বাংলাদেশের কন্যা হয়ে পুরো বিশ্বকে চিনিয়েছেন এমন কিছু নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাহমুদা সুলতানার নাম। তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন নাসার বর্ষসেরা বিজ্ঞানী। ২০১৭ সালে বিশ্বসেরা গবেষণা সংস্থা নাসার স্পেস রিসার্চ ল্যাবরেটরি গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারস ইন্টারনাল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনোভেটর অফ দ্যা ইয়ার। নাসার কাটিং এজ এ তাকে নিয়ে করা হয় প্রচ্ছদ। কোয়ান্টাম ডট প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন আলোক তরঙ্গ ডিটেক্টর এবং মাল্টিফাংশনাল সেন্সর ইউজিং ন্যানো টেকনোলজি নিয়ে গবেষণা করেছেন মাহমুদা।
মাহমুদার জন্ম রাজশাহীতে। তার বাবা একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, কর্মরত ছিলেন পানি উন্নয়ন বোর্ডে। বাবার চাকরির কারণে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া-আসার ওপরে থাকতেন কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই থাকতেন নানাবাড়ি রাজশাহীতে। নানী আমেরিকাতে চলে যাওয়ার পর থাকা শুরু করেন বাবা-মায়ের কাছে। রংপুরে পড়াশোনা করেছেন লাওন্স কিন্ডার গার্টেন, রংপুর গার্লস স্কুলে। কিছুদিন পড়েছেন পাবনা গার্লস স্কুলেও। এরপর তারা পুরো পরিবার চলে যান ক্যালিফোর্নিয়ায়। সেখানে গিয়ে একটা স্কুলে ভর্তি হন দশম শ্রেণিতে।
ছোটোবেলা থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখেছেন নাসায় কাজ করার। তবে আমেরিকায় যখন স্কুলে ভর্তি হন তখন এতটা সুদূরপ্রসারী চিন্তা করেননি। তার শুধু একটাই চিন্তা ছিল যে ভালো রেজাল্ট করে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ পেতে হবে। স্কলারশিপ না পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া কঠিন হয়ে যেত তার জন্য। প্রথম পর্যায়ে তার আমেরিকান ইংরেজি প্যাটার্ন বুঝতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আন্ডার গ্রাজুয়েটে পড়াশোনা করেন তিনি। এমআইটি, ক্যালটেক, স্ট্যানফোর্ড ও বার্কলিসহ প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে অ্যাপ্লাই করেছিলেন সেখান থেকে ফুল স্কলারশিপসহ অফার পান তিনি। বাবা-মা ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকলেও একরকম জোর করেই তিনি এমআইটিতে যান। সেখানে তার থিসিসের বিষয় ছিলো মাইক্রোফেব্রিকেশনের বিভিন্ন টেকনিক ব্যবহার করে কীভাবে রাসায়নিক প্রক্রিয়ার জন্য ডিভাইজ বানানো যায়। শেষ বছর নাসার একটা গ্রুপ তার রিসার্চ সম্পর্কে জানতে পেরে খুবই আগ্রহী হন। নাসা তাকে জেমসওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের একটা বিশেষ সমস্যা সমাধানের জন্য নিয়ে যান। এই গুরুত্বপূর্ণ টেলিস্কোপ ২০২১ সালে লঞ্চ হবার কথা রয়েছে। এটা একটা অভূতপূর্ব আবিষ্কার হবে কারণ এটা দিয়ে ১৩ বিলিয়ন বছরেরও বেশি আগে মহাবিশ্ব কীভাবে ব্যক্ত হয়েছিল তা দেখা যাবে। এটা কিছুটা টাইম মেশিনের মতো যা সম্ভব করেছে পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি যার মধ্যে একটা হচ্ছে মাইক্রোসাটারার নামের একটি ডিভাইস। এই ডিভাইস তৈরিতে নাসা যে সমস্যার সম্মুখীন হয় তা সমাধান করেন মাহমুদা। বর্ষসেরা বিজ্ঞানী হবার বিষয়ে তিনি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ কারণ এত জ্ঞানী ব্যক্তির মধ্য থেকে প্রতি বছর একজনকেই সম্মানে ভূষিত করা হয়। নাসায় কাজ করার শুরু থেকেই তিনি অনেকের প্রশংসা পেয়েছেন। পিটার হিউস, যিনি নাসা জিএসএফসির প্রধান প্রযুক্তিবিদ হিসেবে আছেন, তার কমিটি ‘ইনোভেটর অফ দ্যা ইয়ার’ নির্বাচিত করে। তিনি মাহমুদাকে সবসময়ই বলতেন যে তিনি তার কাজের ভক্ত। ২০১৫ সালে অন্য একজনকে এই পুরস্কার দেওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন যে মাহমুদাও একদিন এই পুরস্কার পাবে।
প্রযুক্তি একটি উন্নয়নশীল দেশের উন্নতির পিছনে বড়ো ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি মনে করেন বাংলাদেশের উচিত প্রযুক্তির পিছনে বিনিয়োগ করা। দেশের মানুষের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ এবং সুযোগ তৈরি করা উচিত যাতে সবাই আগ্রহী হয়। এর জন্য প্রয়োজন গবেষণা করার মানসিকতা এবং গবেষণা করার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। তিনি বলেন, আমাদের সরকারের উচিত বেশি বেশি এই ক্ষেত্রে বাজেট দেওয়া। বাচ্চাদের স্কুল থেকেই শুরু করতে হবে গবেষণার মনোভাব তৈরি করা। মুখস্থবিদ্যার ওপর জোর না দিয়ে চিন্তা-চেতনা, বুদ্ধি বিকাশে সহায়তা করা। তিনি আশা রাখেন ভবিষ্যতে আমাদের জন্য আরো অনেক চমক উপহার দিবেন।
