাল রাখ?তে সে ওয়ারী জোনের দুই এ?সি, চার ওসিসহ অন্তত ১০ পু?লিশ কর্মকর্তা?কে মাসোহারা দিতেন বলেও অভিযোগ উঠে। তার অস্ত্র ব্যবসার আদ্যোপান্ত জেনে ২০১৭ সাল থেকেই গোয়েন্দারা গ্রেফতারের চেষ্টা চালায়। কিন্তু রাজনৈ?তিক প্রভাব বিস্তার করে বহাল ত?বিয়তে থাকে রিয়াদ। রিয়াদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবসার অভিযোগে পুলিশের বাদী হওয়া একটি মামলারও সন্ধান পাওয়া গেছে মতিঝিল থানা থেকে। ২০১৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পিস্তল, গুলিসহ কমলাপুর বাজার রোডে দুই যুবককে আটকের সূত্র ধরে রিয়াদের অস্ত্র ব্যবসায় জড়িত থাকার তথ্য পায় পুলিশ। পরদিন আটক দুই যুবকসহ রিয়াদকেও আসামি করে মতিঝিল থানায় মামলাটি রুজু হয়।
মামলা সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে ২১ ফেব্রুয়ারি কমলাপুর বাজার রোডের আনার বেকারির পশ্চিম পাশে অস্ত্র কেনা-বেচা হবে। সে অনুযায়ী দুপুর ১২টার দিকে পুলিশ ঐ এলাকায় গেলে দুই যুবক পালানোর চেষ্টা করতেই পুলিশ তাদের আটক করে। আটক দুই জন হলেন— নাহিদুল ইসলাম (৩০) ও নাজমুল হোসেন ওরফে নোমান (২৯)। তাদের তল্লাশি করে নাহিদুল ইসলামের হাতে থাকা খাঁকি রঙের একটি শপিং ব্যাগে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও দুটি গুলি পাওয়া যায়। পরে তাদের দেওয়া তথ্য অনুসারে নোমানের মতিঝিলের কবি জসীমউদ্দীন রোডের ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে আরো দুটি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলি উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নোমান পুলিশকে জানান, স্থানীয় বড়ো ভাই কামরুল ইসলাম (২৯) ও রিয়াদ (২৮) বিক্রির জন্য তার কাছে অস্ত্র ও গুলিগুলো রাখতে বলেছিলেন।
২২ ফেব্রুয়ারি নাহিদুল, নোমান, কামরুল ও রিয়াদকে আসামি করে অস্ত্র আইনে মামলা হয়। মামলার এজাহারে প্রথম তিন আসামির পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা দেওয়া হলেও রিয়াদের পূর্ণাঙ্গ নাম ও ঠিকানা দেওয়া হয়নি। তবে রিয়াদের নামের সঙ্গে তার মোবাইল নম্বর দেওয়া ছিল। এই মোবাইল নম্বর ধরে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে রিয়াদের পুরো নাম শহিদুল ইসলাম খান। তিনি গেন্ডারিয়া থানা ছাত্রলীগের সভাপতি। অপর আসামি কামরুল ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পাদক বলে জানিয়েছিলেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলাম আকন্দ। তিনি আরো বলেন, গ্রেফতারের পর নাহিদুল ও নোমানকে তিন দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। দুই জনই ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে দুই জন বলেছেন, অস্ত্র ও গুলিগুলো তারা কামরুল ও রিয়াদের কাছ থেকে পেয়েছেন।
