ভোটকেন্দ্রে ভোটার কম দায় রাজনৈতিক দলগুলোর

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:২৮

এ কে এম শহীদুল হক

২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। ১৫৪ সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ঐ নির্বাচনে ভোটার টার্ন আউট ছিল ৫১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। যদিও নির্বাচন নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেক নেতিবাচক সমালোচনা ছিল। ২০১৪ সালের পর সংসদে আসন খালি হওয়ায় যেসব উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হয়েছে সেসব নির্বাচনেও দিন দিন ভোটারের উপস্থিতি হ্রাস পেয়েছে। সর্বশেষ পহেলা ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ২০২০-এ ভোটারের টার্ন আউট ছিল হতাশাব্যঞ্জক। এ নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতির হার ছিল উত্তরে ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং দক্ষিণে ২৯ শতাংশ। এ নির্বাচনে ভোটারের  টার্ন আউট অতীতের সব নির্বাচনের চেয়ে কম। ২০১৯ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উপনির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতির হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৫ সালে উত্তরে ছিল ৩৭ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং দক্ষিণে ছিল ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

আওয়ামী লীগ সরকারের গত এগার বছরে দেশের প্রত্যেকটি সেক্টরে যে উন্নয়ন হয়েছে তার ফল জনগণ পাচ্ছে। তাই আওয়ামী লীগের পপুলার ভোট বাড়ছে তাতে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়; কিন্তু ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দেখা যায় আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটারদের কেন্দ্রে উপস্থিতির হার হ্রাস পেয়েছে। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আনিসুল হক পেয়েছিলেন প্রদত্ত ভোটের ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মোট ভোটের ১৯ দশমিক ৬২ শতাংশ। দক্ষিণে সাঈদ খোকন পেয়েছিলেন প্রদত্ত ভোটের ৫৯ দশমিক ১১ শতাংশ এবং মোট ভোটের ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২০ সালের আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম পেয়েছেন প্রদত্ত ভোটের ৫৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং মোট ভোটের ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। অপরপক্ষে দক্ষিণে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস পেয়েছেন প্রদত্ত ভোটের ৫৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং মোট ভোটের ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। দেখা যায় আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থীই অতীতের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোট মোট ভোটের শতকরা হারে কম পেয়েছেন। এতে প্রতীয়মান হয়—আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটাররাও অনেকে ভোটকেন্দ্রে যান নাই। 

ভোটকেন্দ্রে ভোটের উপস্থিতির ক্রমহ্রাস গণতন্ত্র ও ভোটের রাজনীতির জন্য উদ্বেগজনক। নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের সোপান এবং গণতান্ত্রিক সমাজে জনগণের রায়েই জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন। ভোটের মাধ্যমেই গণ রায় পরিমাপ করা হয়; কিন্তু ভোটার যদি তাদের পবিত্র ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে ভোটকেন্দ্রে না যান তবে জনগণের প্রকৃত রায় ভোটে প্রতিফলিত হয় না। এটা গণতন্ত্রের জন্য মোটেও শুভ লক্ষণ নয়। প্রত্যেক সচেতন নাগরিককেই এ বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে।

ভোটার উপস্থিতি হ্রাসের বহুবিধ কারণ আছে; কিন্তু প্রধান কারণ সুষ্ঠু রাজনীতির অভাব। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের অনেকের অনেক ক্ষেত্রেই বাড়াবাড়ি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সর্ব বিষয়ে হস্তক্ষেপ, খবরদারির মতো রাজনীতির অপসংস্কৃতির কারণে সাধারণ মানুষের রাজনীতির প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি হয়। আবার বিএনপি তথা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ভুল সিদ্ধান্ত, জনকল্যাণে কর্মসূচি দিতে ব্যর্থ হওয়া, দলীয় সংকীর্ণতা, গতানুগতিক রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্দোলনের নামে সন্ত্রাসী ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড, সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা, অবাস্তব ও অমূলক বক্তব্য প্রদান, কথার সঙ্গে কাজের মিল না থাকা, তাদের অতীতের অপকর্ম ইত্যাদি কারণে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতিও সাধারণ মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বিরাজ করে। তাই রাজনীতির প্রতি অনেকেই বিশেষ করে যুবকরা বিমুখ হয়ে পড়ছে। নির্বাচনকে তারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই মনে করে। তাই ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে এসে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। 

নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল, বিশেষ প্রভাবশালী মহল এবং প্রার্থীরা অবৈধ প্রভাব খাটাতে চায়। এটা আমাদের দেশের রাজনৈতিক ও ভোটের অপসংস্কৃতি। এ কারণে অতীতের কোনো নির্বাচনই বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনও বিতর্কিত ছিল। বিশেষ করে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারও প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদেরকে ব্যবহার করে বিএনপি-জামায়াতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল বলে ব্যাপক অভিযোগ উঠেছিল। তখন আওয়ামী লীগ ও মিডিয়া নির্বাচনে সরকারের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ জোরালোভাবে তুলে ধরেছিল। আমরা যারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছিলাম তারা অভিযোগের সত্যতাও প্রত্যক্ষ করেছি। বিএনপি ও কিছু কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ (যদিও সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ দিতে পারেনি)  অব্যাহতভাবে করায় ভোটারদের মনে নির্বাচন সম্বন্ধে  বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিরুদ্ধে বিএনপি ধারাবাহিক ভাবে নেতিবাচক সমালোচনা করায়ও ইভিএমকে নিয়ে ভোটারদের মধ্যে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছিল। বিরোধী দলের সমর্থক ভোটাররা মনে করেছেন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে লাভ নেই। কারচুপির মাধ্যমে সরকার তাদের মনোনীত প্রার্থীদের জিতিয়ে দেবে। তাদের ভোটের মূল্যায়ন হবে না। সরকারি দলের সমর্থক ভোটাররা মনে করেছেন তাদের দল ক্ষমতায় এবং তাদের প্রার্থীরা বিএনপির প্রার্থীদের তুলনায় অনেক ভালো ও যোগ্য। তাদের ব্যক্তি ইমেজ আছে। মানুষ তাদেরকেই ভোট দেবে। তাদের সবার ভোটকেন্দ্রে কষ্ট করে যাওয়ার দরকার নেই। নির্বাচন ও ইভিএম নিয়ে অপপ্রচার চালানোর কারণেই ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

বিরোধী দল ও ভোটারদের আস্থা অর্জনের জন্য নির্বাচন কমিশনের তেমন কোনো তত্পরতা লক্ষ্য করা যায়নি। নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনকে কঠোর হওয়া উচিত ছিল।  নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থার অভাব হলে ভোটকেন্দ্রে ভোটাররা আসতে চাইবে না—এটাই স্বাভাবিক।

পূর্বে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি বেশি হতো। কারণ প্রার্থীরা বিশেষ করে কাউন্সিলর ও মেম্বার পদপ্রার্থীরা ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসতেন; কিন্তু দলীয়ভাবে মনোনয়ন দেওয়ার কারণে প্রার্থীরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনার ব্যাপারে পূর্বের ন্যায় তত্পর থাকেন না। তারা মনে করেন দলের ইমেজেই তারা ভোট পাবেন। তাদের প্রচারণা মূলত রাজপথে সীমাবদ্ধ ছিল।

ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে কম আসার আর একটি কারণ দলের নেতাকর্মীরা ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনার জন্য তেমন কোনো তত্পরতা চালাননি। ঢাকা মহানগরীতে আওয়ামী লীগ বা তার সহযোগী সংগঠনের নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটিও হয় নাই। যুব ও ছাত্র সংগঠনের কতিপয় সদস্যের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ায় এবং তাদের কারো কারো বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও গ্রেফতার হওয়ায় যুব ও ছাত্র সংগঠনের মধ্যে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে অনেকে মনে করেন। নির্বাচনে তাদের আরো স্বতঃস্ফূর্ত তত্পরতা থাকলে ভোটকেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেত। বিএনপি তো সাংগঠনিকভাবে একেবারেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। তারা ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্টও ঠিকমতো দিতে পারেননি। যাদেরকে দিয়েছিলেন তাদের দলের প্রতি তেমন কোনো কমিটমেন্ট না থাকায় কেন্দ্র ছেড়ে চলে গিয়েছিল ।

মানুষের মধ্যে নাগরিক দায়িত্ব পালন করার চেয়ে বৈষয়িক প্রাপ্তি এবং নগদ লাভবান হওয়ার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পশ্চিমা দেশের জনগণের ন্যায় তারা অনেকটা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। তাই ভোট প্রদান করা যে প্রত্যেক নাগরিকের অন্যতম নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য তা তারা ভুলে যান। কষ্ট করে ভোটকেন্দ্রে যেতে চান না। ভোটার টার্ন আউট কম হওয়া এটাও একটা কারণ।

রাজনৈতিক দলগুলোর বিশেষ করে বিরোধী দলের নেতিবাচক প্রচারণা,  আপত্তিকর বক্তব্য, হুমকি-ধমকি, পালটা হুমকি এবং সরকারি দলের অহেতুক বাড়াবাড়ির কারণে নির্বাচন ও ভোট প্রদানের প্রতি মানুষের আগ্রহের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারণেই দিন দিন ভোটকেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি হ্রাস পাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সরকার, বিরোধী দল তথা সব রাজনৈতিক দলের এবং সুশীল সমাজের আন্তরিক ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।

n লেখক : সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল,

বাংলাদেশ পুলিশ