বাতিল কাপড়ে তৈরি উত্তরবঙ্গের গার্মেন্টস পণ্য যাচ্ছে সারাদেশে c রপ্তানিও হচ্ছে
g রিয়াদ হোসেন
উত্তরবঙ্গের নীলফামারির সৈয়দপুরে নীরবে গড়ে উঠা দীর্ঘদিনের গার্মেন্টস শিল্প এখন আরো বিকশিত হচ্ছে। এসব এলাকার অলিগলি এমনকি বাসাবাড়িতেও কান পাতলে মেশিনের শব্দ টের পাওয়া যায়। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার রপ্তানিমুখী গার্মেন্টসের বাতিল হওয়া কাপড় বা ঝুটই এখানকার গার্মেন্টস শিল্পের প্রধান কাঁচামাল। এসব ঝুট ও এক্সেসরিজ নিয়ে সৈয়দপুরে গড়ে উঠেছে গার্মেন্টসের বিশাল কর্মযজ্ঞ। তিন দশকের এ শিল্প এলাকা থেকেই এখন দেশের বিভিন্ন এলাকার শীতের কাপড়সহ গার্মেন্টস পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হস্তচালিত মেশিনের জায়গা দখল করেছে রপ্তানিমুখী গার্মেন্টসে ব্যবহার হওয়া আধুনিক জুকি মেশিনও। উত্তরবঙ্গের আরেক জেলা গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার তাঁত শিল্প অধ্যুষিত এলাকায় কিছু কারখানায় ব্যবহার হচ্ছে অত্যাধুনিক জ্যাকার্ড মেশিনও। এখানে তৈরি হওয়া গার্মেন্টস পণ্য উত্তরাঞ্চলসহ দেশের স্থানীয় বাজারের চাহিদার একটি বড়ো অংশই পূরণ করছে। প্রায় বাতিল হওয়া ঝুট কাপড় যে আরেকটি শিল্পের কাঁচামাল হয়ে এত চমত্কার পোশাক হতে পারে—তার বড়ো উদাহরণ হতে পারে এখানকার কারখানাগুলো। গত কয়েক বছরে দেশব্যাপী প্রচার পাওয়ায় এখন দেশের সব জায়গা থেকেই ক্রেতা আসছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে রপ্তানি হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশেও।
সৈয়দপুরের মুন্সিপাড়া, বাঁশবাড়ী, মিস্ত্রিপাড়া, গোলাহাট, হাতিখানাসহ কয়েকটি এলাকায় গড়ে উঠেছে এই শিল্প। এসব এলাকায় ৫ শতাধিক কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৮ হাজার শ্রমিকের। সবমিলিয়ে উত্তরবঙ্গের এ শিল্পখাতে জড়িত রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক। সৈয়দপুরের মুন্সিপাড়া এলাকার নারী উদ্যোক্তা আঞ্জুয়ারা বেগম জানান, ২০০৫ সালে পায়ে চালানো (ম্যানুয়াল) তিনটি মেশিন দিয়ে তার যাত্রা শুরু। পুঁজি ছিল দেড় লাখ টাকা। ব্যবসা বিস্তৃত হতে থাকায় ২০১০ সালে এসে উত্পাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয় ২৬টি স্বয়ংক্রিয় মেশিন। পরবর্তীতে পরিধি আরো বেড়েছে। কারখানাটিতে মূলত শীতের পোশাক জ্যাকেট তৈরি করা হয়। শীতের পর প্যান্ট, থ্রি কোয়ার্টার প্যান্টসহ গরমের কিছু পোশাক তৈরি হয়।
সরেজমিন এসব শিল্প অধ্যুষিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ঘরে ঘরেই গড়ে উঠেছে কারখানা। তিনটি থেকে শুরু করে ৫০ এর অধিক মেশিনও রয়েছে। সবমিলিয়ে ছোটো মূলধনের উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে এক বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ চলছে। কেবল এ এলাকাতেই বস্ত্র ও গার্মেন্টস মিলিয়ে বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। একই রূপ দেখা গেল গাইবান্ধার নয়ারহাট হোসিয়ারি শিল্প এলাকায়। নিভৃত পল্লিতে এত বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ একরকম নীরবেই শাখা প্রশাখা মেলেছে। এসব এলাকার উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, একরকম অবহেলা গড়ে উঠা এ শিল্প আরো বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এসব শিল্পকে শৃঙ্খলায় এনে