মুন সিনেমা হল :দুই দশকের আইনি লড়াইয়ের সমাপ্তি

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২২:৪১

এক রিট মামলাকে ঘিরে পরিবর্তন এসেছে সংবিধানে। অবৈধ ঘোষিত হয়েছে সংবিধান বহির্ভূতভাবে নেওয়া খন্দকার মোশতাক, বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ও মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণের বিষয়টিও। দীর্ঘ দুই দশকের আইনি লড়াইয়ে এসেছে এই ফল। জমি ফেরত পেতে এই আইনি লড়াই শুরু করেছিলেন বাংলাদেশ ইটালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাকসুদুল আলম। কিন্তু তিনি ফেরত পাননি সেই মুন সিনেমা হলের সম্পত্তি। ভূমি ও স্থাপনার বৈশিষ্ট্যে বড়ো ধরনের পরিবর্তন হওয়ায় দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে ক্ষতিপূরণ বাবদ তাকে দেওয়া হয়েছে শত কোটি টাকা। সেই অর্থ গ্রহণ এবং ভূমির স্বত্ব ছেড়ে দেওয়ার পরই এ সংক্রান্ত আদালত অবমাননার মামলা গত বৃহস্পতিবার নিষ্পত্তি করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

রিটকারীর আইনজীবী সাইফুল্লাহ মামুন ইত্তেফাককে বলেন, দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের সমাপ্তি হলো। আপিল বিভাগ মামলাটি নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন। এখন পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে কোন প্রক্রিয়ায় ডিক্লারেশন রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।

পুরান ঢাকার ওয়াইজঘাটে একসময়ে মুন সিনেমা হলের মালিক ছিল ইটালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেড নামের একটি কোম্পানি। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঐ সম্পত্তি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে শিল্প মন্ত্রণালয় তা মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে ন্যস্ত করে। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের সামরিক ফরমানে বলা হয়, সরকার কোনো সম্পত্তি পরিত্যক্ত ঘোষণা করলে তা আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। সম্পত্তির মালিকানা ফেরত পেতে ঐ সামরিক ফরমানকে বৈধতা দেওয়া সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে ২০০০ সালে রিট করেন মাকসুদুল আলম। এ সংক্রান্ত রিট মামলায় ২০০৫ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট।

রায়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর খন্দকার মোশতাক, বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণ সংবিধান-বহির্ভূত এবং বেআইনি ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীকালে ঐ রায় বহাল রাখে আপিল বিভাগ। এরপর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ২০১১ সালে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী আনয়ন করে।

রিট মামলার রায়ের প্রেক্ষিতে সংবিধান সংশোধন হলেও মাকসুদুল আলম সম্পত্তি ফিরে পাননি। হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের রায় ঘোষণার আগে ২০০১ সালের ২৪ জুন মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের সঙ্গে ডেভেলপার কোম্পানি বাবুলী কনস্ট্রাকশনের চুক্তি হয়। ঐ চুক্তি অনুযায়ী মুন সিনেমা হলের শূন্য দশমিক ৬২ একর জমিসহ বাবুলী কনস্ট্রাকশনের জমি মিলিয়ে সেখানে নির্মাণ করা হয় বহুতল মুন শপিং কমপ্লেক্স। এই কমপ্লেক্সের বিভিন্ন দোকানও বিক্রি করা হয় ব্যবসায়ীদের কাছে। ফলে সম্পত্তি হস্তান্তর নিয়ে বড়ো ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। পরে রিটকারী আপিল বিভাগে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করেন। ২০১৭ সালে আপিল বিভাগ সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণে কমিটি গঠন করে দেয়। কমিটির রিপোর্টে ক্ষতিপূরণ হিসাবে ৯৯ কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৪ টাকা ২৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। ঐ নির্ধারণ মোতাবেক অর্থ মন্ত্রণালয় মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের নামে শত কোটি টাকার চেক বরাদ্দ দেয়। পরে ঐ চেক মাকসুদুল আলমকে দেয় আদালত।