দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিনিয়োগের দরকার আছে

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৭:০৩

এ মুহূর্তে দেশের যে উন্নয়নযাত্রা, তাতে যুক্ত অনেকগুলো বৃহত্ প্রকল্প। এর বাইরে যোগাযোগ এবং এনার্জিকে সরকার খুবই গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব প্রকল্প সফল করতে প্রয়োজন আর্থিক বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগের কাজটা করছে বিআইআইএফএল। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের বৃহত্ এবং টেকসই বিনিয়োগেই আগ্রহ বেশি। এসব নিয়েই কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম ফরমানুল ইসলামের সঙ্গে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন ফারুক আহমেদ

এ মুহূর্তে বাংলাদেশে নানা ধরনের উন্নয়নের কাজ চলছে। অনেকগুলো মেগা প্রজেক্ট একইসঙ্গে গতিশীল রয়েছে। এনার্জি ও পাওয়ারের জায়গা বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার, আপনারা  কোন জায়গাটিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন?

এসএম ফরমানুল ইসলাম : আমরা আট থেকে দশটা খাত নিয়ে কাজ করছি। গুরুত্বের হিসেবে পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি প্রথম বিবেচনা। এরপর রয়েছে কানেক্টিভিটি। নির্দিষ্ট করে বললে, স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর, তারপর যেমন কন্টেইনার টার্মিনাল—এগুলো আমাদের কানেক্টিভিটির জন্য খুবই জরুরি। ফলে পাওয়ার, এনার্জি, কানেক্টিভিটি—এগুলোকে খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের যোগাযোগব্যবস্থা, ট্যুরিজম, হেলথকেয়ার হসপিটাল—এগুলো নিয়েও আমরা কাজ করছি। অন্যদিকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি—এনার্জি এফিসিয়েন্সিকে। যেমন—এলএনজি টার্মিনাল, এলপিজি বটলিং প্ল্যান্ট করা, বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যেমন—স্টিল, সিমেন্ট, আরএমজি, স্পিনিং, টেক্সটাইল এগুলোতে এনার্জি এফেক্টিভ বা এনার্জি এফিশিয়েন্ট টেকনোলজি যদি নিতে চায়, আমরা সাপোর্ট দিই। আমরা যেসব প্রযুক্তিতে সহায়তা দিচ্ছি, তাতে দেখা যাচ্ছে, ৪০ থেকে ৭০ পার্সেন্ট পর্যন্ত এনার্জি সেভ হচ্ছে। একটা ইউনিট সেভ করা মানে হলো পাঁচটা ইউনিট জেনারেশনের চেয়েও ভালো। এই দিকটাও আমরা হাইলাইট করছি।

 

দুই-একটা উদাহরণ দিলে ভালো হয়

এসএম ফরমানুল ইসলাম :এনার্জি এফিসিয়েন্সি বা অন্যান্য অনেক জায়গায়ই আমাদের বিনিয়োগ রয়েছে। আমরা সেভেন রিংস সিমেন্ট বা কেএসআরএম-কে সাপোর্ট দিচ্ছি। জিপিএইচ ইস্পাত-কে সাপোর্ট দিচ্ছি। অন্যদিকে আরএমজি-তে ওডিসিক্রাফট-কে অর্থায়ন করেছি, ধামরাইয়ে এই প্রজেক্টটি হচ্ছে। ইস্পাহানিতে আমাদের বিনিয়োগ রয়েছে। এছাড়া বেশ ক’টা স্পিনিংমিল-বান্ধব টেক্সাইল, ফকির গ্রুপ—এসব প্রতিষ্ঠানে আমাদের বিনিয়োগ রয়েছে। এটা তো গেল এনার্জি এফিসিয়েন্সি। অন্যদিকে আমরা গ্রিন ব্রিককে প্রমোট করছি। কারণ আমরা মনে করি নির্মাণ-উপকরণ যদি টেকসই না হয় তাহলে আপনি যত বড় প্রজেক্টই করেন না কেন গোড়াতেই গলদ থেকে যায়। তাই আমরা মনে করি, নির্মাণউপকরণ, এর মানে এটা শুধু ইট নয়, সিরামিক হতে পারে বা টাইলস হতে পারে; যেগুলোতে প্রচুর এনার্জি সেভিংসের সুযোগ আছে; সেগুলোকে আমরা সাপোর্ট দিচ্ছি। এখন পর্যন্ত আমরা ইটকে বেশি দিয়েছি। ও জায়গায় দেখা যাচ্ছে, শতকার পঞ্চাশ ভাগ কোল কনজামশন কমে যাচ্ছে। কারণ পুরো তাপটা ক্যাপচার করে ফেলেছে ব্যবহূত উপকরণগুলো। আমরা চাইছি যে ডেভেলপমেন্টটা হোক। কিন্তু সেটা যেন ব্যালেন্সড হয়, সাসস্টেনেবল হয় ওদিকে খেয়াল আছে আমাদের।

 

কানেক্টিভিটির কথা বললেন—আপনারা প্রাইভেট এবং পাবলিক সবরকম প্রজেক্টেই কি ইনভেস্ট করছেন? পাবলিক প্রজেক্টের মধ্যে কী কী আছে?

