ঘুরতে ঘুরতে জমিদারবাড়ি

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৭:৩৪

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

                                                                                  

শহুরে ব্যস্ততার কারণে দূরে ঘুরতে যাওয়া হয় না অনেকেরই। তবে প্রাণ খুলে হাসতে ইচ্ছে করে প্রকৃতির সান্নিধ্যে। কখনো বা একাকি বসে থাকতে ইচ্ছে করে নদীর ধারে। তার পরেও যাওয়া হয় না শুধুমাত্র যাপিতজীবনের ব্যস্ততার কষাঘাতে। প্রতিনিয়ত ইচ্ছেগুলো পিষ্ঠ হয় শহুরে কঙ্কক্রিটের চার দেয়ালে। যা এক সময় জীবন মানে যন্ত্রণা এ রকম ভাবতে শেখায়। জীবন মানে যন্ত্র নয়, জীবন হলো মন্ত্র। আর এই মন্ত্রের সূত্র জানানোর জন্যই লিখেছি আজকের এই ভ্রমণ গল্প।

যাদের সময় নেই তাদের জন্য এবার এক দিনেই হবে মিঠাই আর খই। যাদের নেই  মোটরসাইকেল কিংবা প্রাইভেট গাড়ি। তারা চলুন গুলিস্তান কিংবা গাবতলী। সেখান থেকে সাভারগামী বাসে চড়ে নেমে যান সাভার থানা বা বাজার বাসস্ট্যান্ড। মানুষ বেশি হলে অটো, না হলে রিকশায় চড়ে যাবেন নামাবাজার ব্রিজ। ব্যস! আর কী লাগে। ব্রিজের গোঁড়া থেকে ভাড়ায় খাটা মোটরসাইকেল কিংবা টমটমে কাজিয়ালকুণ্ড। এই গ্রামের বুক চিরে সদ্য পিচ করা সড়ক চলে গেছে একেবারে ঢুলিভিটা পর্যন্ত। সড়কের দু-পাশে সৃজন করা বৃক্ষের মৃদু হাওয়ার মায়াবি দোল, বর্ষার পানির ছলাত্ছলাত্ শব্দ, আপনার মন হারাবে অজানায়। গরুর দুধের এক কাপ মলাই চা পান করে চলে যান আড়ালিয়। খেয়ায় ধলেশ্বরী নদী পার হয়ে নানা গ্রামের সবজি ক্ষেতের আল ধরে সোদা মাটির গন্ধ শুকতে শুকতে চলে যান বড়দাইল গ্রামে। দেখবেন কিভাবে কতটা পরিশ্রম করে শহুরে বাবুদের রসনা মেটানোর জন্য গ্রামটির বউয়েরা মুড়ি ভাজছে। এছাড়া গ্রামটাও খুব সুন্দর। যাকে বলে খাঁটি বাংলার রূপ। এরপর আবারো ফোর্ডনগর ব্রিজ পার হয়ে চলে যান পঞ্চবটি আশ্রম। সেখানে গ্রাম্য পদ্বতিতে তৈরি মিঠাই, মুড়লি আর খই চিবিয়ে সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড থেকে যোগেসের দই খেয়ে চলে যান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। সম্ভব হলে হেঁটে, না হলে ভ্যানে চড়ে দৃষ্টিনন্দন পুরো ক্যাম্পস ঘুরে বটতলায় দুপুরে ভাত-ভর্তা দিয়ে উদর পূর্তি করে অটোতে করে চলে যান সিঅ্যান্ডবি সড়ক ধরে শ্যামপুর গোলাপ গ্রামে। হাজার হাজার গোলাপের মাঝে নিজেকে কিছুটা সময় বিলিয়ে দিয়ে সবুজে বারো ভাজা খেতে খেতে চলে যান এবার বিরুলিয়া জমিদারবাড়ি।

