রক্তমাখা স্মৃতির সাগর

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৯:৪৩

আমাদের বাড়ির সবাই, গুপ্তদাদা, আমাদের পাড়ারই বাসিন্দা— আমাদের এক আত্মীয় মইন ও তার ভাই শান্ত, স্ত্রী রেখা, সবাই টিভিতে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শোনার অপেক্ষায় ড্রইংরুমে বসে ছিলাম। কার্তিকের মা আলী হোসেনও এসে বসেছিল বসার ঘরের এক ধারে। সবাই শুনলাম একসঙ্গে সেই বহু প্রতীক্ষিত ভাষণ। হূদয়স্পর্শী, আত্মপ্রত্যয়ী, ওজস্বী, আবেগপূর্ণ ভাষণটি ছিল অত্যন্ত গোছানো, সংযত। এর প্রত্যেকটি শব্দ ও বাক্য ছিল দৃঢ় সিদ্ধান্তবাহী ও তাত্পর্যপূর্ণ। নতুন উদ্দীপনায় উদ্দীপ্ত ও উদ্বুদ্ধ হলো লাখ লাখ শ্রোতা, উদ্দীপনা এসেছিল আমাদের মাঝেও। আজ জীবনের অপরাহ্ন অতিক্রান্ত সময়ে এসেও শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি স্মরণে এলে আবেগে আপ্লুত হই। একাত্তরের সাক্ষী আমরা সবাই জানি, সেদিনের সেই ভাষণটি কোনো দলের পক্ষ থেকে দেয়া হয়নি। শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে, ছিল বাঙালি জাতির ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। সম্ভবত সে কারণেই মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের শ্রেষ্ঠ ভাষণ হয়ে উঠেছিল সেটা। মানুষের বঞ্চনা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং ন্যায়সঙ্গত অধিকারের পক্ষে নির্ভীক এক ঘোষণার দলিল ছিল ’৭১-এর ৭ মার্চের সেই ভাষণ। তারপর এতগুলো বছর পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের গৌরব আর কলঙ্কের রক্তভেজা পথ অতিক্রমের সাক্ষী হয়েও আমাদের এখনো ভাবতে হয়, কী এমন জাদু ছিল শেখ মুজিবের একাত্তরের ৭ মার্চের ভাষণে, যার জন্য একটি জাতির উত্থান পৃথিবীর মানচিত্রের পুরোনো সংজ্ঞাটি বদলে দিয়েছিল!

বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির বয়স কম তো হলো না! পঁচাত্তর সালের কলঙ্কিত রক্তপাতের পর থেকে এ পর্যন্ত আমাদের সেই অবিস্মরণীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ’৭১-কে বেদনার্ত মোড়কে জড়িয়ে রেখেছিলাম আমরা—তারাই, যারা একাত্তরের গৌরবে গৌরবান্বিত হয়েছিলাম, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের কালজয়ী সেই ভাষণটিকেও আগলে রেখেছিলাম লুণ্ঠিত-মানুষের শেষ রত্ন সম্বলটির মতো, যেন যেকোনো সময়ে দুর্বৃত্তরা সেটা লুটে নিতে না পারে।

সেই কলঙ্কিত বিস্মৃতির দিনেই কখনো কখনো রিকশায় যাওয়ার সময় পথে শুনেছি, ফুটপাতে কোনো রাজনৈতিক উপ-সংগঠনের অস্থায়ী অফিসে বেজে চলেছে সেই মহান ভাষণের ঘোষণা—‘এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