এসএম ফরমানুল ইসলাম : পাবলিক প্রজেক্টের মধ্যে আমরা অনেকগুলো ইকনোমিক জোনে অর্থায়ন করেছি। যেমন শ্রীহট্ট ইকোনোমিক জোন। এখন মিরসরাইয়ে ইকোনোমিক জোনে বিনিয়োগ করছি আমরা। সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক হচ্ছে। ওখানে আমরা বিনিয়োগ করেছি। এছাড়া পাবলিক সেক্টরের মধ্যে আশুগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্টে বিনিয়োগ করছি। এগুলো পাবলিক সেক্টর। আর প্রাইভেট সেক্টরের মধ্যে তো আমরা পনেরোটির ওপরে পাওয়ার প্ল্যান্টে অর্থায়ন করেছি অলরেডি। এর বাইরে বেশ ক’টি এলপিজি প্রজেক্টে বিনিয়োগ করেছি। আরো কিছু প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এলএনজি টার্মিনাল প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এরকম বেশকিছু প্রজেক্টে আমাদের বিনিয়োগ হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। আর হসপিটালের মধ্যে চিটাগাং ইমপেরিয়েল হসপিটালে আমরা ফাইন্যান্স করেছি। আর ফাইভ স্টার হোটেলের মধ্যে আমরা লা মেরেডিয়ানকে সহযোগিতা দিয়েছি। কক্সবাজারের রিসোর্ট রয়েল টিউলিপেও আমাদের বিনিয়োগ রয়েছে।

 

নানা ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে—ব্যাংক, বীমা বা এরকম আরো। সেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আপনাদেরটা আলাদা কোথায়?

এসএম ফরমানুল ইসলাম : ইনফ্রাস্ট্রাকচারে লক্ষ করলে দেখবেন যে—লংটার্ম ফাইন্যান্সিয়াল বিনিয়োগের দরকার আছে। যেটা কমার্শিয়াল ব্যাংকগুলোর পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা শর্ট টাইম ডিপোজিট কালেক্ট করে লং টার্ম ইনভেস্ট করা খুবই কঠিন। সাধারণত তাই এই ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যেগুলো আমাদের মতো—এদের সোর্সগুলো লংটার্ম।  যেমন আমরা ডেভেলপমেন্ট সাপোর্ট পাচ্ছি। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, এডিবিসহ, জাইকার সাপোর্ট পাচ্ছি, সরকারি সাপোর্টও রয়েছে—ইনফ্রাস্ট্রাকচারের প্রয়োজন হচ্ছে লং টার্ম। ব্যাংকগুলো হয়তো কিছুটা করছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পারবে না তারা। ইটস নট পসিবল। মিসমেস হবে খুব। একটা সমস্যা তৈরি হবে। ব্যাংকগুলো কনস্ট্রাকশন ফাইন্যান্সিংয়ে আসবে। শর্ট টার্ম হয়তো ৪/৫ বছরের জন্য। কিন্তু লং টার্ম সহযোগিতা আমাদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোরই দিতে হবে।

 

লং টার্ম বলতে সময়টা যদি একটু বলেন—

এসএম ফরমানুল ইসলাম : সেটা ১৫ বছর হতে পারে এমনকি ২০ বছরও হতে পারে। কারণ কিছু প্রকল্পের ধরনই এরকম। ধরেন, এখন যদি ঢাকা বাইপাস হয় তাহলে সেক্ষেত্রে কমপক্ষে ১৫ বছরের লোন লাগবে। সেটা কোনো ব্যাংক দিতে পারবে? হয়তো দিতে পারবে, কিন্তু ম্যাচ করা খুব কঠিন ব্যাংকের জন্য।

 

বড় বড় ইনভেস্ট আপনারা করছেন। এক্ষেত্রে কী কী শর্ত বা কোন বিষয়গুলো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখছেন?

