ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, টেনিস, ব্যাডমিন্টন—আমাদের দেশে জনপ্রিয় সকল খেলাই আমদানি হইয়াছে উন্নত দেশ হইতে। ক্রিকেটে আমরা অভাবনীয় উন্নতিসাধন করিয়াছি। অধ্যবসায়, সাধনা, নিষ্ঠায় ক্রিকেটে আমরা এক অনন্য উচ্চতায় আসীন হইয়াছি। এমনিভাবে চলচ্চিত্রও আমদানি হইয়াছে ইউরোপ-আমেরিকার হাত ধরিয়া। একটি দেশ কতখানি শিল্পসাহিত্যে সমৃদ্ধ তাহার লিটমাস পেপার হইল ঐ দেশটির চলচ্চিত্র। যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপের কথা তুলনাতেই আসিবে না, কিন্তু এশিয়ার মধ্যে ইরান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলিতে চলচ্চিত্রে এমন এক সমীহযোগ্য আসন দখল করিয়াছে, যাহা আক্ষেপ তৈরি করায়—আমরা কেন এখনো পূর্বাবত্ তিমিরেই পড়িয়া রহিয়াছি। দক্ষিণ কোরিয়া তো ৯২ বত্সরের প্রথা উলটাইয়া এইবার অস্কার জয় লাভ করিল। চলচ্চিত্র বিশ্বের সবচাইতে জৌলুসময় পুরস্কারের আসরে বিস্ময়করভাবে এইবারই প্রথম ইংরেজি ভাষার ছবি না হইয়াও সেরা ছবি, সেরা পরিচালকের সম্মান ছিনাইয়া লইল দক্ষিণ কোরিয়ার ছবি ‘প্যারাসাইট’। শ্রেণিবৈষম্য লইয়া তৈরি বং জুন হো-এর কোরিয়ান ভাষার ডার্ক কমেডি, থ্রিলার এর আগে কান ফেস্টিভ্যালে পাইয়াছে পাম দ্য’অর আর হালে গ্লোডেন গ্লোবও। ঘটনাচক্রে এই বত্সরই ‘ফরেন ফিল্ম’ নামটি পরিবর্তন করিয়া রাখা হইয়াছে ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিচার’। বিশ্বসেরার সারিতে ছিল পোল্যান্ড, নর্থ ম্যাসিডোনিয়া, ফ্রান্স আর স্পেনের ছবিও। অনেকেই মনে করেন, এমন দিন আসিবে যখন একটি ছবি কোন ভাষার, তাহা অস্কারে আমলে নেওয়া হইবে না।
প্রকৃত অর্থে, চলচ্চিত্র এমন একটি সৃজনশীল মাধ্যম, যাহার মধ্যে জড়িত শিল্পকলার সকল প্রকরণ। চলচ্চিত্র হইল সকল শিল্পের সম্মিলিত রূপ। অথচ আমাদের চলচ্চিত্র হইয়া গিয়াছে কেবল যাত্রাপালার বর্ধিত রূপ। বিশ্বে সকল বাণিজ্যিক সিনেমাই শিল্পের নিরিখে বিশ্বমান বজায় রাখে, যেই কারণে হলিউডের সুপারডুপার হিট চলচ্চিত্রও একের পর এক অস্কার জয় করিতে পারে। টাইটানিক, অবতার হইতে শুরু করিয়া অসংখ্য ছবির উদাহরণ দেওয়া যায়। কিন্তু আমাদের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র মূলত ফর্মুলা ছবি। এইখানে একমুঠি অ্যাকশন, এক চিমটি কাতুকুতু, আধা সের সস্তা আবেগ এবং গানের মিশ্রণ থাকে। চলচ্চিত্রের মূল কথা হইল, উহাতে চিত্রনাট্য এবং নির্মাণ এমন হইবে যে, কখনই মনে হইবে না, উহা আরোপিত। কোনো ক্যামেরাম্যান যে চিত্রধারণ করিয়াছে, তাহা মনে হইবে না। অভিনয় হইবে আন্ডারটোনের, যাহাতে সাবলীল অভিব্যক্তি ফুটিয়া উঠিবে অকপটে। এই সকল বিষয়ের বড্ড অভাব আমাদের চলচ্চিত্রে। প্রায়শই মনে হয়, আমরা চলচ্চিত্রের মূল থিমটাই দলিতে পারি নাই।
চলচ্চিত্র যেহেতু শিল্পকলার অত্যন্ত প্রভাবশালী মাধ্যম, শক্তিশালী বিনোদন মাধ্যম এবং শিক্ষার অন্যতম সেরা মাধ্যম—এইজন্য এই শিল্পটিকে প্রকৃত শক্তিতে বিকশিত হইতে দেওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করিতে হইবে। গণযোগাযোগ বা সাধারণ মানুষের কাছাকাছি খুব সহজে পৌঁছাইবার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের অপরিসীম ভূমিকা রহিয়াছে বিধায় ইসলামিক দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইরানে প্রতি বত্সর প্রায় দুই শতাধিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। তাহাদের চিত্রনাট্য এতটাই শক্তিশালী হয় যে উহারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ উত্সবগুলিতে সমীহ আদায় করিয়া লয়। আমরা কি চলচ্চিত্র গভীর নিষ্ঠা ও সাধনায় বিশ্বমানের হইয়া উঠিতে পারি না?