কখনোবা শান্তিনগর বাজারে বাজার করতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছি, বাজারের সামনেই ভ্যানগাড়িতে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের লটারির টিকিট বিক্রির বিজ্ঞাপন। ত্রুটিপূর্ণ মাইকে বিচিত্র শোরগোলে বাজছে ‘মোরা একটি ফুল বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি...’ উপসংহারে রয়েছে একাত্তরের যুদ্ধ ঘোষকের কণ্ঠ—‘রক্ত যখন দিয়েছি, আরো রক্ত দেব’, বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে কেঁদে উঠেছে একাত্তরের বাংলাদেশ। অথবা যখন দেখেছি ৭ মার্চের মহান ভাষণটি ব্যবহূত হতো নিতান্তই নির্বাচনমুখী দলীয় স্লোগান হিসেবে—নিঃসন্দেহে বিষণ্ন হয়েছি, ভেজা চোখে ভেসে উঠেছে একাত্তরের দুঃসময়ের স্বপ্নসিঁড়িটি। তাকে এমন ক্ষুদ্র গ্লিতে কোনোদিন যে আবদ্ধ হয়ে যেতে হবে, একাত্তরের সেই মার্চে আমরা ভাবতেও পারিনি।

আসলে আমরা কখনোই ‘একাত্তর’কে নিয়ে, ‘৭ মার্চের ভাষণ’ নিয়ে গভীর আন্তরিক বিশ্লেষণে যাইনি। যাইনি বলেই সোনালি গৌরবের সিংহদ্বার ‘একাত্তর’ আর জাতিত্বের পূর্ণতার বিস্ফোরণ—সেই ৭ মার্চের ভাষণকে উপলব্ধির অজ্ঞতায় অতি সাধারণ আনুষ্ঠানিকতায় প্রাণহীন অথচ মর্যাদাপূর্ণ করে তোলার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়েছি।

হয়তো এই অবহেলা আর অজ্ঞতার কারণেই একাত্তরকে তার মহত্ত্বের আসন থেকে নামিয়ে দিতেও দ্বিধা করিনি। একাত্তর তাই বন্দি হয়ে যায় কখনো কখনো মুক্তিযুদ্ধের কথিত পক্ষ-বিপক্ষের বিভাজনে, ইতিহাস আর ইতিহাস বিকৃতির হট্টরোলে। যখন ‘ডিম্ব মস্তিষ্ক’ (বমম যবধফবফ) বুদ্ধিজীবী আর উচ্চকণ্ঠ রাজনীতিবিদদের কুক্ষিগত সীমাবদ্ধ ‘একাত্তর’ প্রাণহীন আনুষ্ঠানিকতায় হয়ে যায় ‘একাত্তরের চেতনা বা মুক্তিযুদ্ধের’ নিরর্থক নিষ্প্রাণ শব্দমালা। নিরুপায় একাত্তর কাঁদে মানুষের বুকের গভীরে। তাকে আঁকড়ে থাকে তারাই যারা স্বাধীনতার জন্য নিঃশেষে দান করেছেন স্বজনের প্রাণ, বিসর্জন দিয়েছেন নারীত্বের সম্ভ্রম, সয়েছেন হানাদারের নৃশংস নির্মম নির্যাতন।

আজকের প্রজন্ম, আজকের রাজনীতি বা আজ যারা স্বাধীনতার সংজ্ঞা নির্ধারক, তারা যদি একবার ফিরে যায় স্বাধীনতাকামী সাত কোটি মানুষের একাত্তরের আবেগের কাছে, স্বাধীনতা নামক স্বপ্নের সিঁড়িটির বাহক সেই মহান নেতার নেতৃত্বের সঠিক মূল্যায়নের সততায়, অবধারিতভাবেই একাত্তরের মার্চ মাস হাজার বছরের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে পৌঁছে দেবে তাদের। অবশ্যই তখন স্বীকার করতে হবে, বাঙালির সুসংগঠিত জাতি হয়ে ওঠার এবং স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতির পর্ব, চলেছিল হাজার বছর ধরেই, আর এই প্রস্তুতিটি সম্পন্ন হয়েছিল একাত্তর সালের মার্চ মাসে, যাকে সাহিত্যের ভাষায় বলা যায় মাহেন্দ্রক্ষণ।