এসএম ফরমানুল ইসলাম : প্রথম কথা হচ্ছে, কোনো প্রজেক্টই ব্যাংকেবল না হলে আমরা ফাইন্যান্স করি না। সেটা প্রাইভেট সেক্টর হোক, পাবলিক সেক্টর হোক বা সেটা প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপ হোক; তা ব্যাংকেবল হতে হবে। একটা প্রকল্প ব্যাংকেবল হয় কখন? প্রথমেই দেখতে হবে তার লিগাল স্ট্রাকচার ঠিক আছে কি-না। প্রকল্প যথাযথভাবে অ্যাওয়ার্ডেড হয়েছে কি-না। এটা যদি প্রাইভেট সেক্টরের হয়—সেক্ষেত্রে তার লাইসেন্স, পারমিট এগুলো আছে কি-না। জায়গা আছে কি-না—এসব দেখা হয়। তারপর আমরা দেখি যে টেকনোলজিটা তারা দিচ্ছে, তা কতটুকু ম্যাচিওরড।  টেস্টেড কি-না, প্রুভড কি-না, গ্লোবালি অ্যাকসেপ্টেড কি-না। এরপর দেখি যে স্পন্সর, তার ক্যাপাসিটি আছে কি-না এই প্রকল্প বাস্তবায়নে। আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা দুটোই। আর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যেটা—সেটা হলো রেভিনিউ স্ট্রিম। সেটা থেকে যে টাকা আসবে—প্রথমত টাকাটা যথেষ্ট কি-না? দ্বিতীয়ত সে টাকায় আমার নিয়ন্ত্রণ থাকবে কি-না? তারপর যেমন কী কী সিকিউরিটি তারা অফার করতে পারবে? যেমন—একটা গভর্নমেন্ট গ্যারান্টি থাকলে আমাদের আর অন্য কোনো সিকিউরিটির দরকার হয় না। তারপর ধরুন আমরা  রেভিনিউকে ট্র্যাপ করছি পাওয়ার প্ল্যান্টে। পাওয়ার প্ল্যান্টের সিকিউরিটি যথেষ্ট নয়। সেখানে যে টাকাটা আসে—সেটার ওপর আমরা সিকিউরিটি নিয়ে নিচ্ছি। সে টাকা আমাদের অ্যাকাউন্টেড হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে আমাদের জায়গাটা যথেষ্ট শক্ত। আবার কিছু প্রকল্প আছে—যেগুলো ধরুন ওরকম ফিক্সড রেভিনিউ নেই বা সিঙ্গেল পয়েন্ট রেভিনিউর স্ট্রিমও নেই, সেগুলো হতে পারে আরএমজি, স্পিনিং। ওদের ক্ষেত্রে আমরা হয়তো ল্যান্ড সিকিউরিটির দিকে যাই। পারসোনাল গ্যারান্টি বা কর্পোরেট গ্যারান্টি আছে কি-না দেখি। প্রজেক্ট হেজ টু বি ব্যাংকেবল। ব্যাংকেবল হলেই উই ক্যান ফাইন্যান্স। যেমন—আমরা যে প্রজেক্টগুলো ফাইন্যান্স করছি—ওগুলোতে ইটিপি’র ব্যবহার থাকতে হবে। যেখানে যেটা রিকোয়ারমেন্ট। কারণ আমরা ওটার জন্যই ফাইন্যান্স করছি।

 

গ্রিন নিয়ে কথা বলছিলেন। সবুজকে আপনারা খুব প্রায়োরিটি দিচ্ছেন। সবুজ নিয়ে আপনাদের প্ল্যান কী?

এসএম ফরমানুল ইসলাম : গ্রিনকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য আমরা আলাদা গ্রিন উইং করে ফেলেছি। দুটো উইং আমাদের আছে। যারা শুধু গ্রিন নিয়ে কাজ করে। একটা হলো এনার্জি এফিসিয়েন্ট ইউনিট, আরেকটা হলো গ্রিন কসস্ট্রাকশন মেটেরিয়াল ইউনিট। দুটোই ফুলফ্লেজড ডিরেক্ট কাজ করে। আর যেগুলো আমাদের লার্জ ইনফ্রাস্ট্রাকচার—সেগুলোর ক্ষেত্রেও বলি, প্রজেক্ট যদি সাসটেইনেবল না হয় তাহলে আমরা ফাইন্যান্স করি না। আমাদের দেখতে হয় ওদের এনভাইরনমেন্ট প্ল্যান ঠিক আছে কি-না। ওদের এসটিপি, ইটিপি ঠিক আছে কি-না। যার যেটা দরকার সেটা আছে কি-না। নইলে আমরা ফাইন্যান্স সাধারণত করি না।

 

এটা কি আপনাদের নিজেদের পলিসি নাকি যারা ফাইন্যান্স করছে তাদের কারণে গ্রিনকে প্রায়োরিটি দিচ্ছেন?

এসএম ফরমানুল ইসলাম : আমাদেরও পলিসি আছে আবার যে ফান্ড থেকে আমরা ইনভেস্টটা করব তাদেরও স্পেসিফিক পলিসি আছে। যেমন—ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের স্পেসিফিক পলিসি আছে। আমাদের বিআইএফএফএল-এরও পলিসি আছে। উইথ কাভার অল।