যুগের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পণ্য উত্পাদন ও বিপণন ব্যবস্থায় সরকারকে আরো ব্যাপকভাবে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, তাদের এখন অন্যতম বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে কাঁচামালের প্রাপ্তি। নামে-বেনামে এ শিল্পের কাঁচামাল ঝুট বিদেশে রপ্তানি হয়ে যাওয়ায় এটি পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। দামও বেড়ে গেছে। সহজ শর্তে স্বল্প সুদে অর্থায়নও একটি বড়ো ইস্যু। বিশাল বিনিয়োগ করতে হওয়ায় এসব এলাকায় কাপড়ের ওয়াশিং ও ডায়িংয়ের কোনো প্ল্যান্ট নেই। এজন্য কাপড় ফের ঢাকায় পাঠাতে হয় ফলে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। আধুনিক ডিজাইনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকার পাশাপাশি বিপণন ব্যবস্থাপনাও যুতসই নয়। স্বয়ংক্রিয় মেশিনের এ যুগে এখনো হস্তচালিত তাঁতের ব্যবহার হওয়ায় উত্পাদনে পাল্লা দিয়ে পেরে উঠছে না। আবার বেশির ভাগ কারখানা বাসা বাড়িকেন্দ্রিক গড়ে ওঠায় সেখানে শ্রমিকের কর্মপরিবেশের (কমপ্লায়েন্স) বিষয়টি একরকম উপেক্ষিত। ছোটো ছোটো ঘরেই সুতা বুনন কিংবা কাপড় ও পোশাক তৈরির কাজ হচ্ছে। যে কোনো ধরনের অগ্নি দুর্ঘটনায় জীবনহানির পাশাপাশি ছোটো পুঁজির বিনিয়োগকারীদের পথে বসে যাওয়ারও শঙ্কা রয়েছে। নেই শ্রমিকদের জন্য কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কিংবা পণ্য প্রদর্শনী কেন্দ্রও।
সৈয়দপুরের নয়ারহাট গার্মেন্টস শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহীন আক্তার ইত্তেফাককে বলেন, এখানে স্বল্প সুদে ঋণ প্রাপ্তি সহজ করার পাশাপাশি তা বিস্তৃত করতে হবে। সেই সঙ্গে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কারখানাগুলোকে সব ধরনের সুবিধাসহ একটি গার্মেন্টস শিল্প পল্লি, ট্রেনিং সেন্টারও প্রদর্শন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন গোবিন্দগঞ্জের নয়ারহাটের বস্ত্র শিল্পের উদ্যোক্তারাও। সেখানে যাতায়াতের ভালো ব্যবস্থা না থাকা এবং স্থানীয় বাজারে ব্যাংকের শাখা না থাকাও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ক্রেতা-বিক্রেতাদের অন্যতম সমস্যা।
জানা গেছে, এসব এলাকার ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া তথা উদ্যোক্তাদের সহযোগিতায় কাজ করছে সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এসএমই ফাউন্ডেশন। যোগাযোগ করা হলে এসএমই ফাউন্ডেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম শাহীন আনোয়ার ইত্তেফাককে বলেন, সারাদেশে সম্ভাবনাময় ১৭৭টি ক্লাস্টার চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে ১৮টি শিল্প ক্লাস্টারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে উত্তরবঙ্গের এ দুটি এলাকাও রয়েছে। তিনি বলেন, এসএমই ফাউন্ডেশন উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হয়। ১২টি ব্যাংকের মাধ্যমে ইতিমধ্যে ৯ শতাংশ সুদে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। চলতি বছরে আরো ৫০ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
তবে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, এসব এলাকার ব্যবসা মূলত শীতের মৌসুমে। যে বার শীত কম হয়, ঐ মওসুমে বিক্রি কমে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েন উদ্যোক্তারা। এভাবে অনেক উদ্যোক্তা লোকসানে পড়ে ঋণখেলাপি হয়ে গেছেন।
