প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে মৃত ও আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলছে। গত ২৪ ঘণ্টায় চীনে আরো ৬৯ জন মারা গেছেন। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসে মোট মারা গেছেন ৬৩৬ জন। চীনের বাইরে মারা গেছেন দুই জন। করোনা ভাইরাস সম্পর্কে আগেই সতর্ক করা চিকিত্সক লি ওয়েনলিয়াংও মারা গেছেন। ভাইরাসের কেন্দ্রস্থল উহানে মারা যান তিনি। গত ১২ জানুয়ারি তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এছাড়া এখন পর্যন্ত চীনসহ সারাবিশ্বে এ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৩১ হাজার ১৬১ জন। বিশ্বের অন্তত ২৮টি দেশ ও অঞ্চলে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। বিলাসবহুল ব্রিটিশ প্রমোদতরি দ্য ডায়মন্ড প্রিন্সেসে আরো নতুন ৪১ যাত্রী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এ নিয়ে ৩ হাজার ৭০০ ভ্রমণকারী জাহাজটিতে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৬১। তাদের সবাইকে চিকিত্সার জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে জলযানটি এখনো ‘কোয়ারান্টিনেডেট’ অবস্থায় রয়েছে জাপানের ইয়োকোহামা বন্দরে। হংকংয়ের ৮০ বছর বয়স্ক এক যাত্রী প্রথম করোনা ভাইরাসে অসুস্থ হয়। এরপর সব যাত্রীকে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শুধু দ্য ডায়মন্ড প্রিন্সেসই নয়। দ্য ওয়ার্ল্ড ড্রিম নামের আরো একটি যাত্রীবাহী জাহাজ হংকংয়ে রাখা হয়েছে ‘কোয়ারান্টিনেডেট’ অবস্থায়। কারণ এই জাহাজটির সাবেক আট যাত্রীর মধ্যে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, করোনা ভাইরাস সংক্রমণে বিশ্বজুড়ে জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি করেছে ডব্লিউএইচও। অনেক দেশই আকাশপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন চীনের সঙ্গে। তাইওয়ান জানিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক কোনো প্রমোদতরি তাদের বন্দরে ভিড়তে দেবে না। যদিও বেইজিং বলেছে, করোনা ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করতে ‘জনযুদ্ধ’ শুরু করেছে তারা। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে টেলিফোন করে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, নতুন এ ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সম্ভব সবকিছুই করবে চীন ।
নতুন করোনা ভাইরাস নিয়ে প্রথম সহকর্মীদের সতর্ক করার চেষ্টা করা উহানের সেই ‘বীর’ চিকিত্সক লি ওয়েনলিয়াংয়ের মৃত্যুতে চীনে নজিরবিহীন শোকের পাশাপাশি ক্ষোভে ফুঁসছে জনগণ। ৩৪ বছর বয়সী লি গত ৩০ ডিসেম্বর লি এক বার্তায় তার সহকর্মীদের বলেছিলেন, নতুন এ করোনা ভাইরাস নিয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি। আর সেজন্য চীনা কর্তৃপক্ষ তার মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল মুচলেকা আদায় করে। শুধু তিনিই নন, ‘গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে আরো সাত জনের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হচ্ছে বলে তখন জানায় পুলিশ। পরে অসুস্থ অবস্থায় লি উইবুতে এক পোস্টে জানান, ১০ জানুয়ারি তিনি কাশতে শুরু করেন, পরদিন তার জ্বর আসে; দুদিন পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তার বাবা-মা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদেরও হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই ঘটনার ১০ দিন পর করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে ‘জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করে চীন।
জানুয়ারির বাণিজ্যের হাল প্রকাশ করেনি চীন
জানুয়ারি মাসে চীনের আমদানি-রফতানির হালচাল কেমন ছিল তা গতকাল প্রকাশ করার কথা থাকলেও সেটি করা হয়নি। চীনের শুল্ক প্রশাসন বলছে, আগামী মাসে ফেব্রুয়ারির তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে জানুয়ারির তথ্যও প্রকাশ করা হবে। শুক্রবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে এ তথ্য প্রকাশ করা হবে।
সুরক্ষা উপকরণের সংকট নিয়ে সতর্ক করল ডব্লিউএইচও
চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া নতুন ধরনের করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা যে গতিতে বাড়ছে, তাতে বিশ্ব ফেইস মাস্ক, গ্লাভস আর প্রোটেকটিভ গাউনের মতো সুরক্ষা উপকরণের বড়ো ধরনের সংকটের দিকে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক তেষোস আধানম গেব্রিয়েসাস। শুক্রবার জেনিভায় সংস্থার নির্বাহী পর্ষদের সভায় তিনি জানান, ডব্লিউএইচও বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে টেস্টিং কিটস, মাস্ক, গ্লাভস, রেসপিরেটর আর গাউন পাঠাচ্ছে। কিন্তু বিশ্ব এসব ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণের দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়তে যাচ্ছে। ডব্লিউএইচও মহাপরিচালক জানান, সরবরাহ ব্যবস্থায় কোথায় কোথায় সমস্যা তৈরি হতে পারে, সে জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান বের করার পাশাপাশি অঞ্চলভেদে এসব উপকরণের সুসম সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করবেন তিনি।
ঢাকা মেডিক্যালে আইসোলেশন ইউনিট
এদিকে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস খুব অল্প সময়ের মধ্যে চীনসহ প্রায় ২৫টি দেশে ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশে উদ্বেগের পারদ নামছে না। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সাত বেডের ‘আইসোলেশন ইউনিট’ খোলা হয়েছে। হাসপাতালের ইউনিট ২-এর নিচতলার জরুরি বিভাগে এই বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। বেডের পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন সরঞ্জামও রাখা হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘গত ৩০ জানুয়ারি কারোনা ভাইরাস মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি হিসেবে আলাদা ইউনিট চালু করা হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যালের হাসপাতালের ইউনিট ২-এর নিচতলায় সাতটি বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আমরা ১২ জনকে একসঙ্গে চিকিত্সা দিতে পারব।
এদিকে মানুষের এই উদ্বেগে অনেকটা আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ফেইক নিউজ। এমনকি বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষ শনাক্ত হয়েছে, এমন দাবিও তোলা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কারো মধ্যে করোনা ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। অন্যদিকে হাঁচি-কাশি থেকে এ ভাইরাস ছড়ায় এমন সাবধানতা থেকে আলোচনায় উঠে এসেছে মাস্ক। এমতাবস্থায় অনেকেই ছুটছেন মাস্ক কেনার দিকে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, ৫ টাকার মাস্ক কিনতে হচ্ছে ২০ টাকায়। অর্থাত্ তিন গুণ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে। একদিকে হঠাত্ করে চাহিদা তৈরিতে সংকট তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে চীন থেকে যে পরিমাণ মাস্ক আমদানি করা হতো তা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পণ্যটির দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