বিরুলিয়া যাওয়ার সময় পথের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে একাকি গলা ছেড়ে গাইতে ইচ্ছে করবে পাগলা হাওয়ার তরে। গাইতে গাইতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাবেন জমিদার রজনীকান্ত ঘোষের বাড়িতে। বাইরে থেকে প্রথম দেখায় নিরাশ হবেন না। কিংবা কারো বারণ শুনে চলেও আসবেন না। চলে যাবেন বাড়ির ভেতরে। এবার দাঁড়ান কিছুক্ষণ উঠোনে। দেখবেন ধীরে ধীরে আপনার মাথায় কিছু একটা ভর করছে। কী ভয় পেলেন? আরে নাহ! তেমন কিছু না। জাস্ট অন্দরমহল দেখার নেশা জাগবে, এই যা। নেশার পারদ যখন চরমে তখন ভেতরে ঢোকা আর ঠেকায় কে। আমি স্থানীয় কিশোর মঞ্জুকে সঙ্গী করে প্রথমে অন্দরমহলে ঢুকি। এরপর একেবারে চিলেকোঠা পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে দেখি। জমিদার বাড়িটিতে মোট ১১টি স্থাপনা রয়েছে। লোক মুখে জানতে পারি, বর্তমানে দুটি হিন্দু পরিবারের বসবাস রয়েছে। তারা নাকি জমিদারের বংশধর। কিন্তু আমার তা মনে হয়নি। আমরা যে স্থাপনাটিতে ঢুকেছি তা পুরোই ফাঁকা। ঘরের মেঝে, সিলিং, দরজা, জানালায় এখনো তত্কালীন আভিজাত্য দৃশ্যমান। নেই শুধু পাইক-পেয়াদাদের হাঁকডাক। কিংবা বাঈজির নূপুরের আওয়াজ। দেখতে দেখতে দোতলা পেরিয়ে ছাদ। এরপর চিলেকোঠায়। বাহ! আজ আর নেই কোনো জমিদারের নিরাপত্তারক্ষীদের হুঙ্কার। নেই কোনো বাঁধা। ইচ্ছেমতো ছাদ থেকে পুরো বাড়ি ও তার আশেপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখি। বাড়িটি এক সময়ের প্রমত্তা তুরাগ নদের তীরে। বর্ষায় যার রূপ-যৌবন অনেকটাই ফিরে আসে।  এই বাড়ির পূর্ব মালিক ছিল জমিদার নলিনী মোহন সাহা। তার কাছ থেকে ৮৯৬০ টাকা ৪ আনা দিয়ে জমিদার রজনীকান্ত ক্রয় করেছিলেন এটি। বাড়িটিতে রয়েছে বেশ কয়েকটি মন্দির, সদর ঘর, বিচার ঘর, সাজঘর, বিশ্রামাগার, পেয়াদা ঘর, ঘোড়াশালসহ আরো কিছু ঘর। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার সময় রজনীকান্ত ঘোষের স্মৃতিসহ মূল্যবান অনেককিছুই লুট হয়ে যায়। শুধু লুট হয়নি জমিদার রজনীকান্তের নাম। ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোতে ঘুরতে গেলে মনের ভেতর এক প্রকার নস্টালজিয়া কাজ করে।

পুরো বাড়িটি ঘুরে এবার গিয়ে উঠলাম কোষা নৌকায়। তুরাগের পানিতে প্লাবিত বিলে নৌকা ভাসে। চারপাশের অনেক গ্রাম মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। যা আপনাকে হাওর ভ্রমণের আনন্দ অনেকটা বিরুলিয়াতেই দেবে। ভাসতে ভাসতে বিচ্ছিন্ন এক বট বৃক্ষের ছায়ায় নৌকা ভিড়াই। সেখান থেকে দেখা বিরুলিয়ার নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা লিখে বোঝানো সম্ভব না। ঢাকার আশেপাশে থেকেও যারা এখনো এই বিরুলিয়া দেখেননি তারা যেন সুখময় জীবনান্দ সূত্রটির খোঁজ পাননি।