মাসব্যাপী ব্যাপক উদ্দীপনার সহিত একুশে গ্রন্থমেলা চলিতেছে। এই মেলার বয়স প্রায় বাংলাদেশের সমান। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৮ তারিখ চিত্তরঞ্জন সাহা ব্যক্তিগত উদ্যোগে বর্ধমান হাউজ (বাংলা একাডেমি) প্রাঙ্গণে কলকাতা হইতে ৩২টি প্রকাশিত গ্রন্থ আনিয়া এক টুকরা চটের উপর সাজাইয়া যে মেলার গোড়াপত্তন করিয়াছিলেন, আজ তাহা বিশাল আকার ধারণ করিয়াছে। প্রতি বত্সর এই মেলাকে কেন্দ্র করিয়া লেখক, কবি, বুদ্ধিজীবীদের কয়েক হাজার গ্রন্থ প্রকাশ পাইতেছে। তরুণ লেখক ও পাঠকরা আকৃষ্ট হইয়া মেলা প্রাঙ্গণকে প্রাণবন্ত করিয়া তুলিতেছেন। প্রতি বত্সরই মেলায় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, বইয়ের সংখ্যা, লেখক ও পাঠকের সংখ্যা বাড়িতেছে। এক সময় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে স্থানসংকুলান না হওয়ায় ২০১৪ সাল হইতে তাহা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত বিস্তৃত করিতে হইয়াছে। এই বত্সর বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৮৬৯টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হইয়াছে। ৩৪টি সুদর্শন প্যাভিলিয়ন নির্মিত হইয়াছে। বিদেশ হইতে শুধু মেলা উপলক্ষ্যে কবি-লেখক এবং পাঠকরা আসিয়া ভিড় করিতেছেন।
এতকিছুর পরও একটি প্রশ্ন থাকিয়াই গিয়াছে। তাহা হইল—মানসম্পন্ন প্রকাশের সংখ্যা লইয়া। নিশ্চয়ই অনেক পঠনযোগ্য গ্রন্থ রহিয়াছে; কিন্তু আরো ভালো করিবার একটি প্রয়াস থাকা প্রয়োজন বলিয়া আমাদের মনে হয়। ইহা স্বীকার করিতেই হইবে, মেলায় গবেষণামূলক গ্রন্থের অভাব রহিয়াছে। অনূদিত গ্রন্থের সংখ্যা এখনো সন্তোষজনক নহে। আমরা জানি, বিশ্বের বহু দেশের সাহিত্য অনূদিত গ্রন্থের সংখ্যা নিজেদের ভাষার গ্রন্থকে ছাড়াইয়া গিয়াছে। ক্যাটাগরাইজড কিছু গ্রন্থ থাকে, যাহা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়। সেইসব গ্রন্থ মেলায় প্রায় অনুপস্থিত। পাশাপাশি ইংরেজি গ্রন্থও প্রায় নাই। যদিও বাংলাই আমাদের প্রধান ভাষা এবং মেলায় বাংলা গ্রন্থেরই প্রত্যাশা; কিন্তু ইংরেজি ভাষা এখন বিশ্বব্যাপী একটি বাস্তবতা। বাংলাদেশের বহু স্কুলে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া হইয়া থাকে। সুতরাং মেলায় ইংরেজি গ্রন্থের উপস্থিতি আশা করা মোটেই অযৌক্তিক নহে। মেলা পরিদর্শনে প্রায়ই কিছু বিদেশি দর্শক আসেন, তাহাদেরকে খালি হাতেই ফিরিয়া যাইতে হয়।
গ্রন্থ প্রকাশ একটি ব্যবসা; কিন্তু ইহা অন্য সচরাচর ব্যবসার মতো নহে। সৃজনশীল এই কর্মে প্রকাশকরা কেবল বইয়ের কাটতির দিকে তাকাইয়া থাকিলে তাহা অন্যায় হইবে। সর্বদাই কিছু গ্রন্থ থাকে যাহা বিনোদন নহে। ঐ সকল গ্রন্থ মানুষের জীবনে বিভিন্ন কাজে আসে, এমনকি মানুষের বোধের জায়গাটিও সমৃদ্ধ করে। লেখক ও প্রকাশকদের সেই দিকটায় একটু নজর রাখা দরকার। মানুষের জীবনে বিনোদন অপরিহার্য বিষয়; কিন্তু জাতিকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করিতে হইলে বিনোদনের বাহিরেও আরো কিছু সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত করিতে হয়। এই মেলায় এমন গ্রন্থের জনপ্রিয়তা বাড়িতে থাকুক, যাহা মানুষের অন্তর্দৃষ্টি খুলিতে সাহায্য করে। সর্বোপরি মেলায় যে কোনো ধরনের গ্রন্থকেই আমরা প্রত্যাশা করি। কারণ, বই-ই মানুষকে সমৃদ্ধ করিবার প্রধান মাধ্যম।