বাঙালির এই স্বাধীনতার মূলমন্ত্রকে যদিও বলা হয়েছিল অর্থনৈতিক মুক্তি, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, বৈষম্যহীন অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের কথা, তবু নিঃসন্দেহে মেনে নিতে হয় একাত্তর ছিল প্রকৃত অর্থে একটি জাতির আত্মপরিচয় (আইডেনটিটি) ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার বিস্ফোরণ। এই বিস্ফোরণকে সঠিক লক্ষ্যে প্রবাহিত করার জন্য প্রয়োজন ছিল সঠিক, যোগ্য এবং আত্মনিবেদিত নেতৃত্বের। প্রশ্ন আসে, একটি আধুনিক জাতির আত্ম-প্রতিষ্ঠার জন্য কেন অপেক্ষা করতে হয়েছিল দীর্ঘকাল? কেন আসেনি জাতিকে স্বাধীনতার মর্যাদায় পৌঁছে দেয়ার জন্য উপযুক্ত নেতৃত্ব? উত্তরে হয়তো বলা যায়, সুসংগঠিত জাতি তার লক্ষ্য অর্জনের প্রস্তুতি পূর্ণ না করলে, যোগ্য নেতৃত্বও তৈরি হয় না।

এ প্রসঙ্গটি বিশ্লেষণ করতে গেলে, প্রথমেই আসে বাঙালি জাতিসত্তার গঠন প্রক্রিয়া ও তার সামাজিক, রাজনৈতিক, নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের কথা। বাঙালি জাতি-গঠন সম্পর্কে আমি আমার আত্মজীবনীর প্রথম দুই খ্লে (অভিবাসী আমি ও প্রাচীন নগরীতে যাত্রা) কিছুটা আলোকপাত করতে চেষ্টা করেছি। এছাড়া আমার বং থেকে বাঙলা মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসটি সম্পূর্ণই বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি এবং বাংলা ভাষার বিবর্তনের ধারাবাহিকতা অন্তে একটি জাতির উত্থান ও সুদীর্ঘকালের শোষণ-নির্যাতনের গরাদ ভেঙে মুক্তির প্রান্তে এসে দাঁড়ানোর ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে লেখা। এ উপন্যাসেই আমি বলার প্রয়াস পেয়েছি নিজস্ব স্বাধীন ভূখণ্ডে একটি স্বাধীন জাতির মর্যাদায় এসে দাঁড়াতে বাঙালিকে সংগ্রাম করতে হয়েছে হাজার হাজার বছরেরও বেশি সময়।

একাত্তরের মার্চে এসেই সমুদ্র উপকূলবর্তী বদ্বীপ অঞ্চলে ইতিহাস তার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় যতি টানল—জাতিত্বের অহঙ্কারে মাথা তুলে দাঁড়াল বাঙালি। ইতিহাসের অমোঘ বাস্তবতার নির্দেশেই নেতৃত্বের আসনটি গ্রহণ করতে হলো ভারত উপমহাদেশে একক দৃষ্টান্ত সৃষ্টিকারী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে। সেই একাত্তরের নেতৃত্বই হাতে তুলে নিয়েছিল স্বাধীনতা-উন্মুখ জাতিকে মুক্তির গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব, সঠিক সময়ে সঠিক নেতৃত্বদানের যোগ্যতাই শেখ মুজিবুর রহমানকে কালজয়ী করে তুলতে পেরেছিল। স্বাধীনতাকামী জাতির মুক্তির দাবিকে তিনি যথাযোগ্য মর্যাদায় গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, রাজনীতিবিদ থেকে নেতা হয়ে ওঠার এই বৈশিষ্ট্যই তাঁকে উত্তীর্ণ করেছে পৃথিবীর মহান নেতৃত্বের সারিতে। তখনই এদেশে গুরুত্ব পেয়েছিল ‘সেক্যুলারিজম’ বা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিতটি। (ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভক্তিতে বাঙালি মুসলমানের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষার অবমূল্যায়নেই ‘অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার’ দাবি উত্থিত হতে শুরু করে।)

রক্তমাখা স্মৃতির সাগর

রিজিয়া রহমান

প্রচ্ছদ  :ধ্রুব এষ

প্রকাশকাল :ফেব্রুয়ারি ২০২০

প্রকাশক :ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