পাঠদানে নিয়োজিত থাকার কথা থাকলে ১৩ ধরনের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয় প্রাথমিক শিক্ষকদের। ফলে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের মনযোগী করা যাচ্ছে না। অনেক সময় পাঠদান বন্ধ থাকছে। যা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এসব বিবেচনায় শুধু নির্বাচন ছাড়া পাঠদানের বাইরে আর কোনো কাজে না জড়ানোর জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও তার অধীনস্থ সংস্থাকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। দেশের সবগুলো মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে এ ধরনের উপানুষ্ঠানিক পত্র দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব আকরাম আল হোসেন বলেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য এমন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, পাঠদানের বাইরে শিক্ষকদের ১৩ ধরনের কাজ করতে হয়। এসব কাজ করতে গিয়ে ক্লাস বন্ধ থাকছে দিনের পর দিন। ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও হালনাগাদ করা, ভোটগ্রহণ, শিশু জরিপ, কৃষিশুমারি, আদমশুমারি, উপবৃত্তি তালিকা প্রণয়ন ও প্রাপ্তিতে সহযোগিতা, খোলাবাজারে চাল বিক্রি তদারকি, বিস্কুট খাওয়ানো ও হিসাব সংরক্ষণ, কাঁচা-পাকা ল্যাট্রিনের হিসাব-তথ্য সংগ্রহ করা, কৃমির ট্যাবলেট, ভিটামিন-এ ক্যাপসুলসহ স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাজ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গসহ প্রাথমিকের অনুষ্ঠান ছাড়াও দর্শকের সারি পূরণ করার কাজ শিক্ষকদের দিয়ে করানো হয়।
ময়মনসিংহে তারাকান্দার পানিহরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এমরানুল হাই বলেন, শিক্ষকদের সহজে পাওয়া যায় এ কারণে শিক্ষকদের দিয়ে পাঠদান বহির্ভূত এসব কাজ করানো। এতে পাঠদানের ক্ষতি হয়। এ অবস্থা থেকে বের করে আনা উচিত বলে মনে করেন এই শিক্ষক।
শিক্ষকরা বলছেন, প্রত্যেক মাসে ছাত্র হাজিরা খাতায় নাম ওঠানো, দৈনন্দিন উপস্থিতি-অনুপস্থিতি হিসাব সংরক্ষণ, হোম ভিজিট, উপকরণ তৈরি, দৈনিক পাঠ পরিকল্পনা তৈরি, বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি তথ্য, প্রাথমিক শিক্ষক সমাপনী সার্টিফিকেট লেখা, বছরে তিনটা পরীক্ষা ছাড়াও মডেল টেস্ট, সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষার নির্ভুল তথ্য পূরণসহ বিশাল কাজ শিক্ষকদের করতে হয়। এর পরও স্কুলের বাইরে নানা ধরনের কাজ করতে গিয়ে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ৯ মাসব্যাপী সিইনএড প্রশিক্ষণের পরিবর্তে দেড় বছর ব্যাপী ডিপিইএড প্রশিক্ষণ প্রদানের ফলে শিক্ষকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ প্রশিক্ষণ গ্রহণে ন্যস্ত থাকেন।
উল্লেখ করা হয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য নতুন পদ সৃজন ও নতুন শিক্ষক নিয়োগ করার সত্ত্বেও শিক্ষক ছাত্র অনুপাত ১:৩৬। আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৭০ ভাগ মহিলা শিক্ষক। তাদের ছয় মাসব্যাপী মাতৃত্বকালীন ছুটি, প্রশিক্ষণ ইত্যাদির কারণে পদস্থ শিক্ষকদের মধ্যে প্রকৃত শিক্ষকদের সংখ্যা প্রায়ই কম থাকে। ফলে প্রায় সব শিক্ষককে অতিরিক্ত ক্লাস গ্রহণসহ শিখন কার্যক্রমে অতিরিক্ত সময় নিয়োজিত থাকতে হয়। এর মধ্যেই শিখন বা বিদ্যালয় সম্পৃক্ত নয় এরূপ সরকারি কার্যক্রম সম্পাদনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ কর্তৃক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ফলে শিক্ষকদের শিখন কার্যক্রমে পর্যাপ্ত সময় প্রদান ও শিখন মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
চিঠিতে আরো বলা হয়, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে এবং প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রযাত্রাকে আরো বেগবান করতে শিক্ষকদের শিখন কার্যক্রমে নিয়োজিত থাকার পরিবেশ ও সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বিদ্যালয় বা শিখন সংশ্লিষ্ট নয় এরূপ কার্যক্রমে শিক্ষকদের বিরত রাখা প্রয়োজন। এ প্রেক্ষাপটে শুধু নির্বাচন কার্যক্রম ছাড়া অন্যান্য কার্যক্রমে শিক্ষকদের দায়িত্ব প্রদান না করার বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনাযোগ্য বলে মনে করি। এ ক্ষেত্রে সচিবের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।
দেশে প্রাথমিক স্তরে প্রায় চার লাখ শিক্ষক রয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগে শিক্ষকরা সন্তুষ্ট। তারা বলেছেন, শুধু পাঠদানে নিয়োজিত থাকলে শিক্ষার মান বাড়ানো সম্ভব।
